| বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত
সম্প্রতি ভারতে অনুষ্ঠিত রাজ্য বিধানসভাগুলোর নির্বাচনে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিবেশি রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে দেড় দশক যাবত রাজ্য সরকার পরিচালনকারী মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস যুগের অবসান ঘটেছে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয়েছে কট্টর হিন্দুত্ববাদী ও মুসলিম বিদ্বেষী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।
রাজ্যসভার ২৯৪ আসনের মধ্যে বিজেপি পেয়েছে ২০৭টি আসন এবং তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ৮০টি আসন। এ চিত্র ২০২১ সালে অনুষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনী ফলাফলের সম্পূর্ণ বিপরী। ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছিল ২১৫টি আসন এবং বিজেপি পেয়েছিল ৭৭টি আসন। এর আগে ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ৩টি আসন। মাত্র দশ বছরের ব্যবধানে ভারতের অন্যতম উদারপন্থী রাজ্য হিসেবে পরিচিত পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির দুই তৃতীয়াংশের অধিক আসনে জয়ী হওয়া দলটির বিপুল উত্থান প্রমাণ করলেও আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে উদারপন্থী ও মুসলিমদের মধ্যে।
২০১৬ ও ২০২১ সালের চেয়ে ভোটারদের অংশগ্রহণও বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। এবার ভোট দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের ৯২ শতাংশের বেশি সংখ্যক ভোটার, বিগত দুই নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটার অংশগ্রহণেল চেয়ে ১০ শতাংশ অধিক। এটাও কম বিস্ময়ের ব্যাপার নয়। নির্বাচনের ফলাফলে বিজেপির বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর থেকে রাজ্যজুড়ে তৃণমূলের সমর্থক ও মুসলিমদের ওপর বিজেপি সমর্থকদের হামলা, লুণ্ঠন ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের মত ঘটনা ঘটে চলেছে। এসব হামলায় এরই মধ্যে একজন মুসলিমসহ চারজন নিহত হওয়ার খবর এসেছে। বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করার পর সংখ্যালঘু মুসলিম ও উদারপন্থী রাজনীতির সমর্থকদের ভাগ্যে কী ঘটবে তা নিয়ে দু:শ্চিন্তা ও উদ্বেগ উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ ভারতের বাংলাভাষী দুটি রাজ্যের একটি এবং দুটি রাজ্য ঘেঁষেই বাংলাদেশের সীমানা।
এছাড়া আসাম রাজ্যও বাংলাদেশের সীমান্ত সংলগ্ন এবং আসামেও যথেষ্ট বাংলাভাষী হিন্দু ও মুসলিমের বসবাস। আসামে বিজেপি আগে থেকেই সরকারে রয়েছে এবং সেখানে অতীতের চেয়ে বেশি মুসলিম দলন চলছে এবং বাংলাভাষী মুসলিমদের ভিটেছাড়া করে, তাদের নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার অস্বীকার করে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর পাঁয়তারা চলছে বহু বছর আগে থেকে। বাংলাদেশের সীমান্তসংলগ্ন ভারতীয় রাজ্যগুলোতে বিজেপি উত্থানে বাংলাদেশেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে, তা বলাই বাহুল্য। বাংলাদেশে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী শাসক শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে প্রাণ বাঁচাতে ভারতে পালিয়ে যান।
এ গণ অভ্যুত্থান ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও ব্যাপক সাড়া জাগায়। বিশেষ করে তৃণমূল কংগ্রেস সমর্থকরা বাংলাদেশে শেখ হাসিনার জুলুম-নিপীড়নে তাকে দায়ী করে অভ্যুত্থানকারীদের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে। এর বিপরীতে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির কর্ণধার শুভেন্দু অধিকারী আবির্ভূত হন ভিন্ন ভূমিকায়। তিনি জোরেশোরে দাবি তোলেন শেখ হাসিনা এখনো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশে ফেরত যাবেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। শুভেন্দুর হাসিনাচর্চার মূল কারণ পশ্চিম বাংলার অধিবাসীদের একটি অংশের পিতৃভূীম বাংলাদেশে, এবং তাদের মন জয় করা। পশ্চিম বাংলায় মুসলিম ভোটের সংখ্যা মোট ভোটার সংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। একসময় সিপিএমের পক্ষে যেত এই ভোট। সিপিএম এর পর মুসলিম ভোটের উত্তরাধিকার লাভ করে তৃণমূল কংগ্রেস। এই অর্জন তৃণমূলকে দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকতে অন্যতম ভূমিকা পালন করে। বিজেপি মুসলিম ভোটে ভাঙন ধরাতে কূটকৌশলের পথ বেছে নেয়। তারা নানাভাবে ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে মদত জোগায়।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপির জয়ে ভারতের বাংলাভাষী দুটি রাজ্যে ধর্মভিত্তিক দলের থাবা বিস্তৃত হওয়ার পাশাপাশি বাঙালিরা ভারতের প্রগতিশীল অংশ বলে যে গর্ব পোষণ করত, তার অবসান ঘটল। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠিত হওয়ার পর বাংলাদেশের সঙ্গে তারা কেমন বন্ধন রাখবে, তা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিজেপি ক্ষমতায় আসায় প্রতিবেশীকে উত্ত্যক্ত করার ভুল পথ গ্রহণ করবে না বলেই আমরা আশাবাদ পোষণ করতে চাই।
Posted ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh