| বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬
পবিত্র মাহে রমজানের সিয়াম সাধনার পর আনন্দের বার্তা নিয়ে আবারও এসেছে ঈদ-উল-ফিতর। বিশ্ব মুসলিমের কাছে আনন্দের বড় উৎসব। ঈদ মুসলিম চেতনায় আনে উচ্ছাস। কিন্তু ঈদ শুধু আনন্দ উৎসব নয়, ঈদ মানে এক মাসব্যাপী আত্মশুদ্ধির পর মানবতা ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য উপল। ঈদুল ফিতর মুসলমানদের জন্য একই সঙ্গে আনন্দোৎসব ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের ইবাদত। এই আনন্দ কেবল ব্যক্তিগত ভোগ বা বাহ্যিক উদ্যাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ঈদের প্রকৃত তাৎপর্য লুকিয়ে থাকে মানুষের ধর্মীয় ও মানবিক চেতনায় এবং হৃদয়ের গভীরে জাগ্রত মানবিক মূল্যবোধে। এবারের ঈদের তাৎপর্য বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে নতুন এক সরকার। প্রায় দুই দশকের পীড়ক সরকারের হাতে নিপীড়িত নিপিষ্ট হওয়ার পর নতুন সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। নতুন সরকারের জন্য এটি প্রথম ঈদ এবং ঈদ উৎসবকে তারা জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের উপলক্ষ হিসেবে গ্রহণ করে আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করবেন, যাতে আল্লাহ তাদের মাধ্যমে দেশ ও জাতির কল্যাণ সাধন করান। ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে এবং সমগ্র বিশ্বজুড়ে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ওই অঞ্চলের অধিকাংশ দেশ মুসলিম অধ্যুষিত। প্রতিটি দেশের মানুষ উদ্বেগ-আতঙ্কে কাটাচ্ছে এবং অবিলম্বে যুদ্ধাবসানের জন্য যুদ্ধে লিপ্ত সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতি আহবান জানাচ্ছে। যুদ্ধের কারণে তাদের জীবনে ঈদ কোনো আনন্দ নিয়ে আসবে না। বিশ্ববাসী যুদ্ধরত দেশগুলোর নেতাদের সুবুদ্ধি জাগ্রত হওয়ার জন্য সদা প্রার্থনা করছে। ঈদ আমাদের মনে করিয়ে দেয় সমাজের সেইসব মানুষের কথা, যারা অর্থনৈতিক কষ্টে দিনযাপন করে।
ইসলাম ধর্মের মূল শিক্ষা হলো সহমর্মিতা ও সাম্য-ভ্রাতৃত্ব। ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই আনন্দে অংশীদার হয়। যাকাত, ফিতরা ও দান খয়রাতের মাধ্যমে এই সমতার চর্চাই ঈদের প্রকৃত চেতনা। বিভেদহীন সাম্যের যাত্রায় ঈদ মানবিকতার বিশুদ্ধ উৎসব। বর্তমান সমাজে ভোগবাদিতা ও প্রতিযোগিতার প্রবণতা মানুষের অন্তরের মানবিকতাকে অনেক সময় আড়াল করে দেয়। ঈদের উৎসবও কখনো কখনো বাহ্যিক আড়ম্বরের প্রতিযোগিতায় রূপ নেয়। অথচ ঈদের আসল শিক্ষা হলো সংযম, কৃতজ্ঞতা ও আত্মবিশ্লেষণের মাধ্যমে সুন্দর আদর্শ শান্তির সমাজ গড়ে তোলা। আমাদের উচিত এই দিনটিকে শুধু আনন্দ উৎসবে সীমাবদ্ধ না রেখে আত্মজিজ্ঞাসারও উপলক্ষ হিসেবে দেখা। ব্যাক্তি হিসেবে নিজে কতোটা মানবিক, কতোটা ন্যায়পরায়ণ, কতটা সহমর্মী হতে পেরেছি? সে বিষয়ে গভীর আত্মোপলব্ধি জাগ্রত করা প্রয়োজন। ঈদের আনন্দ পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে। দূরে থাকা আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে দেখা হয়, ভাঙা সম্পর্ক মেরামতের সুযোগ তৈরি হয়। ঈদের মাঠে কিংবা এইদিনে পরস্পরের সাথে আন্তরিক কোলাকুলি কিংবা ক্ষমা চাওয়ার মধ্য দিয়েই দূর হয়ে যায় দীর্ঘদিনের অভিমান। এই মিলনমেলার মধ্যেই নিহিত রয়েছে ঈদের গভীর মানবিক তাৎপর্য। একই সঙ্গে ঈদ আমাদের জাতীয় ও সামাজিক চেতনার সঙ্গেও যুক্ত। ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন মত কিংবা ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মধ্যেও এই উৎসব সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশে ঈদের উৎসব বহুদিন ধরেই সামাজিক সৌহার্দ্য ও সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এই উৎসব মানুষকে মনে করিয়ে দেয় মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে মানুষ। কবি নজরুল ইসলামের ভাষায় – ‘আজ ভুলে যা তোর দোস্ত-দুশমন, হাত মেলাও হাতে, তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরিদ।’ ঈদের আনন্দকে কেবল ব্যক্তিগত আনন্দে সীমাবদ্ধ না রেখে আমাদের উচিত তা মানবিক চেতনার আলোয় আলোকিত করা। প্রতিবেশীর দুঃখে পাশে দাঁড়ানো, অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং সমাজে ন্যায় ও সহমর্মিতার চর্চা বাড়ানো। মানবিকতার মধ্যেই ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশ পায়। ঈদ আসুক হৃদয়ের দরোজা খুলে দেওয়ার আহ্বান হয়ে। আনন্দের এই উৎসব আমাদের চেতনাকে জাগ্রত করুক মানবিকতার আলোয়। সত্যিকারের মানবিক দায়িত্বশীলতায় ঈদের আনন্দ হবে সত্যিকার অর্থে পরিপূর্ণ, আর সমাজে ছড়িয়ে পড়বে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও শান্তির নির্মল বার্তা। ঈদ আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে, ঈদ হোক সর্বজনীন সামাজিক ধর্মীয় উৎসব।
Posted ১১:১৭ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh