| বৃহস্পতিবার, ১৩ মার্চ ২০২৫
প্রতীকী ছবি
সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে ধর্ষণ, বিশেষ করে শিশুধর্ষণ নজীরবিহীনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ধর্ষণের ঘটনায় শিশুমৃত্যুর ঘটনাও বেড়েছে আংশঙ্কাজনকভাবে। বাংলাদেশের সংবাদপত্রে প্রতিদিনই থাকে ধর্ষণের একাধিক খবর। খবরের বাইরে আড়াল হয়ে থাকা ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশিত ঘটনার চেয়ে যে আরও বেশি সে সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই। সম্প্রতি মাগুড়ায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে বোনের বোনের শ্বশুর আছিয়া নামে আট বছরের এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। শিশুটি এখন হাসপাতালে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বিক্ষোভ প্রতিবাদ চলছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতিই ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধকে উৎসাহিত করছে এমন বললে বোধহয় খুব বাড়িয়ে বলা হবে না। আফগানিস্তানকে আমাদের অনেকে বর্বরদের দেশ বলে বিবেচনা করি। সেই আফগানিস্তানে ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত দায়ী প্রমাণিত হলে ঘটনার চার দিনের মধ্যে তাকে মাথায় গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। বাংলাদেশে ২০২০ সাল থেকে ধর্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু ধর্ষণে দায়ী কারো মৃত্যুদণ্ড হওয়া তো দূরের কথা ধর্ষণের অভিযোগে সারাদেশে দায়েরকৃত দেড় লক্ষাধিক মামলার বিচারে কোনো অগ্রগতি নেই। অভিযুক্তদের বেশির ভাগ গ্রেফতার এড়িয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিচারের অবস্থা যদি এমন হয়, তাহলে ধর্ষণের হার কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। গবেষণা রিপোর্ট অনুযায়ী প্রতি চব্বিশ ঘণ্টায় অন্তত ৯ জন নারী ধর্ষিত হচ্ছেন বাংলাদেশে। এর মধ্যে মামলা হিসেবে কটি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে তা নিয়েও সন্দেহ আছে।
ধর্ষণের অত্যাচার নীরবে সহ্য করাই সামাজিক রীতিতে পরিণত হয়েছে। দু’একটি ঘটনায় গ্রাম্য সালিশে ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষিতার বিয়ে দেওয়ার প্রথাও আছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় যৌনতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দীর্ঘকালীন প্রথা ও সংস্কৃতি মেয়েদের মেনে নিতে বাধ্য করেছে, যার ফলে তাদের জীবন যেন এক সন্ত্রাসের জগতে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। দার্শনিক মিশেল ফুকো ধর্ষণকে যৌনতা থেকে আলাদা করে একটি সহিংস অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে বলেছেন। সমাজে এ দর্শন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এর পাশাপাশি, নারী নির্যাতনের এই ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে সরকারের পাশাপাশি প্রত্যেক সচেতন নাগরিককে যার যার জায়গা থেকে এগিয়ে আসতে হবে। নির্যাতনকারীকে সম্মিলিতভাবে সমাজ থেকে বয়কট করার পাশাপাশি জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে এবং নির্যাতনকারীদের বিচারের মুখোমুখি করে অপরাধভেদে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যে দেশের মেয়েরা নিজ যোগ্যতার ভিত্তিতে দেশবিদেশে গুরুত্বপূর্ণ কাজে সফলতা অর্জন করছে, নারীর ক্ষমতায়নের জন্য যে দেশের সরকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কারসহ নানা মর্যাদাকর সম্মাননা অর্জন করছে; সে দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গণমাধ্যমে নারী নির্যাতনের অসংখ্য ছবি ভেসে বেড়াবে এটা খুবই দুঃখজনক। যদিও যে খবরগুলো এখানে আসছে তা অনেক কম। ১০০ জন নারী নির্যাতিত হলে সামনে আসছে হয়তো ২০-৩০ জনের খবর। নারী নির্যাতন বলতে আমরা কেবল শারীরিক নির্যাতনকেই হিসেবে নিচ্ছি, কিন্তু এর বাইরেও আরেক রকমের নির্যাতন আছে যা প্রায় সব পরিবারেই কম বেশি সহ্য করতে হচ্ছে নারীদের। নারীর প্রতি মানসিক নির্যাতন প্রতিরোধে কোনো আইন না থাকলেও শারীরিক নির্যাতন প্রতিরোধে বেশ শক্ত আইন আছে দেশে।
যদিও তা সত্ত্বেও নারী নির্যাতনের ভাইরাস কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গত পাঁচ বছরে দেশে অন্তত ছয় হাজার ৩০৫ জন নারী-শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে তিন হাজার ৪৭১ জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু রয়েছে। চলতি বছরের গত দুই মাসে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে কমপক্ষে ১০৭ জন। যাদের মধ্যে ৬৬ জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু রয়েছে। বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটি দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুসন্ধান করে এসব তথ্য সংগ্রহ করেছে। এই পরিসংখ্যান কেবল রিপোর্ট হওয়া ঘটনাগুলোর চিত্র তুলে ধরে। বাস্তবে, ধর্ষণের শিকার অনেক শিশু ও তার পরিবার সামাজিক লজ্জা, হুমকি ও বিচারহীনতার কারণে মামলা করতেই পারে না। ফলে প্রকৃত সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই আরও অনেক বেশি হবে। ধর্ষণ বন্ধ করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষার প্রসার। পরিবার থেকেই শিশুদের সুস্থ মূল্যবোধ ও পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধ শেখাতে হবে। পাশাপাশি, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধকে কাজে লাগিয়ে মানুষকে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে উৎসাহিত করতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগ অপরিহার্য। ধর্ষণের শাস্তি দ্রুত কার্যকর করতে হবে, যাতে অপরাধীরা ধর্ষনের দুঃসাহস না পায়। বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা অপরাধীদের প্রশ্রয় দেয়, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এছাড়া, সমাজে ভুক্তভোগীদের প্রতি দোষারোপের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে, যাতে তারা নির্ভয়ে ন্যায়বিচারের জন্য লড়তে পারে। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে ধর্ষণের এই ভয়াবহ মহামারী রুখতে। এখনই সময় সচেতনতা, শিক্ষা ও কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ধর্ষণের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়ার।
Posted ১:১২ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৩ মার্চ ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh