| বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলের অন্ধকার যুগ পেরিয়ে আলোর পথে যাত্রা শুরু করেছে বাংলাদেশ। এই সময়ের মধ্যে বিরোধীদলগুলোর অসংখ্য নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষকে রক্ত দিতে হয়েছে। ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে প্রায় দেড় হাজার সাধারণ মানুষকে শহীদ হতে হয়েছে। প্রায় ত্রিশ হাজারের মতো মানুষ চিরতরে অন্ধ ও পঙ্গু হয়ে গেছে। দেশের গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সব শ্রেণী-পেশার হাজার হাজার মানুষ অকাতরে জীবন বিলিয়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনার অন্ধকার যুগের অবসান ঘটিয়ে দেশকে আলোর পথ দেখিয়েছে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের এক ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হলো। এ দিনটির জন্য দীর্ঘ দেড় দশক দেশের নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষ অপেক্ষা করেছে। তাদের সেই অপেক্ষার অবসান হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সবদিক দিয়ে বিধ্বস্ত দেশকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরাতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতি অত্যন্ত ধৈর্য ধরে মোকাবেলা করে দেড় বছর পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি তার প্রতিশ্রুত ও কাংক্ষিত ‘ইতিহাসের সেরা এবং দৃষ্টান্ত স্থাপনকারি’ নির্বাচন উপহার দিয়েছেন। এজন্য আমরা তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। তাঁর এই অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ইতিহাসের সেরা এই নির্বাচন করতে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান, সশস্ত্র বাহিনী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন ও নির্বাচন কমিশন, আইনশঙ্খলা বাহিনী সর্বোপরি বিএনপিসহ ফ্যাসিবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সহায়তা ছিল অতুলনীয়। তাদের প্রত্যেককে আমরা ধন্যবাদ জানাই।
বিএনপি ও বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকার ও বিরোধীদলের এটি একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। রাজনীতিতে এটি একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করেছে। এর মাধ্যমে দেশে সুযোগ-সুবিধার নয়, সততার রাজনীতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এতে দেশের প্রচুর অর্থ সাশ্রয় হবে, যা মানুষের জীবনমানের উন্নয়নে সহায়তা করবে। সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও বিরোধীদলের এমপিদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা না নেয়ায় যে অর্থ সাশ্রয় হবে, তা সাধারণ মানুষের কাজে লাগবে। দেশের এখন প্রধানতম সমস্যা অর্থনৈতিক সংকট। স্বৈরাচার হাসিনা দেশের অর্থনীতিকে ফোকলা করে গিয়েছিল। সেই জায়গা থেকে অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে সবল করতে পারেনি। ফলে সাধারণ মানুষ নিদারুণ অর্থকষ্টে পড়েছে। তাদের চলার মতো টাকা নেই। কোনো রকমে দিনযাপন করছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রফতানি, শিল্পোৎপাদনসহ অর্থনীতির সব সূচক নিম্নগামী। বিনিয়োগ নেই, কর্মসংস্থান নেই, বেকারের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে, মানুষের আয় কমে গেছে। নতুন সরকার এই শোচনীয় অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। এ থেকে উত্তরণই তার মূল চ্যালেঞ্জ রোজা শুরু হয়েছে।
রোজায় মানুষের জীবনযাপনের ধরন যেমন বদলায়, তেমনি খরচও বেড়ে যায়। এ সময় দ্রব্যমূল্য মানুষের হাতের নাগালের বাইরে চলে যায়। অসাধু ব্যবসায়ি সিন্ডিকেট পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটও দেখা দেয়। নতুন সরকারকে দায়িত্ব নিয়েই মানুষের দুর্ভোগের এই শঙ্কা কাটাতে উদ্যোগী হতে হবে। মানুষ যাতে স্বস্তির সাথে রোজা পালন করতে পারে, এ ব্যবস্থা করতে হবে। বলা বাহুল্য, ‘ফার্স্ট ইম্প্রেশন ইজ দ্য বেস্ট ইম্প্রেশন’। জনগণকে তার ‘ফার্স্ট ইমপ্রেশন’ দিয়ে সন্তুষ্ট করতে হবে। অর্থনীতিবিদরা বারবার বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার যে অর্থনীতি রেখে যাচ্ছে, তা নতুন সরকারের উপর বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। এ সরকারের সময়ে এডিপি বাস্তবায়ন বিগত বছরগুলোর তুলনায় সবচেয়ে কম হয়েছে। বলা যায়, সরকার অর্থনীতিকে এক বেহালদশায় রেখে যাচ্ছে। অর্থনীতির এই পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটিয়ে চাঙ্গা করা নতুন সরকারের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে যতই চ্যালেঞ্জ হোক না কেন, তা মোকাবেলায় বিএনপিকে উপযুক্ত দল মনে করে জনগণ নিরঙ্কুশ বিজয় দান করেছে। বিএনপি সরকারকে এ কথাটি মনে রেখে, সবার আগে অর্থনীতিকে সবল করার উদ্যোগ নিতে হবে। দেশের মানুষকে স্বস্তি দিতে হবে। মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। তারা যাতে তিনবেলা সন্তুষ্টির সাথে খেতে পারে, এ ব্যবস্থা করতে হবে। বেকারদের কর্মসংস্থানের পথ করে দিতে হবে। দেশের মানুষকে নিশ্চিন্তে চলার নিরাপত্তা দিতে হবে। দেশকে আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্রের দিকে নেয়ার কর্মযজ্ঞ শুরু করতে হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ কাজ সরকারের একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। এজন্য সংসদের বিরোধীদলগুলোকে সরকারের ভুল-ত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে সঠিক পথে চলতে সহযোগিতা করতে হবে।
শুধু বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা নয়, যথার্থ ও সঠিক জায়গায় বিরোধিতা এবং সংশোধনের পরামর্শ দিতে হবে। দেশের অর্থনৈতি পুনর্গঠনে সরকারকে তাদের সর্বোতভাবে সহযোগিতা করতে হবে। শুধু ‘সংস্কার সংস্কার’ করে সংসদ ও মাঠ গরম করলে দেশ ও জনগণের কোনো উপকার হবে না। জনগণ ভালো থাকলে সংস্কারও হবে। ভঙ্গুর অর্থনীতিকে কীভাবে শক্তিশালী করা যায়, তা অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারের উদ্যোগকে সমর্থন ও পরামর্শ দিতে হবে। এবারের নির্বাচন শুধু ভোট পাওয়ার নির্বাচন নয়, এটি দেশের ভবিষ্যত নির্ধারণের নির্বাচন। জনগণ সেই ভবিষ্যতের রূপরেখা দিয়েছে। তাদের এই প্রত্যাশা পূরণে সরকার ও বিরোধীদলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
Posted ১১:৫৪ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh