| বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০২৪
দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং অর্থনেতিক বিকাশের জন্য অতি আবশ্যিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী প্রবাসীরা যাতে বিদেশে যেতে ও বিদেশ থেকে ফিরে বিমানবন্দরে হয়রানির শিকার না হয় সেজন্য হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ‘ডেডিকেটেড লাউঞ্জ’ বা প্রবাসী লাউঞ্জ উদ্ধোধন করেছে। গত সপ্তাহে অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস প্রবাসী লাউঞ্জ বলেন, প্রবাসীদের প্রাপ্য সম্মান তারা যাতে পায় তা নিশ্চিত করতেই এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রবাসী কর্মীরা এখানে মেহমানের মতো থাকবেন।
তিনি আরো বলেন প্রবাসীদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় দেশ চলে, সেজন্য তাদেরকে মাথার উপর রাখতে হবে। কিন্তু এতদিন পর্যন্ত তাদের অপরাধীর মতো রাখা হয়েছে। তারা দেশের জন্য আয় করছে, অন্যদিকে তাদের এই কষ্টার্জিত অর্থ আরেকজনে বিদেশে পাচার করছে। এটা জাতির দুর্ভাগ্য। প্রবাসীদের সেবায় এই উদ্যোগ নি:সন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতির বিকাশে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের আর্থ-সামাজিক বিকাশে অন্যতম অনুঘটক হিসেবে বিবেচিত।
প্রবাসীরা বাংলাদেশকে বেশি ভালোবাসে বলেই তারা সম্মান ও মর্যাদা পাওয়ার সকল অধিকার রাখেন। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ প্রবাসী আয় উপার্জনে বিশ্বে সপ্তম স্থানে আছে। দক্ষিণ এশিয়ায় শুধু ভারত ও পাকিস্তানের প্রবাসী আয় বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। একদিকে প্রবাসী শ্রমিকদের আয় সামগ্রিক অর্থনীতির ভিত্তিকে মজবুত করছে, অন্যদিকে তাদের পাঠানো অর্থ দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশে প্রবাসী আয়ের পরিমাণ বেড়েছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশের প্রবাসী আয় ছিল মাত্র ২৪ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি যা দশ বছরের মাথায় ১৯৮৫ সালে বিশ গুণেরও বেশি বেড়ে ৫০০ মিলিয়নে দাঁড়ায়।
এরপর প্রবাসী আয়ের পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৯৩ সালে প্রথম প্রবাসী আয়ের পরিমাণ ১ বিলিয়নের অংক অতিক্রম করে। এরপর প্রবাসী আয় বাড়তে বাড়তে গত চার বছর যাবৎ ২১ থেকে ২৪ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী গত ২০২৪ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে প্রবাসী আয়ের পরিমাণ ৫ বিলিয়ন ডলারের অধিক হয়েছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০২৪ সালেও প্রবাসী আয় ২৪ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করবে বলে আশা করা যায়। আরো লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হলো, ২০২১-২২ সালে বাংলাদেশের প্রবাসী আয় ছিল জিডিপি’র ৪.৫৬ শতাংশ, মোট রপ্তানি আয়ের ৪২.৭১ শতাংশ এবং মোট আমদানি ব্যয় পরিশোধের ২৫.৪৯ শতাংশ। এক কথায় বলতে গেলে প্রবাসী আয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখে, ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি করে, জাতীয় সঞ্চয় বাড়ায় এবং বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অতএব বাংলাদেশের উন্নয়নে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রভাব সর্বাধিক করার জন্য প্রয়োজন কৌশলগত পরিকল্পনা, উদ্ভাবনী সমাধান এবং শক্তিশালী কাঠামো, এবং অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যতা। বিশ্ব বাজারে শ্রমিকের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রবাসী আয় আরও বৃদ্ধি করা সম্ভব। সরকার প্রবাসী আয়ে প্রণোদনার পরিমাণ আরও বাড়াতে পারে। এটি অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে অর্থ প্রেরণ কমাতে সাহায্য করবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশীয় শ্রমিকের বড় একটি অংশ যেহেতু অদক্ষ, তাদের দক্ষ করে তুলতে হবে যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে।
তাহলে অভিবাসী শ্রমিকরা শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন পাবেন- রেমিট্যান্স বাড়বে। রেমিট্যান্স বাংলাদেশের জন্য যে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে; সরকার রেমিট্যান্স খাতে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ খাতকে আরও প্রসারিত করতে পারে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, আমরা সরকারে আসার তিন মাসের মাথায় এসে প্রবাসীদের জন্য নতুন যাত্রা শুরু করতে পারলাম। প্রবাসী কল্যাণ উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা দুজনেই বিদেশে আসা-যাওয়ার পথে এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছি। তিনি বলেন, বিমানবন্দর আমাদের সবাইকে ব্যবহার করতে হয়।
আমাকেও প্রায় আসা-যাওয়া করতে হয়। মনে খুব কষ্ট হয় যখন দেখি প্রবাসীদের যাওয়া-আসায় কতো কষ্ট হচ্ছে। প্রবাসীদের জন্য সরকারের সেবা সহজ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, প্রবাসীদের জন্য এখন ই-পাসপোর্ট দিতে হবে। ছাপা পাসপোর্ট দরকার নেই। পাসপোর্ট আপনার ফোনে চলে আসবে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। অফিসে যেন যেতে না হয়। তিনি বলেন, আমরা এখন আর সরকারি অফিসে যেতে চাই না। বাড়িতে যেন সেবা পৌঁছে দেয়া যায়।
উল্লেখ্য, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এটিই প্রথম প্রবাসী লাউঞ্জ। যেখানে বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীদের বিশ্রামের জন্য জায়গা এবং সুলভ মূল্যে খাবার পাওয়া যাবে। সুলভ মূল্যে খাবার পরিবেশনের জন্য এতে ভর্তুকি দেবে সরকার। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আইন ও প্রবাসী কল্যাণ উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ড. আসিফ নজরুল জানান, বিমানবন্দরে প্রবাসীদের দেখভাল এবং তাদের সহায়তা করার জন্য ১০০ কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আইওএম এই কর্মীদের স্পন্সর করেছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত আইওএম মিশনের ডেপুটি চিফ ফাতিমা নুসরাত গাজালি জানান, জাতিসংঘ বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের সহায়তার জন্য লাউঞ্জটি স্পন্সর করেছে।
Posted ১:২৮ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh