জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬
আপনি রাসুল: আল্লাহ তা’আলা বলেন,“তুমি নিসন্দেহে রাসুলদের অন্তরভুক্ত”(সুরা ইয়াসীন:৩) নাউযবিল্লাহ এমন নয় যে নবী সা: তাঁর নবুয়তের ব্যাপারে সন্দীহান ছিলেন এবং তাঁকে নিশ্চয়তা দান করার জন্য আল্লাহর একথা বলার প্রয়োজন হয়েছিল। বরং এর কারণ হচ্ছে এই যে, সে সময় কুরাইশ বংশীয় কাফেররা অত্যন্ত জোরেশোরে নবী সা: এর নবুয়ত অস্বীকার করছিল। তাই আল্লাহ তা’আলা কোন প্রকার ভূমিকা ছাড়াই তাঁর ভাষণ শুরু করেছেন এ বাক্য দিয়ে যে, “তুমি নিশ্চয়ই রাসুলদের অন্তর্ভুক্ত।”
অর্থাৎ যারা তোমার নবুয়ত অস্বীকার করছে তারা ভুল করছে। তারপর এ কথার ওপর কুরআনের কসম খাওয়া হয়েছে এবং কুরআনের গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে “বিজ্ঞানময়” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে এই যে, তোমার নবী হওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ হচ্ছে এ কুরআন যা পুরোপুরি জ্ঞানে পরিপূর্ণ। এ জিনিসটি নিজেই সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, যে ব্যক্তি এমন জ্ঞানপূর্ণ বাণী উপস্থাপন করছেন তিনি নিসন্দেহে আল্লাহর রাসুল। কোন মানুষ এ ধরনের বাণী রচনা করার ক্ষমতা রাখে না। আর মুহাম্মদ সা:কে যারা জানতো তাদেও পক্ষে কোনক্রমেই এ বিভ্রান্তির শিকার হওয়া সম্ভব ছিল না যে, এ বাণী তিনি নিজে রচনা করে আনছেন অথবা অন্য কোন মানুষের কাছ থেকে শিখে এসে শুনাচ্ছেন। তাঁর সম্পর্কে আল্লাহ আরো বলেন,“(তুমি) সরল-সোজা পথ অবলম্বনকারী।’(সুরা ইয়াসীন:৪)
# তিনি পাগল নন: আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আর হে মক্কাবাসীরা!) তোমাদের সাথী পাগল নয়।”(সুরা তাকবীর :২২) যিনি নবুয়তের দাবী নিয়ে তোমাদের মাঝে আবির্ভুত হয়েছেন, তিনি ভিনদেশী অপরিচিত হঠাৎ আগন্তুক কেউ নন যে আগে থেকেই তার সাথে তোমাদের জানা শোনা নেই। তিনি তোমাদেরই জাতি ও স্বগোত্রীয় একজন। তোমাদের মাঝেই তাঁর জন্ম ও বেড়ে উঠা, তোমাদের মাঝেই তাঁর বসবাস। অর্থাৎ তিনি উড়ে এসে জোরে বসেন নাই। তিনি কে, কি তাঁর পরিচয়, কেমন তাঁর স্বভাব চরিত্র, কেমন তাঁর আচার-আচরণ, আজ পর্যন্ত তোমাদের মাঝে তাঁর জীবন কেমন কেটেছে, তা তোমাদের শহরের প্রতিটি আবালবৃদ্ধবনিতা জানে। তিনি কি ধরনের জ্ঞানী, বুদ্ধিমান ও সচেতন ব্যক্তি তা তারা ভালোভাবেই জানে। এ ধরনের একজন পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিকে জেনে বুঝে পাগল উপাধি দেয়া তাদের লজ্জা পাওয়া উচিত।
# তিনি কোন অভিশপ্ত শয়তানের কথা বলেন না: আল্লাহ তা’আলা বলেন, “এটা কোন অভিশপ্ত শয়তানের বাক্য নয়।”(সুরা তাকবীর:২৫) কোন শয়তান এসে মুহাম্মদ সা: এর কানে এসব কথা বলে যায়, তোমাদের এ ধারণা ভুল। শয়তান কি মানুষকে শিরক, মূর্তিপূজা, কুফরী ও আল্লাহদ্রোহীতা থেকে সরিয়ে আল্লাহপরস্তি ও তাওহীদের শিক্ষা দিবে? এ ধারণা পোষণ করা অবাস্তব ও পাগলের প্রলাপ ছাড়া আর কিছুই না। কেন সে মানুষের মনে লাগামহীন উটের মতো স্বাধীন জীবন যাপন করার পরিবর্তে আল্লাহর দেয়া দায়িত্ব পালন ও তাঁর সামনে জবাবদিহে করার অনুভূতি জাগাবে? জাহেলী রীতিনীতি, জুলুম, দুর্নীত ও দুস্কৃতির পথে চলতে বাধা দিয়ে কেন সে মানুষকে পবিত্র ও নিস্কুলষ জীবন যাপন এবং ন্যায়,ইনসাফ, তাকওয়া ও উন্নত নৈতিক চারিত্রিক গুণাবলী অর্জন করতে উদ্ধুদ্ব করবে? এ ধরনের কাজ করা শয়তানের পক্ষে কোনক্রমেই সম্ভব নয়।
# তিনি পথভ্রষ্ট বা বিপথগামী নন: আল্লাহ তা’আলা বলেন,“তোমাদের সাথী পথভ্রষ্ট হয়নি এবং ব্পিদগামীও হয়নি।”(সুরা নজম:২) ‘দলালাহ’ বলা হয় অজ্ঞতার কারণে সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়া। আর ‘গাওয়া’ বলা হয় এমন বক্রতাকে, যা জেনে-বুঝে সত্যকে বর্জন করে অবলম্বন করা। আল্লাহ তা’আলা তারকারাজির কসম খেয়ে বলছেন যে, তোমাদের সাথী যিনি তার জীবনের চল্লিশটি বসন্ত তোমাদের সামনেই অতিবাহিত করেছেন। তাঁর জীবনের কোথাও অন্ধকারের কোন অধ্যায় ছিল না। তাঁর দিবা রাত্রির কার্যকলাপ ও আচার-আচরণ দিবালোকের মত তোমাদের সামনেই বিদ্যমান। তাঁর চরিত্র ও নৈতিকতা তোমাদের জানা ও চীর চেনা। সততা ও বিশ্বস্ততা ছাড়া তাঁর চরিত্রে কি কোন কিছু পরিলক্ষিত হয়েছে? চল্লিশ বছর পর যখন তিনি নবুয়তের দাবী করছেন, তখন তিনি মিথ্যাবাদী হতে পারেন?
রাতের তারকারাজি অস্তমিত হওয়ার পর যখন ভোরের আলো উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। তখন প্রতিটি বস্তুর মূল আকার আকৃতিতে মানুষের সামনে প্রকাশ পায়। সে সময় কোন বস্তুর মুল রূপ ও আকার আকৃতির ব্যাপারে কোন সন্দেহ সংশয় সৃষ্টি হয় না। তোমাদের মধ্যে মুহাম্মদ সা: এর ব্যাপারটিও তাই। তাঁর জীবন ও ব্যক্তিত্ব অন্ধকারে ঢাকা নয়। বরং আলোক উদ্ভাসিত ভোরের মত স্পষ্ট। তোমরা জানো তোমাদের এ সাথী বা বন্ধু একজন অতি নম্্র স্বভাব, জ্ঞানী ও বিচক্ষণ ব্যক্তি। তাঁর সম্পর্কে তোমাদের মধ্যে এ ভুল ধারণা কি করে সৃষ্টি হতে পারে যে, তিনি পথভ্রষ্ট হয়েছেন। তোমরা এও জানো তিনি অত্যন্ত সদিচ্ছা পরায়ণ এবং সত্যবাদী মানুষ। তোমাদের কেউ তাঁর সম্পর্কে এ মত কি করে পোষণ করতে পারে যে, তিনি জেনে শুনে শুধু যে বাঁকা পথ অবলম্বন করে বসে আছেন তাই নয়, অন্যদেরকেও সে বাঁকা পথের দিকে আহবান জানাতে উঠে পড়ে লেগেছেন।
#তিনি নিজের খেযাল খুশীমত কথা বলেন না: আল্লাহ তা’আলা বলেন,“সে নিজের খেয়াল খুশীমত কথা বলে না, যা তার কাছে নাযিল করা হয় তা অহী ছাড়া আর কিছু নয়।”(সুরা নাজম:৩-৪) দীনের প্রচার ও আল্লাহর পথে মানুষকে আহবানের জন্য তিনি যেসব কথাবার্তা বলতেন অথবা কুরআন মাজীদের বিষয়বস্তু তার শিক্ষা এবং আদেশ-নিষেধ ও হিদায়াতসমূহের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হিসেবে যা কিছু বলতেন অথবা কুরআনেরই উদ্দেশ্য ও দাবী পূরণ করার জন্য যেসব বক্তৃতা করতেন বা লোকদেও উপদেশ ও শিক্ষা দিতেন এগুলো এ শ্রেনীর কথা। এসব কথা সম্পর্কে এরূপ সন্দেহ করার আদৌ কোন অবকাশ নেই যে, তিনি মনগড়া বলতেন। তিনি ছিলেন কুরআনের সরকারী ভাষ্যকার বা মুখপত্র এবং আল্লাহর মনোনীত প্রতিণিধি হিসেবে। তবে তাঁর কথা, কাজ ও নিরবতাও অহীর ভিত্তিতেই হতো। এই করিণে কুরআনকে ‘অহীয়ে জলী’ প্রকাশ্য অহী এবং নবীর সা: অবশিষ্ট এসব কথাবার্তাকে ‘অহীয়ে খফী’ অপ্রকাশ্য অহী বলা হয়।
নবী সা: দ্বিতীয় আরেক প্রকার কথাবার্তা ছিল যা তিনি আল্লাহর বিধানের তাবলীগ ও প্রচারণার চেষ্টা সাধনায় এবং দীন প্রতিষ্ঠার তৎপরতার ক্ষেত্রে বলতেন। এ কাজে তাঁকে মুসলমানদের জামায়াতের নেতা ও পথ প্রদর্শক হিসেবে বিভিন্ন রকমের অসংখ্য দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হতো। এসব ব্যাপারে অনেক সময় তিনি তার সংগী সাথীদের পরামর্শও গ্রহণ করেছেন, নিজের মতবাদ দিয়ে তাদেও মতও গ্রহণ করেছেন। তাদের জানতে চাওয়ার প্রেক্ষিতে কোন কোন সময় স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, একথা আমি আল্লাহর আদেশে নয়, নিজের মত হিসেবেই বলছি।
তৃতীয় আরেক প্রকার কথা ছিল, যা মানুষ হিসেবে নবী সা: সাধারণ কাজকর্মে বলতেন। নবুয়তের দায়-দায়িত্ব পালনের সাথে এসব কথার কোন সম্পর্ক ছিল না। এ ধরনের কথা তিনি নবী হওয়ার পূর্বেও বলতেন এবং নবী হওয়ার পরেও বলতেন। এ ধরনের কথা সম্পর্কে প্রথমে বুঝে নিতে হবে ঐগুলো নিয়ে কাফেরদের সাথে কোন ঝগড়া বিবদ ছিল না। এসব কথার কারণে তাঁকে পথভ্রষ্ট বা বিপথগামী বলেনি।
# তিনি কবি নন ও গণক নন: আল্লাহ তা’আলা বলেন,“আমি এ (নবী) কে কবিতা শিখাইনি এবং কাব্য চর্চা তার জন্য শোভনীয়ও নয়।”(সুরা ইয়াসীন:৬৯) আল্লাহ তা’আলা বলেন,“এটা একজন সম্মানিত রাসুলের বাণী, কোন কবির কাব্য নয়।”(সুরা হাক্কাহ:৪০) আল্লাহ তা’আলা বলেন: “আর এটা কোন গণকের গণনাও নয়। তোমরা খুব কমই চিন্তা-ভাবনা করে থাকো।”(সুরা হাক্কাহ:৪২) মক্কার কাফেরগণ নবী সা: কে কবি ও গণক বলতো। কিন্তু মহান আল্লাহ তাদের কথার জবাব দিয়েছেন যে,তিনি কবি বা গণক নন। বরং তিনি একজন সম্মানিত রাসুল। সে রাসুল অত্যন্ত শক্তিশালী, আরশের অধিপতির কাছে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী, সেখানে তাঁর কথা গ্রহণ করা হয়, তিনি বিশ্বস্ত ও আমানতদার।
Posted ১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh