বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬ | ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

Weekly Bangladesh নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত

পিয়ন মালিক ৪০০ কোটির অন্যরা কত টাকার?

ডা. ওয়াজেদ খান :   |   বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০২৪

পিয়ন মালিক ৪০০ কোটির অন্যরা কত টাকার?

বাংলাদেশে দুর্নীতি এখন পরিগ্রহ করেছে সর্বগ্রাসী রূপ। রাষ্ট্র এবং সমাজের সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিম্ন সকল পর্যায়ে বিস্তৃতি ঘটেছে দুর্নীতির। একশ্রেনীর মানুষ অবৈধভাবে রাতারাতি বনে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থবিত্তের মালিক। দুর্নীতিবাজরা অভাব নয় স্বভাবগত কারণেই জড়িয়ে পড়ছে দুর্নীতিতে। সীমাহীন লোভ-লালসা এবং ভোগবাদীতায় নিমজ্জিত এসব দুর্নীতিবাজদের হাতে গোটা দেশ ও জাতি আজ জিম্মি। রাষ্ট্রের লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের পাশাপাশি অর্থ ও জাতীয় সম্পদের সিংহভাগ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন তারা।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে রাষ্ট্র নিজেই করেছে পৃষ্ঠপোষকতা। সরকার মাঝে মধ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লোক দেখানো অভিযান পরিচালনা করলেও দুর্নীতির রাঘব বোয়ালরা থেকে যাচ্ছে অধরা। অতি সম্প্রতি রাষ্ট্রের সাংবধানিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তিবর্গ থেকে শুরু করে ড্রাইভার-পিয়নদের নজিরবিহিন দুর্নীতির বিষয়টি উঠে আসছে সংবাদ মাধ্যমে।

বিশেষ করে সাবেক সেনা প্রধান আজিজ আহমেদ, পুলিশের আইজিপি বেনজীর আহমেদ, এনবিআর’র মতিউর রহমান, পিএসসির ড্রাইভার আবেদ আলী এবং সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসার পিয়ন জাহাঙ্গীর আলমের ৪০০ কোটি টাকার মালিকানার সংবাদটি এখন টক অব দ্যা কান্ট্রি। কিন্তু বড় দুর্নীতিবাজদের কাউকেই গ্রেফতার করেনি সরকার একমাত্র ড্রাইভার আবেদ আলী ছাড়া। খুঁটির জোরের দুর্বলতার কারণে তাকে ঢুকতে হয়েছে কারাগারে। সংবাদ মাধ্যমে দুর্নীতিবাজদের সম্পদের ফিরিস্তি নিয়ে সরকারের মন্ত্রী, আমলা এবং আইন শৃংখলা বাহিনী বরাবর এসবের সত্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে নানাভাবে চেষ্টা করছে তাদেরকে দায়মুক্তি প্রদানের।

কিন্তু গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দুর্নীতি সংক্রান্ত একটি বোমা ফাটিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা । দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার সরকারের গৃহীত জিরো টলারেন্স কার্যক্রমের বয়ান দিতে গিয়ে তিনি সামনে এনেছেন নিজের বাসার সাবেক এক কর্মচারীর অবৈধ অর্থ সম্পদের বিষয়টি। প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আমার বাসায় কাজ করেছে, পিয়ন ছিলো, সে এখন ৪০০ কোটি টাকার মালিক। হেলিকপ্টার ছাড়া চলে না। বাস্তব কথা। কি করে বানালো এতে টাকা? জানতে পেরেছি পরেই ব্যবস্থা নিয়েছি।’ এরপর দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি যা যা করছেন তার বর্ণনা দেন এবং স্বভাবসুলভাবে অতীতের সরকারের সমালোচনা করেন তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রশয় দেয়ার অভিযোগ এনে।

দুর্নীতি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী নিজ মুখে কি ভয়ানক তথ্য দিলেন। বিলম্বে হলেও মুখ খুলেছেন তিনি। হয়তোবা মুখ ফস্কে বলে ফেলেছেন পূর্বাপর চিন্তা না করেই। আর এভাবেই নাকি বাতাসে নড়ে উঠে ধর্মের কল। প্রধানমন্ত্রীর অতিশয় বিশ্বস্থ এই হলেন পিয়ন জাহাঙ্গীর আলম। আর দু’চার মাসে এই পিয়ন বনে যাননি ৪০০ কোটি টাকার মালিক। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বলয়ে থেকে প্রধানমন্ত্রীর নাম ভাঙ্গিয়ে এবং সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রভাব খাটিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থবিত্ত হাতিয়েছেন জাহাঙ্গীর আলম। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের টানা চার মেয়াদের প্রথম দুই টার্মের পুরোটা এবং তৃতীয় টার্মের প্রথম কিছু দিন প্রধানমন্ত্রীর পারসোনাল এইড হিসেবে কর্মরত ছিলেন জাহাঙ্গীর।

পিয়ন থেকে তিনি হতে চেয়েছেন এমপি-মন্ত্রী। বাগিয়ে নেন তার নিজ এলাকা নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির পদ। স্ত্রী-শাশুড়িসহ নামে বেনামে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। ঢাকার মিরপুরে রয়েছে বহুতল ভবন, ধানমন্ডিতে আলিশান ফ্ল্যাট। চট্টগ্রাম কর্ণফুলী টানেলের পাশে ১০০ বিঘা জমি, নোয়াখালীর চাটখিল ও মাইজদিতে রয়েছে বহুতল ভবন ও বিঘার পর বিঘা জমি। ব্যাংকে ডিপোজিট তার কয়েকশ কোটি টাকা। নিজ এলাকায় তিনি যখন যেতেন তার গাড়ির সামনে পেছনে থাকত পুলিশের গাড়ি। সেখানে তার নির্দেশেই চলত পুলিশ ও প্রশাসন। থানার ওসি, টিএনওসহ প্রশাসনের সব রদবদল হতো তার ইশারায়। এমপি থাকলেও জাহাঙ্গীরের কথাই সেখানে ছিল শেষ কথা। এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক জাহাঙ্গীর আলম ও তার স্ত্রীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজের নির্দেশ দেয়ার আগেই সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছেন তিনি ।

চাকুরীতে থাকাকালীন জাহাঙ্গীরের চালচলন কার্যক্রম এবং অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর অজানা ছিলো এমনটি ভাবার কোন কারণ নেই। তারপরও আখের গুছিয়েছেন জাহাঙ্গীর। পরবর্তীতে তাকে প্রধানমন্ত্রী ছাঁটাই করলেও দুদক বাজেয়াপ্ত করেনি তার সম্পদ। আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেফতার করে তাকে সোর্পদ করেনি আদালতে। এই পিয়নের সম্পদের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ করায় চক্ষুলজ্জায় হলেও কান খাড়া হয়েছে দুদকের। এভাবেই সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে অতি নিম্ন পর্যায়ের অনেক রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, আমলা ও ক্ষুদে কর্মচারীরা যেখানে রয়েছে সেখান থেকেই সাবার করে দিচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ। দুর্নীতি ও গণতন্ত্রের পারস্পরিক গতি বিপরীতমুখী । দুর্নীতি উপরের দিক থেকে নীচে এবং গণতন্ত্র নীচ থেকে উপরের দিকে ধাবিত হয়। যেমন মাছের পচন ধরে মাথা থেকে। এখন স্বভাবত:ই জনমনে প্রশ্ন উঠেছে প্রধানমন্ত্রীর বাসার একজন পিয়ন যদি ৪০০কোটি টাকার মালিক হয় এবং হেলিকপ্টারে চড়ে বেড়ায়। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী কি দায় এড়াতে পারেন।

বর্তমান সরকারের আমলে বার কয়েক দুর্নীতি বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে এক ধরণের রাজনৈতিক চমক সৃষ্টির প্রয়াশ ছিলো লক্ষ্যণীয়। দুর্নীতির অপরাধে অনেককে আইন আদালতের মুখোমুখি হতে হলেও তা ছিলো সাময়িক। দুর্নীতিবিরোধী সাম্প্রতিক অভিযানে বিচ্ছিন্নভাবে অনেকের নাম এসেছে। তবে বিচার প্রক্রিয়া শুরুর আগেই দেশ ছেড়েছেন বেনজিরের মতো সার্টিফাইড দুর্নীতিবাজ। অন্যান্যরা আছেন গা ঢাকা দিয়ে। সরকারের দুর্বলতার কারণেই সামরিক-বেসামরিক আমলা, রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা অলিখিত লাইসেন্স পেয়ে গেছেন দুর্নীতির। গণতন্ত্রহীনতা ও একদলীয় শাসন ব্যবস্থাকে দীর্ঘায়িত করতে সরকারের নিকট এর কোন বিকল্প ছিলো না। চলমান দুর্নীতি অনিয়ম জায়েজ করেই তারা টিকিয়ে রেখেছে সরকারকে। নির্বাহী, বিচার ও আইন বিভাগের মাঝে নূন্যতম ভারসাম্য নেই এখন।

দেশের সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি সংকটাকীর্ন। সামাজিক বৈষম্য ছাড়িয়ে গেছে সকল রেকর্ড। নাভিশ্বাস উঠেছে জনজীবনে। অপরদিকে অর্থবিত্ত ও ভোগ বিলাসিতায় মত্ত একটি শ্রেনী রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ছে সম্পদের পাহাড়। শত সহস্র কোটি টাকা, শত শত বিঘা জমি, ডজন ডজন ফ্ল্যাট ও সম্পদের অধিকারী দুর্নীতিবাজরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শাসন করছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র। ক্ষমতাসীনদের সাথে সিন্ডিকেট করে তারা ভোগ দখল করছে সবকিছৃু। আইন আদালত এদের আজ্ঞাবহ। বিচার বিভাগের দুর্বলতা ও অনিয়মের কারণে দরিদ্র শ্রেনী জেল জুলুমের শিকার হলেও এরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। আগে হাকিম নড়তো, অনড় থাকতো হুকুম। কিন্তু এখন হাকিম হুকুম দু’টোই নড়ে। দেশের আইন ব্যবস্থা এমন যে, কেউ বাগানের একটি ফুল ছিড়লে তার শাস্তি হয়। কিন্তু যিনি ফুল সহ গোটা গাছ উপড়ে ফেলেন তার কোন শাস্তি হয় না। অপরদিকে ক্ষমতার ছত্রছায়ায় যারা থাকেন তারা বরাবরই সুরক্ষিত।

প্রধানমন্ত্রীর বাসার পিয়ন জাহাঙ্গীর আলম এমনি একজন সৌভাগ্যবান ব্যক্তি। গণভবনের সুরক্ষা থেকেই তিনি তিন পুস্তানের জন্য আখের গুছিয়েছেন। বছর কয়েক আগে গণভবনে কর্মরত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একজন সহকারী প্রেস কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সহস্র কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে রাতারাতি তিনি পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। সৌভাগ্যের এই বরপুত্র এখন সপরিবারে নিউইয়র্কে যাপন করছেন বিলাসী জীবন। গণভবনের প্রায় প্রতিটি কর্মকর্তা কর্মচারীই প্রধানমন্ত্রীর দোহাই দিয়ে প্রভাব খাটিয়ে নামে বেনামে মালিক বনেছেন বিপুল পরিমাণ অর্থবিত্তের। কারো কারো ক্ষেত্রে বিধিবাম হলেও অন্যরা এখনো আছেন বহাল তবিয়তে। এর দায় প্রধানমন্ত্রী বা তার দফতর এড়াবে কি করে? স্বভাবতই তাই প্রশ্ন উঠেছে পিয়ন ৪০০ কোটি টাকার মালিক হলে ভবনটির অন্যান্য কর্মকর্তারা কত টাকার মালিক? পিয়নের সম্পদের পরিমাণ দেখে বহুল প্রচলিত একটি প্রবাদের কথা মনে পড়লো। “ঘনই যদি এত ফাঁক হয়, তাহলে ফাঁক না যেন কত বড় ফাঁক।”

Posted ১২:৪১ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০২৪

Weekly Bangladesh |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  
Dr. Mohammed Wazed A Khan, President & Editor
Anwar Hossain Manju, Advisor, Editorial Board
Corporate Office

86-47 164th Street, Suite#BH
Jamaica, New York 11432

Tel: 917-304-3912, 718-523-6299 Fax: 718-206-2579

E-mail: [email protected]

Web: weeklybangladeshusa.com

Facebook: fb/weeklybangladeshusa.com

Mohammed Dinaj Khan,
Vice President
Florida Office

1610 NW 3rd Street
Deerfield Beach, FL 33442

Jackson Heights Office

37-55, 72 Street, Jackson Heights, NY 11372, Tel: 718-255-1158

Published by News Bangladesh Inc.