| বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত
ইরানে বিপ্লবী সরকারের বিরুদ্ধে জনবিক্ষোভ দমন করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যর্থ হওয়ায় তাদের দমনে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকেও সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। বিক্ষোভে ইতোমধ্যে বহু লোক নিহত হয়েছে। পাশ্চাত্যের গণমাধ্যমসমূহ নিহতের সংখ্যা ২,০০০ থেকে ১২,০০০ বলে উল্লেখ করেছে। হতাহতের সংখ্যা যাই হোক না কেন, ইরানের পরিস্থিতি খুবই মারাত্মক।
পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ইরানের ইসলামী সরকারকে উৎখাত করার জন্য চেষ্টারও ঘাটতি নেই। সবমিলিয়ে ইরানের পরিস্থিতি ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর এযাবতকালে যত বিদ্রোহ ঘটেছে সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জটিল। বিপ্লবে ইরানের শেষ শাহ, মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পতনের পূর্বে পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করিয়া তৎকালীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের প্রশাসন তার শাসনের বেশ কিছু বিষয়ে কঠোর সমালোচনা শুরু করে। শাহের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা ‘সাভাক’ কর্তৃক রাজনৈতিক বন্দিদের উপর অমানবিক নির্যাতন এবং নির্বিচারে হত্যার কঠোর সমালোচনা করা হয়।
সেই সময় শাহের হাতে ক্ষমতার অতি-কেন্দ্রিকতা এবং দেশটিতে কোনো কার্যকর রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষ থাকতে না দেওয়া, শাহ ও তাহার পরিবারের বিলাসিতা এবং তৈলের টাকার অসম বণ্টন লইয়া পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলি সরব ছিল। শাহের দ্রুত আধুনিকায়ন বা ‘শ্বেত বিপ্লব’ ইরানি সমাজের রক্ষণশীল অংশকে ক্ষুব্ধ করেছিল, যা পশ্চিমা লিবারেল সমাজও দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করিত। ২০২৬ সালে এসে বর্তমান ইরান সরকারের প্রতি পশ্চিমা বিশ্ব কী ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে তা দেখার বিষয়। অতি সম্প্রতি ইরানি রিয়ালের নজিরবিহীন দরপতন এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির জন্য সরকারের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা হয়, যদিও বহু বৎসর ধরে পশ্চিমা নানা নিষেধাজ্ঞার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকগণ মনে করেন। তবে এতে ইরানের সর্বত্র সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৫ সালে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে একটি সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের পর পশ্চিমা বিশ্ব নূতন করিয়া অভিযোগ করতে শুরু করে যে, ইরান গোপনে আবারও পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে।
এই বছরের শুরু থেকে ইরানে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর বলপ্রয়োগ এবং ফাঁসি কার্যকরের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানের শাসনব্যবস্থাকে ‘খুনি শাসন’ হিসাবে অভিহিত করে। এর আগে ২০২৫ সালের জুন মাসে ইসরাইল-ইরান সরাসরি যুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, ইরান যদি আবারও পারমাণবিক কর্মসূচি শুরু করে, তাহলে দেশটিকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা হবে। তখন তিনি হুমকি দিয়ে বলেন যে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করা কোনো বিষয় নয়। তিনি ‘আমেরিকার জন্য একেবারেই সহজ লক্ষ্য’। কিছুদিন পূর্বে ইরান সরকারকে হুঁশিয়ার করে তিনি বলেছেন, ‘বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি চালাবেন না, যুক্তরাষ্ট্র কঠোর ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।’ বর্তমানে ইরানের সাবেক শাসক মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত রেজা পাহলভিকে ট্রাম্প প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের পরবর্তী শাসক হিসাবে ঘোষণা না করলেও সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি তাকে ‘ভালো মানুষ’ বলে বর্ণনা করেছেন।
ইরানে ১৯৭৯ সালে শাহের পতন এবং ইসলামি বিপ্লব দেশটির ইতিহাসে এক মোড়বদলকারী ঘটনা। এটি ছিল বিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বিপ্লবে প্রায় আড়াই হাজার বৎসর ক্ষমতায় থাকার পর ইরানের রাজবংশের পতন ঘটেছিল। বিভিন্ন বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে তিনি ধীরে ধীরে জনসমর্থন হারান। রেজা পাহলভি ১৯৬৭ সালে নিজেকে ইরানের সম্রাট ঘোষণা করলে এবং ১৯৭৬ সালে ইসলামিক ক্যালেন্ডারের পরিবর্তে রাজকীয় ক্যালেন্ডার চালু করিলে জনঅসন্তোষ ও ধর্মীয় বিরোধিতা বাড়তে থাকে। ১৯৭৮ সালে ইরানে যখন চরম অস্থিরতা ও সহিংসতা শুরু হয়, তখন পশ্চিমা বিশ্ব বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানায়। নির্বাসিত ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে এখন ইরানে চলমান বিক্ষোভ ও অস্থিরতা সেই ৪৬ বৎসর পূর্বের কাহিনি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। শুধু পার্থক্য এই যে, তখন ইরানের শাসনক্ষমতায় ছিলেন শাহানশাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি, এখন ক্ষমতায় আছে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।
Posted ২:৪৩ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh