ডা. ওয়াজেদ খান : | বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
হাম অনেকটাই মহামারির আকার ধারণ করেছে বাংলাদেশে। ইতোমধ্যেই প্রাণহানি ঘটেছে প্রায় অর্ধসহস্র শিশুর। মৃত শিশুর চাঁদর মোড়ানো নিথর দেহ নিয়ে হাসপাতাল ছাড়ছেন স্বজনরা। এমন চিত্র যখন সংবাদ মাধ্যমে ভাইরাল, তখন দেশের রাষ্ট্রপতি নিজ সুস্থতার ব্যারোমিটার পরখ করতে গেলেন লন্ডন। সেই পুরনো দোহাই, দেশে স্বাস্থ্যের উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষা নেই। সুচিকিৎসা নেই ভিআইপি, ভিভিআইপিদের। তাই রোগের সামান্য উপাসর্গ সর্দিজ্বর হলেই তারা ছুটে যান সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ব্রিটেন, আমেরিকা সহ বিভিন্ন দেশে। কি বিচিত্র বৈপরীত্য! যে দেশের অনেক নাগরিক মরণব্যাধি নিয়ে ভ্যানে চড়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পৌছার পূর্বেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। সেই দেশের কথিত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ অনায়াসে বিদেশী হাসপাতালে যান এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে উড়ে।

দেশের হাসপাতালে জীবনের ঝুঁকি নিতে নারাজ তারা। অথচ ১৮ কোটি মানুষ বেঁচে আছে নিজ দেশের প্রচলিত চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করে। তাদের কোন স্বাস্থ্য বীমা নেই। জীবনের নেই কোন মূল্য। অসহায় এই শ্রেনীর মানুষের পুরো জীবনটাই কাঁটে মৃত্যুঝুঁকিতে। অপরদিকে বিত্ত ও ক্ষমতাবানদের জন্য রয়েছে দেশের আধুনিক ও বড় হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ। অসাম্যের এই ভয়াবহতা প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে সমাজ ও রাষ্ট্রে। কি অবাক করা কথা। বাংলাদেশে নাকি রাষ্ট্রপতির চিকিৎসা নেই। তাই শারীরিকভাবে সুস্থ কিনা এটা পরীক্ষার জন্য বছরে একবার লন্ডনে এবং আরেকবার সিঙ্গাপুর যেতে হয় রাষ্ট্রপতিকে। শুধু কি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, আমলা, ধনীদেরও কোন আস্থা নেই নিজ দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু লন্ডন গিয়েছেন অস্ত্রোপচারের ফলো-আপ হিসেবে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য। রাষ্ট্রপতিকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটি ৯ মে সকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করেন।
রাষ্ট্রপতির লট বহরে সফরসঙ্গী হয়েছেন পরিবারের সকল সদস্য, রাষ্ট্রপতির চিকিৎসকবৃন্দ, স্টাফ নার্স ও বঙ্গভবনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বিমানবন্দরে তাকে বিদায় জানান আইনমন্ত্রী, ডিপ্লোমেটিক কোরের ডিন, ব্রিটিশ হাইকমিশনার এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে ২০২৩ সালের অক্টোবরে কার্ডিয়াক বাইপাস সার্জারি সম্পন্ন হয় রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর। তার চিকিৎসার সকল রেকর্ড রয়েছে সিঙ্গাপুরে। সে হিসেবে তার ফলো-আপ মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালেই হওয়ার কথা।কিন্তু তিনি গিয়েছেন লন্ডনের একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে। অবশ্য ভিআইপি ও উচ্চবিত্তদের জন্য দেশেই রয়েছে বিশেষায়িত হাসপাতাল। এখন বাংলাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে কার্ডিয়াক বাইপাস সার্জারি, কিডনী প্রতিস্থাপন সহ অনেক জটিল রোগের আধুনিক চিকিৎসা হচ্ছে নিয়মিত।
জাতীয় সংসদের বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতার কার্ডিয়াক বাইপাস সার্জারি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে দেশের একটি হাসপাতালে। কিন্তু ক্ষমতা ও বিত্তের অধিকারীরা স্বাচ্ছন্দবোধ করেন বিদেশে চিকিৎসা করাতে। দেশের চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যসেবার প্রতি সামান্যতম ভরসা নেই তাদের। এখানেই আসে দেশপ্রেমের প্রশ্ন। যেসকল জটিল রোগের চিকিৎসা দেশের হাসপাতালে নেই, সেসব চিকিৎসার জন্য বিদেশে গেলে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা কিংবা একদেশের হাসপাতালে সার্জারি করে অন্য দেশের হাসপাতালে ফলো আপ করতে যাওয়া একটি অস্বাভাবিক ঘটনা। এ কারণেই প্রশ্ন উঠেছে রাষ্ট্রপতি চুপ্পুর লন্ডন যাত্রা নিয়ে। রাষ্ট্রীয় বিপুল অংকের অর্থে তার এই লন্ডন সফরে পরিবারের সকল সদস্য, অফিস কর্মকর্তাদের সঙ্গী করা হয়েছে, যা নিতান্তই অপ্রয়োজনীয়। তাছাড়া লন্ডনের হাসপাতালে রাষ্ট্রপতির সফর সঙ্গী ডাক্তার ও নার্সদের কোন ভূমিকা নেই। ফলে পুরো বিষয়টি পরিণত হয়েছে রাষ্ট্রপতি চুপ্পুর চিকিৎসা বিলাসে। তার এ সফরের পেছনে বড় ধরণের রাজনৈতিক কূটচাল রয়েছে বলেও ধারনা অনেকের।
সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ দায়িত্ব পালনকালে তিনিও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চোখের চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্য, জার্মানি এবং সিঙ্গাপুর সফর করেছেন। চিকিৎসার নামে রাষ্ট্রপতিদের বিদেশ সফর নিয়ে সমালোচনা হয়েছে অতীতেও।
চিকিৎসা মানুষের মৌলিক পাঁচটি অধিকারের অন্যতম। নাগরিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায় রাষ্ট্রের। দেশের সংবিধানেও উল্লেখিত আছে বিষয়টি। গড় আয়ুর বৃদ্ধি সূচকে উল্লাসিত হওয়া এক ধরণের আত্ম প্রবঞ্চনা। মানুষের জীবন শুধুই বেঁচে থাকার জন্য নয়। কথা ছিলো স্বাস্থ্যসেবা সার্বজনীন করার। স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও রাষ্ট্র হতে পারেনি কল্যাণমুখী। নিশ্চিত করতে পারেনি স্বাস্থ্যখাতের মান নিয়ন্ত্রণ ও সুশাসন। ফলে গোটা স্বাস্থ্যব্যবস্থা হয়ে উঠেছে স্বেচ্ছাচারী। স্বাস্থ্যসেবার অর্থ যোগান দিতে গিয়ে স্বাস্থ্যখাতের বৈষম্যমূলক এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রতিবছর নতুন করে দরিদ্র হচ্ছে ৬১ লাখ মানুষ।
দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ অনেকটাই পরিত্যাক্ত অবস্থানে। ফলে ব্যাঙ্গের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল, ক্লিনিক। কিন্তু সুযোগ সৃষ্টি হয়নি সকল নাগরিকের জন্য মানসম¥ত চিকিৎসা সেবা। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গিয়ে হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হচ্ছে সাধারন মানুষ। মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকে কষ্ট করে ভারতে যাচ্ছে চিকিৎসার জন্য। সেখানেও বাংলাদেশী দালালদের খপ্পড়ে পড়ে সর্বশান্ত হয়ে ফিরছে অনেকে। অসুখ মানেই সুখ নেই। মানুষ সবচেয়ে বেশী অসহায় অনুভব করে যখন তাকে কাতরাতে হয় হাসপাতালের বিছানায়। এসময় সবকিছুর বিনিময়ে হলেও ধরে রাখতে চায় তার জীবন। আর এ অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেনীর হাসপাতাল মালিক, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী লুটে নেয় তাদের সর্বস্ব।
ভুয়া চিকিৎসকের কারণে সরকারী বেসরকারী অনেক হাসপাতালেই ঘটছে ভুল চিকিৎসা ও অবহেলাজনিত মৃত্যুর ঘটনা। অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে লাশ হয়ে ফিরছে তারা। অনেক হাসপাতাল মরণ খেলা খেলছে জীবন্ত মানুষ নিয়ে। অসুস্থ মানুষকে জিম্মি করে তাদের পরিবারের কাছ থেকে আদায় করছে অর্থ। দেশ জুড়ে চলছে অমানবিক এ চিকিৎসা বাণিজ্য। একবার কেউ এই কলে পড়লে তার আর রক্ষা নেই। ফলে অসুস্থতা নিয়ে বাড়ীতে বসে ধুঁকছে মানুষ। কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই তাদের। ঘুরে ফিরে তাদেরকে দৌড়াতে হয় স্থানীয় সরকারী বেসরকারী হাসপাতালেই। এভাবেই সাধারণ মানুষ অসুস্থতা নিয়ে বেঁচে আছে নামমাত্র চিকিৎসা পেয়ে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে নিম্ন মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র মানুষ বরাবরই অবহেলিত ও প্রতারিত হয়ে আসছে। চিকিৎসা সেবা হাতছাড়া হয়ে গেছে সাধারণ মানুষের। জীবন বাঁচাতে চিকিৎসার জন্য তারা এক হাসপাতাল থেকে ছুটছে আরেক হাসপাতালে। ফলে বেড়ে চলছে দেশের মানুষের অস্বাভাবিক এ মৃত্যু হার।
বেহাল স্বাস্থ্যখাতের কারনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়,স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তা ও সিংহভাগ সরকারী-বেসরকারী হাসপাতালের পরিচালক, দলীয় আর্শীবাদপুষ্ট এক শ্রেনীর চিকিৎসক মিলে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার বারোটা বাজিয়েছে এই সিন্ডিকেট। ফোকলা করে দিয়েছে হাসপাতালগুলোর অন্দর বাহির। বেসরকারী হাসপতালগুলোতে কোন নিয়ন্ত্রণ নেই সরকারের। চিকিৎসার মান যাচাই বাছাই করবে এমন কোন নিয়ম-নীতি না থাকায় তারা ফ্রি স্টাইল ব্যবসায় করছে রোগীদের জিম্মি করে। অসুস্থ হলেই রোগীকে নেয়া হয় আইসিইউতে। সেখানে রোগী মারা যাওয়ার পরও নাকি আদায় করা হয় অতিরিক্ত অর্থ।
এসব অমানবিক আচরণ গা সহা হয়ে গেছে মানুষের। এ নিয়ে প্রায়শই রোগীর আত্মীয়-স্বজন হামলে পড়ছে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের উপর। তবে অনেক ক্ষেত্রে বাড়াবাড়িও হচ্ছে। স্বাভাবিক মৃত্যুর দায় চিকিৎসকের উপর চাপানোর চেষ্টা থেকেও ঘটছে হাঙ্গামা। দেশের হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নেই। ল্যাবরেটরী নেই। আইসিইউ নেই। অক্সিজেন সরবরাহ নেই। জীবন রক্ষাকারী ঔষধ নেই। চিকিৎসক নেই। নার্স নেই। নেই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মী। পর্যাপ্ত বাজেট নেই। চারিদিকে শুধু নেই নেই। আর যা কিছু আছে তা ভরপুর নকল ও ভেজালে।
সরকারের মন্ত্রী, আমলারাদের আনতে হবে জবাবদিহিতার আওতায়। স্বাস্থ্য নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ আইন ছাড়া বেসরকারী হাসপাতাল চলবে এভাবেই। সরকারী হাসপাতালের অবস্থাও তথৈবচ। সময় এসেছে সরকারী-বেসরকারী হাসপাতালগুলোতে ভুল এবং অবহেলাজনিত চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের আইনী শাস্তির আওতায় আনা। উন্নত দেশগুলোতে এই ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকায় চিকিৎসা সেবার মান উন্নত। দেশের চিকিৎসা খাতে বাজেট বাড়ানো। সময়োপযোগী স্বাস্থ্যনীতি প্রর্বতন। দুর্নীতি-অনিয়ম কঠোর হস্তে দমন। বেসরকারী হাসপাতাল নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা প্রনয়ণের কোন বিকল্প নেই। বিদেশে ধনবানরা দাতব্য ও অলাভজনক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন।
নিজ অর্থে প্রতিষ্ঠিত এসব হাসপাতাল দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা নিশ্চিত করে। আর আমাদের দেশের বিত্তবানরা ব্যাংক বীমা লুট করে বিদেশে পাড়ি জমান চিকিৎসার জন্য। মানসিকতা ও মানবিকতার পার্থক্য এখানেই। এছাড়া সমাজের অন্যান্য দিকের মতো চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রেও বৈষম্য প্রকট হয়ে উঠেছে দেশে। সরকারের শীর্ষ মহল থেকে শুরু করে একটি শ্রেনী ভোগ করছে অপার সুযোগ সুবিধা। আর বেশুমার মরছে সাধারণ মানুষ। স্বাস্থ্য সুবিধা পাওয়া নাগরিকদের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার। এ বৈষম্য যতদিন থাকবে ততোদিন সচল থাকবেই মানুষ মারার এসব কল কারখানা। দমন করতে হবে দুর্নীতি, লুটপাট ও অনিয়ম। নিজ রাষ্ট্রের হাসপাতালেই চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে হবে সকল নাগরিকের। এজন্য অবশ্যই ঢেলে সাজাতে হবে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। রাষ্ট্রীয় অর্থের অবাধ শ্রাদ্ধ বন্ধ করতে হবে। শারীরিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি যাচাই করতে হবে চুপ্পু সাহেবদের মানসিক সুস্থতা। সবার আগে গড়তে হবে বৈষম্যহীন নতূন বাংলাদেশ। সাম্য ফিরিয়ে হবে সমাজ ও রাষ্ট্রে।
সবশেষে প্রখ্যাত ভারতীয় কবি কাইফি আজমি’র কবিতার কয়েকটি পংক্তি দিয়ে শেষ করবো-
কারো জন্য উপচে পড়ে সাগর
অন্যদের গ্লাস খালি!
কেমন সময় এটা
কেমন বিষম বাটোয়ারা-ওগো সাকি?
এখনো ধারণ করতে পারোনি তুমি
তৃষ্ণার্তের স্বভাব?
দেবার ধরণ তোমার বদলাতেই হবে
ওগো সাকি।
লেখক : সম্পাদক, সাপ্তাহিক বাংলাদেশ, নিউইয়র্ক।
Posted ১০:২০ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh