| বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ছবি : সংগৃহীত
মালয়েশিয়ায় সংক্ষিপ্ত রাষ্ট্রীয় সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখন রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে চীনে রয়েছেন। গত ফেব্রুয়ারি মাসে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি প্রথমবার সফরে গেছেন। মালয়েশিয়ায় তার সফর সৌজন্য সফর হলেও তার চীন সফর শুধু কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশ-চীন স¤পর্কের এক ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক স¤পর্ক প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দূরদর্শী নেতৃত্বে চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও কূটনৈতিক ভারসাম্য দক্ষতার সাথে বজায় রাখা হয়েছিল। এই ধারাবাহিকতার প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর দুই দেশের স¤পর্কে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় চীনের রাজনৈতিক অর্থনীতি বহুল আলোচিত ও প্রভাবশালী মডেল। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদ, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা এবং অবকাঠামোকেন্দ্রিক উন্নয়ন মডেলের মাধ্যমে চীন বিশ্ব অর্থনীতিতে এক পরাক্রমশালী অবস্থান তৈরি করেছে।
এই মডেলের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখলেও বেসরকারি খাতকে সমানভাবে উৎসাহিত করে। অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও ব্যাংকিং খাতে চীনের এই সমন্বিত নীতি দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল একটি দেশের জন্য চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা বহুমাত্রিক সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সামরিক খাত, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ সফরের মধ্য দিয়ে দেশের সড়ক, রেলপথ, সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎ, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে, যা দেশের অর্থনীতিকে আরও ত্বরান্বিত করবে।
বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষ জনশক্তির অভাব ও অবকাঠামোগত ঘাটতি। চীনের সহযোগিতায় বিভিন্ন মেগা প্রকল্প, যেমন আধুনিক সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বিশেষ শিল্পাঞ্চল বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি প্রযুক্তি ও উন্নত প্রশিক্ষণ বিনিময়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে দক্ষ মানবস¤পদ গড়ে তোলা সম্ভব। বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ অংশীদার। তৈরি পোশাক, চামড়া ও কৃষিপণ্য রপ্তানির বিপরীতে বাংলাদেশ চীন থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও উন্নত প্রযুক্তি আমদানি করছে, যা দেশের শিল্পায়নকে গতিশীল রাখছে। চীনের সাথে এই স¤পর্কের ক্ষেত্রে কিছু কৌশলগত চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা এড়ানো, বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক চাপ, বিশেষ করে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সমীকরণে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য বিবেচ্য। তাই, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক স¤পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্ব ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক স¤পর্ক বজায় রাখা অপরিহার্য।
এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেশ কিছু কার্যকর ও বাস্তবসম্মত কৌশল গ্রহণ করতে পারেন। বাংলাদেশকে চীনের বিনিয়োগ এমনভাবে কাজে লাগাতে হবে, যা সরাসরি আমাদের রপ্তানি বৃদ্ধি, শিল্পায়ন ও ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে এবং তা যেন কেবল ঋণনির্ভর প্রকল্পে সীমাবদ্ধ না থাকে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং ভারতের সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ট্রানজিট ও জ্বালানি সহযোগিতা বাড়িয়ে একটি ‘উইন-উইন’ বা উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মূল দূরদর্শিতা হবে বাংলাদেশকে কোনো ‘ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র’ না বানিয়ে একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা। একটি বাস্তববাদী নীতি, দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত এবং নিখুঁত কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র, এই তিন পক্ষের সঙ্গেই সুস¤পর্ক বজায় রেখে দেশের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গতিতে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
Posted ৩:৩৪ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh