জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
আল্লাহ তা’আলা বলেন,“যমীন ও আসমানসমূহের প্রতিটি জিনিসই আল্লাহর তাসবীহ করছে। তিনি মহাপরাক্রমশালী ও অতিশয় বিজ্ঞ।”(সুরা হাদীদ:১) অর্থাৎ বিশ্ব-জাহানের প্রত্যেকটি বস্তু সদা সর্বদা এ সত্য প্রকাশ এবং ঘোষণা করে চলেছে যে, এ বিশ্ব-জাহানের স্রষ্টা ও পালনকর্তা সব রকম দোষ-ত্রুটি,অপূর্ণতা,দূর্বলতা, ভুল-ভ্রান্তি ও অকল্যাণ থকে পবিত্র। তারঁ মহান সত্তা পবিত্র, তাঁর গুণাবলী পবিত্র, তাঁর কাজকর্ম পবিত্র, আপাত দৃষ্টিতে কিছু কাজ-কর্ম আমাদের বোধগম্য হয় না কিন্তু তাঁর একটি গুণবাচক নাম হলো,“হাকিম” অর্থাৎ যে কোন সিদ্ধান্ত বা কাজকর্ম তাঁর বিজ্ঞোচিত লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে গ্রহণ করে থাকেন।
বিভিন্ন মর্মান্তিক ঘটনার ক্ষেত্রে আমাদের অদূরদর্শী চিন্তা-চেতনা থেকে তিনি মহাপবিত্র। তাঁর সমস্ত সৃষ্টিমূলক বা শরিয়াতের বিধান সম্পর্কিত নির্দেশনাবলীও পবিত্র। বিশ্ব-জাহানের প্রতিটি অণু পরমাণূ চিরদিন তার স্রষ্টার পবিত্রতা বর্ণনা করা হয়েছে, আজও করছে এবং ভবিষ্যতেও চিরদিন করতে থাকবে। তারা ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক রাত-দিন তাঁর পরিবত্রতা বর্ণনা করছে। কারণ তিনি আজিজুল হাকিম।
আয়াতের শেষে আজিজুল হাকিম ব্যবহার করায় এর অর্থ দাঁড়ায় এই যে, তিনি মহা পরাক্রমশালী ও অতিশয় বিজ্ঞ শুধু তাই নয়, বরং প্রকৃত পক্ষে তেবলমাত্র তিনিই এমন সত্তা যিনি মহা পরাক্রমশালী ও অতিশয় বিজ্ঞ। আজিজ শব্দের অর্থ পরাক্রমশালী, শক্তিমান ও অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার অধিকারী যার সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন পথিবীর কোন শক্তিই রোধ করতে পারে না, যার সাথে টক্কও নেয়ার সাধ্য নেই, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় যার আনুগত্য সবাইকে করতে হয়, যার অমান্যকারী কোনভাবেই তার পাকড়াও থেকে রক্ষা পায় না। আর হাকিম শব্দের অর্থ হচ্ছে, তিনি যাই করেন জ্ঞান ও যুক্তি বুদ্ধির সাহায্যে করেন। তাঁর সৃষ্টি, তাঁর ব্যবস্থাপনা, তাঁর শাসন, তাঁর আদেশ নিষেধ, তাঁর নির্দেশনা সব কিছুই যুক্তি নির্ভর। তাঁর কোন কাজেই অবহেলা, ঢেলেমি, অজ্ঞতা, বোকামী ও মূর্খতার লেশমাত্র নেই। এই সবগুলো দুর্বলতা থেকে তিনি অতিপবিত্র।
এখানে একটি সুক্ষè বিষয় মুফাসিসরগণ তুলে ধরেছেন যে, আল কুরআন মাজীদের অল্প সংখ্যক স্থানে আল্লাহ তা’আলার গুণবাচক নাম আযীয অর্থাৎ মহাপরাক্রশালী এর সাথে কাবিয়ুন অর্থাৎ নিরংকুশ শক্তির অধিকারী, মুকতাদির অর্থাৎ ক্ষমতাধর, জাব্বার অর্থাৎ আপন নির্দেশনাবলী বাস্তবায়নকারী এবং জুনতিকাম অর্থাৎ প্রতিশোধ গ্রহণকারী শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়েছে যার সাহায্যে তাঁর নিরংকুশ ক্ষমতার প্রকাশ ঘটে। যেখানে বাক্যের ধারাবাহিকতা জালেম ও অবাধ্যদের জন্য আযাবের ভীতি প্রদর্শন দাবী করবে সেখানেই এ ধরনের শব্দ ব্যবহার কর হয়েছে। এ ধরনের হাতে গোনা কতিপয় স্থান বাদ দিলে আর যেখানে আযীয শব্দ ব্যবহার হয়েছে সেখানেই তার সাথে সাথে হাকিম অর্থাৎ অতিশয় বিজ্ঞ, আলীম অর্থাৎ সর্বজ্ঞাত, রহিম অতি দয়ালু, নিয়ামতদানকারী, গাফুর ক্ষমাশীল, ওহহাব অর্থাৎ সার্বক্ষণিক দানকারী এবং হামিদ প্রশংসিত শব্দগুলোর মধ্যে থেকে কোন ব্দ অবশ্যই ব্যবহার করা হয়েছে।
কারণ আমাদের রব তিনি অসীম ক্ষমতার অধিকরী হয়ে যদি নির্বোধ হয়,মূর্খ হয়, দয়া মায়াহীন হয়, ক্ষমা ও মার্জনা আদৌ না জানে, কৃপণ হয় এবং দুশ্চরিত্র তাহলে তার ক্ষমতার পরিণমি জুলুম নির্যাতন ছাড়া আর কিছু কি হতে পারে? পৃথিবীতে যেখানেই জুলুম নির্যাতন হচ্ছে তার মূল কারণ এই যে, যে ব্যক্তি অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছে সে তার শক্তি ও ক্ষমতাকে হয় মুর্খতার সাথে ব্যবহার করেছে, নয়তো সে দয়ামায়াহীন, কঠোর হৃদয় অথবা কুপণ ও সংকীর্ণমনা কিংবা দুশ্চরিত্র ও দুস্কর্মমীল। যে ক্ষেত্রেই শক্তির সাথে এসব দোষ একত্রিত হবে সে ক্ষেত্রেই কোন কল্যাণের আশা করা যায় না। কিন্তু মহান আল্লাহ তা’আলা এ সমস্ত দোষ-ত্রুটি থেকে পবিত্র।
কুরআন মাজীদে আল্লাহর গুণবাচক নাম আযীয এর সাথে তাঁর (হাকিম, আলীম, রাহিম, গাফুর, হামীদ ও ওয়াহহাব) হওয়ার কারণ হলো, মানুষ যাতে জানতে পারে, যে আল্লাহ বিশ্ব-জাহান শাসন ও পরিচালনা করছেন একদিন তিনি এমন ক্ষমতার অধিকারী যে, যমীন থেকে নিয়ে আসমান পর্যন্ত কেউ তাঁর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধা দিতে পারে না। অপরদিকে তিনি হাকীম বা মহাজ্ঞানীও বটে। তাঁর প্রত্যেকটি সিদ্ধান্ত সরাসরি জ্ঞান ও বিজ্ঞতার ভিত্তিতে হয়ে থাকে। তিনি আলীমও। যে ফয়সালাই তিনি করেন তাঁর জ্ঞান অনুসারেই করেন। তিনি হাকীমও। নিজের অসীম ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকে নির্দয়ভাবে ব্যবহার করেন না। তিনি গাফুরও। অধিনস্তদের সাথে ছিদ্রান্বেষণ বা খুঁত ধরা মানসিকতার নয়, বরং ক্ষমাশীলতার আচরণ করে থাকেন। তিনি ওয়াহহাবও। নিজের অধিনস্তদের সাথে কৃপণতার আচরণ করেন না। বরং চরম দানশীলতা ও বদান্যতার আচরণ করেন এবং তিনি হামীদও। তাঁর সত্তার প্রশংসার যোগ্য সমস্ত গুণাবলীর পূর্ণতার সমাহার ঘটেছে।
আল্লাহর সার্বভৌম গুরুত্ব অনুধাবন করার জন্য এ আয়াতের গুরুত্ব অপরিসীম। সার্বভৌমত্ব বলতে বুঝায়, সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তি, অসীম ক্ষমতা ও কর্তত্বের মালিক হবে। তার আদেশ ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টিকারী, তা পরিবর্তনকারী বা পুনর্বিবেচনাকারী কোন আব্যন্তরীর বা বহির্শক্তি থাকবে না এবং তার আনুগত্যকরা ছাড়া কারো কোন উপায়ও থাকবে না। এ অসীম ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের ধারনার সাথে মানুষের বিবেক-বুদ্ধি অনিবার্যরূপেই দাবী করে যে, যিনি এ ধরনের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অধিকারী হবেন তাকে নিস্কলুষ এবং জ্ঞান-বুদ্ধিতে পূর্ণ পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে। কারণ, এরূপ ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব সম্পন্ন লোক নির্বোধ, মূর্খ, দয়ামায়াহীন এবং দুশ্চরিত্র হলে তার সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হওয়া সর্বাত্মক জুলুম ও বিপর্যয় সৃষ্টি করবে।
এ কারণে যেসব দার্শনিক কোন মানুষ বা মানবীয় প্রতিষ্ঠান কিংবা কোন একদল মানুষকে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বলে মনে করেছে তাদেরকে একথাও ধওে নিতে হয়েছে যে, তার ভুলত্রুটির উর্ধে হবে। কিন্তু এ কথা স্পষ্ট যে, কোন মানবীয় কর্তত্ব বাস্তবে যেমন কখনো এরূপ নিরঙ্কুস ও সীমাহীন সার্বভৈৗম ক্ষমতা লাভ করতে পারে না তেমনি কোন বাদশাহ বা পার্লামেন্ট, জাতি কিংবা পার্টি সীমিত পরিসরে যে সার্বভৌম ক্ষমতা লাভ করে তা নির্ভুল পন্থায় কাজে লাগানোও তার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, এমন যুক্তিবুদ্ধি যার মধ্যে অজ্ঞতার লেশমাত্র নেই এমন জ্ঞান যা সংশ্লিষ্ট সব সত্যকে পরিব্যপ্ত করে-কোন একজন মানুষ, একক কোন প্রতিষ্ঠান বা কোন জাতির ভাগ্যে জুটে যাওয়া তো দুরের কথা, সম্মিলিতভাবে গোটা মানব জাতিও লাভ করেনি। অনুরূপভাবে মানুষ যতক্ষণ তার পক্ষে নিজের স্বার্থপরতা, ইন্দ্রিয়পরায়ণতা, ভয়ভীতি, লোভলালসা, ইচ্ছা আকাংখা, পক্ষপাতিত্ব, আবেগ তাড়িত সন্তুষ্টি ও ক্রোধ এবং ভালবাসা ও ঘৃণা করা থেকে উর্ধে উঠাও সম্ভবপর নয়।
এসব সত্যকে সামনে রেখে কেউ যদি গভীরভাবে চিন্তা করে তাহলে সে উপলব্ধি করবে যে, এ বক্তব্যের মধ্যে কুরআন প্রকৃতপক্ষে সার্বভৌমত্বের সঠিক ও পুর্ণাঙ্গ ধারণা পেশ করেছে। কুরআন বলছে: আযীয এ বিশ্ব-জাহানে অর্থাৎ নিরংকুশ ও অসীম ক্ষমতার অধিারী আল্লাহ তা’আলা ছাড়া আর কেহ নেই। আর কেবল তিনিই সীমাহীন এই ক্ষমতা ও কর্তত্বের অধিকারী একমাত্র সত্তা যিনি ‘নিস্কলুষ’ ‘হাকীম’ ও ‘আলিম’ ‘রাহীম’ ও গাফুর এবং হামীদ ও ওয়াহহাব।
Posted ২:৪৫ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh