| বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫
জুলাই বিপ্লবে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে ভারতের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। এর মূল কারণ তার দাস হয়ে ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার পতন। এ পতনকে বাংলাদেশে ভারতের আধিপত্যবাদের পতন হিসেবেও দেখা হয়। অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের অন্যায্য আচরণকে ছাড় না দেয়ার অবস্থান নেয়।
এর প্রতিক্রিয়া স্বরূপ ভারত বাংলাদেশের সাথে ভিসা সীমিতকরণ, বাণিজ্য কমিয়ে দেয়াসহ নানা উদ্যোগ নেয়। সীমান্তে বিএসএফ-এর উসকানিতে এক ধরনের অশান্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়েও ভারত বিভিন্ন সময়ে বিরূপ মন্তব্য করে। এর কড়া জবাব অন্তর্বর্তী সরকার দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু থেকেই ভারতের সাথে শীতল সম্পর্ক চলে আসছে। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যেও ভারতবিরোধী মনোভাব আগের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। জনগণের অভিপ্রায় ধারণ করেই অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের কোনো অন্যায্য আচরণ ও মন্তব্য প্রশ্রয় দিচ্ছে না।
গত ১২ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদিকে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা গুলি করে ভারতে পালিয়ে গেছে এবং ভারত তাদের আশ্রয় দিয়েছে অভিযোগে ইনকিলাব মঞ্চসহ এনসিপি ও ভারতবিরোধী মানুষ ভারতের কড়া সমালোচনা করে এবং ঢাকাস্থ ভারতীয় হাই কমিশন অভিমুখে ইনকিলাব মঞ্চের মিছিল, চট্টগ্রামে ভারতের সহকারি হাইকমিশনারের বাড়িতে ইটপাটকেল ছোড়া ইত্যাদি ঘটনায় ভারত বেশ কড়া অবস্থান নেয়। ঢাকায় তার ভিসা সেন্টারে সাময়িক ভিসা কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। গত শনিবার রাতে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে ভারতের চরমপন্থী সংগঠন ‘অখণ্ড হিন্দু রাষ্ট্রসেনা’র একটি দল বিক্ষোভ করে। পাশাপাশি বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে হুমকি দেয়। অনিবার্য কারণ উল্লেখ করে বাংলাদেশ হাইকমিশন দিল্লিতে ভিসা কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। অন্যদিকে, ময়মনসিংহে গার্মেন্ট শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসের হত্যাকাণ্ডকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন হিসেবে ভারত দেখছে।
এ নিয়ে কলকাতা, আগরতলা, গুয়াহাটি, মুম্বাইয়ে বাংলাদেশের উপহাইকমিশনের কাছে ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন বিক্ষোভ করেছে। এছাড়া সম্প্রতি দুই দেশের হাইকমিশনারকে পাল্টাপাল্টি তলব করা নিয়ে সম্পর্কের টানাপোড়েন বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের উত্তেজনা যেমন উভয় দেশের জন্য উদ্বেগের, তেমনি বৈশ্বিকভাবেও এর প্রভাব পড়ছে। গত সোমবার বাংলাদেশস্থ রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকসান্দার গ্রিগোরিয়েভিচ এক সংবাদ সম্মেলনে দুই প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিরাজমান উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছেন। শেখ হাসিনা যে ফ্যাসিস্ট শাসকে পরিণত হয়েছিল, তার পেছনে ভারতের আশ্রয়-প্রশ্রয় ছিল। বাংলাদেশের মানুষের ভোটাধিকারকে তোয়াক্কা না করে ভারত হাসিনাকে পুতুল বানিয়ে ক্ষমতায় রাখতে একের পর এক ভুয়া নির্বাচনকে সমর্থন দিয়ে গেছে। ভারত শুধু হাসিনার সাথেই সম্পর্ক রেখেছে, বাংলাদেশের জনগণের সাথে সম্পর্ক রাখাকে গুরুত্ব দেয়নি। সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশের জনগণ ভারতের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে রয়েছে। শুধু তাই নয়, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের সাথে বৈরী আচরণ, পানির ন্যায্য হিস্যা না দেয়া, সীমান্ত হত্যা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব গড়ে উঠেছে।
ভারত তা কখনোই উপলব্ধি করেনি। এখনো করছে না। বরং বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে বিভিন্ন অগ্রহণযোগ্য মন্তব্য করে যাচ্ছে। জুলাই বিপ্লবে হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরপরই মোদি ও হাসিনা সরকার ফেলে দেয়ার জন্য যৌথ ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত শুরু করে। বাংলাদেশে দুয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে ভারত কেন ইস্যু বানিয়ে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি করছে? ভারতকে বুঝতে হবে, বাংলাদেশের সাথে বিরূপ আচরণ ও অস্থিতিশীল করে তুললে, উভয় দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশকে এখন আর হাসিনার চোখ দিয়ে দেখা কিংবা তার নিজস্ব চিন্তা দিয়ে বিবেচনা করলে হবে না। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মনোভাব বুঝে সুপ্রতিবেশি সুলভ আচরণ করতে হবে। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের মধ্যে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে উভয় দেশকেই দায়িত্বশীল আচরণ ও আন্তরিক উদ্যোগ নিতে হবে। মনে রাখা প্রয়োজন, বৈরি সম্পর্ক বজায় রাখলে কোনো পক্ষই লাভবান হবে না। উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
Posted ১২:০৪ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh