| বৃহস্পতিবার, ০১ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গভীর, বেদনাবিধুর এবং তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে মঙ্গলবার। গণতন্ত্রের আপসহীন সৈনিক, মা-মাটি ও মানুষের নেত্রী, তিন বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া অযুত কোটি মানুষকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে চলে গেলেন অনন্তের পথে। তাঁর মৃত্যু শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রীর বিদায় নয় বরং এটি বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি। যেখানে রচিত হয়েছে সংগ্রাম, ত্যাগ, নেতৃত্ব ও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দৃঢ়তার এক অনন্য ইতিহাস। বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন গণতন্ত্রের এক সুদৃঢ় কণ্ঠস্বর। তিনি ছিলেন নিপীড়িত মানুষের আশ্রয় আর জাতীয় রাজনীতিতে ঐক্যের প্রতীক। ব্যক্তিগত জীবনের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন এক শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে, যার প্রভাব চার দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। তিনি ছিলেন রাজনীতিতে সংশ্লিষ্টতাহীন গৃহবধূ। রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বিএনপির নেতৃত্ব সংকটের সময়ে বিএনপির হাল ধরেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তার রাজনৈতিক যোগ্যতা প্রমাণ করেন। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিল তাঁর আপসহীনতা। ১৯৮৩ সালে তিনি স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন। তাঁর নেতৃত্বে ৭ দলীয় জোট ৯০-এর গণ-আন্দোলনের প্রধান স্তম্ভে পরিণত হয়। দীর্ঘ নয় বছরের আন্দোলনে তিনি হয়ে ওঠেন ‘আপসহীন নেত্রী’ যে পরিচয় আজও তাঁর নামের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন অপরাজেয় নেত্রী। গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতিটি নির্বাচনী লড়াইয়ে তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। যে কটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি সরাসরি অংশ নিয়েছেন, প্রতিবারই তিনি বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন।
তিনি কখনো পরাজয় বরণ করেননি। রাজনীতিতে পা রাখার দশ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। আপসহীন আন্দোলনের নেত্রী হলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় খালেদা জিয়া ছিলেন বাস্তববাদী ও পরিস্থিতি বোদ্ধা। তিনি সংলাপ ও সমঝোতার রাজনীতিকে কখনো অস্বীকার করেননি। ২০০৭ সালের এক-এগারোর পর খালেদা জিয়া ও তাঁর পরিবারে নেমে আসে চরম সংকট। সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি ও তাঁর দুই পুত্র গ্রেপ্তার হন। দল ভাঙার চেষ্টা, তাঁকে বিদেশে পাঠানোর ষড়যন্ত্র, সবকিছু সত্ত্বেও তিনি দেশ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। তাঁর সেই উচ্চারণ,“এই দেশ, এই দেশের মাটি-মানুষই আমার সবকিছু। বাংলাদেশের বাইরে আমার কোন ঠিকানা নেই। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ৪১ বছরের স্মৃতি বিজড়িত ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে উচ্ছেদ, অবরুদ্ধ জীবন, কারাবাস, সন্তান হারানোর বেদনা, সব মিলিয়ে তাঁর জীবন ছিল এক গভীর ট্র্যাজেডির গল্প। তবু তিনি কখনো ভেঙে পড়েননি।
বরং বারবার বলেছিলেন, দেশবাসীই তাঁর প্রকৃত স্বজন। দীর্ঘ আন্দোলন, ক্ষমতা, নিপীড়ন ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়া শেষ জীবনে এসে দল-মত নির্বিশেষে সকলের শ্রদ্ধায় সিক্ত হন এবং জাতীয় নেত্রীতে পরিণত হন। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর মুক্তি পেয়ে তিনি তরুণদের উদ্দেশে যে বার্তা দেন, “ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়; ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি” তা তাঁকে নতুনভাবে ‘ঐক্যের প্রতীক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। প্রকৃতপক্ষে বেগম খালেদা জিয়া শুধু একজন ব্যক্তি নন, দীর্ঘ সময়ের নিজ কর্মগুণে নিজেকে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। বেগম খালেদা জিয়া দৈহিকভাবে চলে গেলেন। কিন্তু তিনি রয়ে গেছেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মা, মাটি ও মানুষের নেত্রী হিসেবে। গণতন্ত্র, আপসহীনতা, ত্যাগ ও নেতৃত্বের যে মানদণ্ড তিনি স্থাপন করেছেন, তা আগামী প্রজন্মের রাজনীতিকদের জন্য এক অনিবার্য পাঠ হয়ে থাকবে। তাঁর জীবন প্রমাণ করে—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আদর্শ ও দৃচতা অমর-অক্ষয়। বস্তুতপক্ষে একজন খালেদা জিয়ার কোনো মৃত্যু নেই। তিনি অনন্য আদর্শের প্রতীক হিসেবে বেঁচে থাকবেন যুগ থেকে যুগান্তরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে কোটি মানুষের হৃদয় জুড়ে।
Posted ১২:৫৩ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০১ জানুয়ারি ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh