| বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারি ২০২৬
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচন কি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের সুযোগ, অথবা অতীতের ‘সূক্ষ্ম কারচুপির’ আশঙ্কার পুনরাবৃত্তি। ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা স্পষ্ট জানাচ্ছে, বৈধতা ছাড়া স্থিতিশীলতা টেকে না। বাংলাদেশে নির্বাচন কখনোই কেবল একটি তারিখের ঘটনা নয়। এটি রাষ্ট্রক্ষমতার বৈধতা, শাসনব্যবস্থার চরিত্র এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পরীক্ষার ক্ষণ।
১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে তাই নতুন করে সামনে এসেছে একটি পুরনো কিন্তু মীমাংসিত প্রশ্ন : এই নির্বাচন কি ২০০৮ সালের মতো আরেকটি ‘সূক্ষ্ম নির্বাচনী কারচুপি’র পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ বা না- এই সরল দ্বৈধতায় সীমাবদ্ধ নয়। এর গভীরে নিহিত আছে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ক্ষমতা ব্যবস্থাপনার কৌশল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিকীকরণ এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ।
২০০৮ সালের নির্বাচন যেমন কেবল ভোটের দিনের ঘটনা ছিল না, তেমনি ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনও শুধু একটি তারিখে সীমাবদ্ধ নয়। এটি বহুবিধ রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের সমন্বয়ে একটি সম্ভাব্য সঙ্কটময় মুহূর্ত। ২০০৮ সালের নির্বাচন বহুল আলোচিত। ভোটার উপস্থিতি ছিল নজিরবিহীন, প্রকাশ্য সহিংসতা তুলনামূলক কম এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও এসেছিল। সে সময় এটিকে অনেকেই ‘সেরা নির্বাচন’ হিসেবে প্রচার করেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে রাজনৈতিক ও একাডেমিক বিশ্লেষণে উঠে আসে ভিন্ন চিত্র। প্রকাশ্য ব্যালট কারচুপির অভিযোগ না থাকলেও নির্বাচনের অনেক আগেই প্রশাসনিক ভারসাম্য নির্ধারণ করা হয়, শক্ত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কাঠামোগতভাবে দুর্বল করা হয় এবং নির্দিষ্ট ফলাফলের জন্য পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়।
এটিই ছিল ‘সূক্ষ্ম নির্বাচনী কারচুপি’ যেখানে ব্যালট বাক্সের চেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল নির্বাচনের পরিবেশ, প্রতিযোগিতা ও রাজনৈতিক বয়ান। ভোটের দিনটি শান্তিপূর্ণ ছিল; কিন্তু ভোটের আগেই রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং শক্তির ভারসাম্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ, ২০০৮ সালের নির্বাচন ‘প্রকাশ্য স্বচ্ছ’ ছিল; কিন্তু কাঠামোগতভাবে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা সীমিত করা হয়েছিল। এই প্রক্রিয়াটি পরবর্তীতে শুধু বাংলাদেশেই নয়, দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশে দেখা গেছে, যেখানে নির্বাচন হয়েছে; কিন্তু গণতন্ত্রের প্রকৃত বিকল্প সীমিত ছিল। আজকের বাংলাদেশ দুই দশক আগের বাংলাদেশ নয়। সমাজ বদলেছে, প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রবাহ দ্রুততর হয়েছে, রাজনৈতিক সচেতনতা বেড়েছে। তবুও, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঘিরে যখন একই ধরনের আশঙ্কা ফিরে আসে, তা নিছক অতীতভীতি বলে উড়িয়ে দেয়া যায় না।
এই আশঙ্কার কাঠামোগত কারণ রয়েছে, যা বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া, প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক অবস্থানকে সরাসরি স্পর্শ করছে। কারণ নির্বাচন কেবল নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হয় না। এটি নির্ভর করে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচারব্যবস্থা ও স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামোর ওপর। বাংলাদেশে এসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত। ফলে, সরাসরি ভোট জালিয়াতি না হলেও, মামলা-মোকদ্দমা, অনুমতি-নিষেধ, নিরাপত্তাব্যবস্থার অসম প্রয়োগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পক্ষপাত- এসবের মাধ্যমে নির্বাচনী মাঠ একপেশে করে তোলার সুযোগ থেকে যায়।
প্রক্রিয়াটি দৃশ্যমান নয়; কিন্তু নির্বাচনের ফলাফলে গভীর প্রভাব ফেলে। ২০০৮ সালের নির্বাচন ছিল তুলনামূলকভাবে সরল। রাষ্ট্রের হাতে সীমিত নিয়ন্ত্রণের উপকরণ ছিল, ভোটের দিন কেন্দ্র দখলের প্রয়োজন থাকত এবং প্রকাশ্য কারচুপির চ্যালেঞ্জও তুলনামূলকভাবে সহজে নজরে আসত। তবে ২০২৬ সালের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আধুনিক প্রযুক্তি, আইনি কাঠামো এবং সামাজিক ভয়ের সংস্কৃতি একত্র হয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ‘নীরব কারচুপির’ নতুন রূপ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাস একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়- ভোট শান্তিপূর্ণ হওয়া মানেই গণতান্ত্রিক বৈধতা নিশ্চিত নয়। বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারি বা অন্যান্য জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এই শিক্ষা প্রাসঙ্গিক- গণতন্ত্রের শক্তি নির্ভর করে ভোটের আগে তৈরি রাজনৈতিক পরিবেশের ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতায়, কেবল ব্যালট বাক্সে নয়। ১২ ফেব্রুয়ারি শুধু একটি তারিখ নয়। এই নির্বাচন যদি জনগণের ক্ষমতা পরিবর্তনের বাস্তব সুযোগ না দেয়, তবে এটি হবে সূক্ষ্ম কারচুপির আধুনিক সংস্করণ। শান্তিপূর্ণ দেখালেও এটি গভীরভাবে অস্থিরতার বীজ বপন করবে। গণতন্ত্রের শক্তি ভোটের বাক্সে নয়; তা নিহিত থাকে প্রতিযোগিতার ন্যায্যতায়।
Posted ১২:২০ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারি ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh