| বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই আশঙ্কা করা হচ্ছিল, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে সব ধরনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এআই জেনারেটেড মিথ্যাতথ্য, অপতথ্য, ডিপফেইক ভিডিও-ছবি, ফটোকার্ড ইত্যাদি নির্বাচনী পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে উঠবে। এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাজনৈতিকদলের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে প্রতিপক্ষ দলের প্রার্থীদের সম্পর্কে গুজব, বদনাম, চরিত্রহনন, রাজনৈতিক ঘৃণা, প্রতিহিংসা ছড়ানো হবে।
এই শঙ্কাই এখন বাস্তব হয়ে উঠেছে। সকল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নির্বাচনকেন্দ্রিক মিথ্যা ও অপতথ্যে সয়লাব হয়ে গেছে। গতকাল ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অপতথ্যের ব্যাপক বিস্তৃতি নির্বাচনী পরিবেশকে ঘোলাটে করে তুলছে। নির্বাচনের দিন যতই কমতে থাকবে, পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল মাধ্যমগুলোতে এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণ কম থাকায় তা লাগামহীন হয়ে পড়ছে, যা নির্বাচনী পরিবেশকে অস্থিতিশীল ও সাংঘর্ষিক করে তুলছে।
ফেসবুক ও অন্যান্য ডিজিটাল যোগাযোগ মাধ্যমগুলো খুললেই কোনো না কোনো মিসইনফরমেশন, ডিসইনফরমেশন, এআই দিয়ে তৈরি ডিপফেইক ভিডিও, অশ্লীল বাক্য সম্বলিত ফটোকার্ড দৃষ্টিগোচর হয়। নির্বাচনের মৌসুম চলায়, এ সংক্রান্ত বিষয়ই বেশি চোখে পড়ে। রাজনৈতিক দলের প্রধান, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নেতা, প্রার্থীসহ সমাজের বিশিষ্টজনদের নিয়ে এমন ছবি বা ভিডিও এবং মন্তব্য দেখা যায়, যা হঠাৎ দেখলে মনে হবে, এগুলো সত্য। অথচ এগুলোর বেশিরভাগই মিথ্যাতথ্যের ছবি ও ভিডিও। যারা প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন, তাদের পক্ষে এগুলো শনাক্ত করতে খুব একটা বেগ পেতে হয় না।
যাদের এ সম্পর্কে ধারাবাহিক অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান কম, তারা সহজে বিশ্বাস করে। গ্রাম-গঞ্জ, পাড়া-মহল্লা কিংবা শহরের দরিদ্র এলাকার একজন অতি সাধারণ বা কমশিক্ষিত মানুষের পক্ষে এসব মিথ্যাতথ্য, ছবি ও ভিডিও বুঝতে পারা কঠিন। সম্প্রতি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা, তাদের পরিবারের সদস্য, নারী প্রার্থীদের নিয়ে এআই দিয়ে তৈরি এমন কিছু ডিপফেইক ছবি ও ভিডিও দেখা গেছে, যা আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে সত্য। গত ১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত একটি প্রথমসারির বাংলা দৈনিকের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভূরি ভূরি ভুয়া তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। গত সপ্তাহে ১৯০টি ভুয়া তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে, তার মধ্যে রিউমার স্ক্যানার শনাক্ত করেছে ১২৬টি, ফ্যাক্ট ওয়াচ ২৩টি, ডিসমিসল্যাব ১৫টি, বাংলা ফ্যাক্ট ১৫টি, দ্য ডিসেন্ট ১১টি।
শনাক্ত ভুয়া তথ্যের ৯৩টি নির্বাচন নিয়ে। এআই দিয়ে তৈরি অন্তত ২২টি ছবি ও ভিডিও এবং ২টি ডিপফেইক ভিডিও শনাক্ত হয়েছে। ভোটের তারিখ, নির্বাচন বাতিল বা স্থগিত, নির্দিষ্ট দলের জয়ের সম্ভাবনা কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অবস্থান, এসব নিয়েই ভুয়াতথ্য ও বিভ্রান্তি বেশি ছড়ানো হচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে এসব ভুয়া তথ্যের শিকার হচ্ছে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা। একক ব্যক্তি হিসেবে সবচেয়ে বেশি ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে। উল্লেখিত ভুয়া তথ্যের ২৯টিই তারেক রহমানকে নিয়ে। এছাড়া বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অন্যান্য নেতা ভুয়া তথ্যের শিকার হয়েছেন এবং হচ্ছেন। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানসহ অন্যান্য দলের নেতা ও প্রার্থীরা কমবেশি ভুয়া তথ্যের শিকার হয়েছেন। নারী প্রার্থীরা অহরহ সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন।
অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলসহ পত্রপত্রিকার নামে ভুয়া তথ্য দিয়ে ফটোকার্ড প্রকাশ করে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা হচ্ছে। এগুলোও মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া পুরনো ছবি এবং ভিডিও ভিডিও এডিট করে মিথ্যাতথ্য পরিবেশন করা হচ্ছে। এমনকি বিদেশি ভিডিও এডিট করে দেশি ভিডিও হিসেবে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে এমন মিথ্যাতথ্যের জোয়ার এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বইছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিসইনফরমেশন ও ডিসইনরমেশন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এগুলো যেমন সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে, তেমনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ এবং সংঘাত সৃষ্টি করছে।
নির্বাচনের আগে ও পরে রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও নির্বাচনকমিশনকে নিয়ে মিথ্যাতথ্য, অপতথ্য, এআই দিয়ে তৈরি মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর ভিডিও-ছবি প্রকাশ নির্বাচনী আচরণবিধিতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বলা হয়েছে। তবে নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, এ আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া তথ্যের ছড়াছড়ির বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ নিয়ে সে কাজ করছে। ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি (এনসিএসএ) এ সংক্রান্ত অভিযোগ জানাতে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি ই-মেইল খুলেছে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিদিন অন্তত পাঁচটি করে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। পদক্ষেপ নেয়ার জন্য এসব অভিযোগ পুলিশ বা বিটিআরসির কাছে পাঠানো হচ্ছে। তবে তদন্তে ঢিলেমি ও যথাযথ তদন্ত না হওয়ায় মিথ্যাতথ্যের অবাধ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এমনকি ভুয়া তথ্যের উৎস শনাক্ত করা হলেও তা ধরতে অনেক সময় লেগে যাচ্ছে। এতে মিথ্যাতথ্য আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এজন্য তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বিটিআরসি, এনসিএসএ, পুলিশ, এসবি, ডিবি, এনএসআই, ডিজিএফআইসহ সকল সংস্থাকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
যে বা যারা যে উৎস থেকে মিথ্যাতথ্য ও অপতথ্য ছড়াচ্ছে, তা শনাক্ত করে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার নজির স্থাপন করতে হবে।
মিথ্যা ও অপতথ্য যাতে দ্রুত অপসারণ করা যায়, এজন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে সহযোগিতা নিতে হবে।
Posted ১:০৫ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh