| বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত
ইরান যুদ্ধ বিশ্বের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বড় ধরণের সংকট সৃষ্টি করেছে। এই যুদ্ধে ইরান আক্রান্ত হলে কি কি ঘটতে পারে তা অনুমান করা কারো জন্যই কোনো কষ্টকর বিষয় নয়। যুদ্ধের পক্ষগুলোর ভুল হিসেব নিকেশ সংকটকে গভীর ও দীর্ঘায়িত করতে পারে। ইতিমধ্যেই তার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। কূটনৈতিক পন্থায় বিরোধ মীমাংসার অংশ হিসেবে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় কিছু অগ্রগতির খবরও পাওয়া গিয়েছিল।
পরমাণু চুক্তি বিষয়ে ইরানের সাথে আলোচনার মধ্যেই ইসরাইল-আমেরিকার যৌথ বিমান ও মিসাইল হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যার মাধ্যমে ইরানে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীকে বদল করে সেখানে পশ্চিমাদের পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে কয়েক দিনের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ করার ভুল হিসাব করেছিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন যুদ্ধ তিন-চার সপ্তাহ স্থায়ী হওয়ার কথা বললেও যুদ্ধ বন্ধের চাবিকাঠি এখন আর একপাক্ষিকভাবে তাদের হাতে নেই। ট্রাম্পের আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা প্রায় সব মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা করছে ইরান। ইতিমধ্যে উভয় পক্ষে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উভয় পক্ষের মিসাইল হামলায় মার্কিন ও ইরানি যুদ্ধ জাহাজগুলো সমুদ্রে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন লাইন হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়ার কারণে বিশ্বে জ্বালানি তেল-গ্যাসের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়তে শুরু করেছে।
বাংলাদেশের মত দুর্বল ও আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশের জন্য এই যুদ্ধ গভীর সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে। যুদ্ধের গতি-প্রকৃতি যাই হোক, বাংলাদেশকে নিজের বাস্তবতা ও ভারসাম্য নীতি অনুসরন করতে হবে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আপাতত দেশে জ্বালানি সংকট নেই বলে আশ্বস্ত করা হলেও যুদ্ধ একমাসের বেশি দীর্ঘায়িত হলে বড় ধরণের সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধের পাশাপাশি ইয়েমেনের হুতিরা লোহিত সাগরকে তাদের মিসাইলের নিশানা বানানোর হুমকি দিয়েছে। সুয়েজ খালের পথটিও এখন আর নিরাপদ নয়। যুদ্ধ পারস্য উপসাগর ছাড়িয়ে ওমান ও লোহিত সাগরেও বিস্তৃত হতে শুরু করেছে। চীন, যুক্তরাজ্যসহ এশিয়া ইউরোপের পরাশক্তি ও কুশীলবরা দুই পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ার আলামত ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এহেন বাস্তবতায় বাংলাদেশকে অবশ্যই তার গৃহীত চিরায়ত ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখতে হবে। যদিও মুসলিম উম্মাহর সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের জনগণ স্বাভাবিকভাবেই ইরানের জনগণের পক্ষে জোরালো সমর্থনের পাশাপাশি ইসরাইল-মার্কিনী আগ্রাসনের প্রতিবাদ করছে।
রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকারের কোনো পক্ষাবলম্বন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় তা পরিহার করাই শ্রেয়। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে তা আমাদের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা অনেক কঠিন করে তুলবে। ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানিসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি, জনশক্তি রফতানি ও রেমিটেন্স প্রবাহ আমাদের বাণিজ্য ও অর্থনীতির অন্যতম লাইফ লাইন। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন আমাদের তৈরী পোশাক খাতের প্রধান বাজার। যুদ্ধের কারণে বিশ্বমন্দা একটা অবধারিত বিষয়। সে ক্ষেত্রে খুব সতর্কতার সাথে এগুতে হবে। যুদ্ধের কারণে সম্ভাব্য সংকট উত্তরণে বিকল্প উদ্যোগগুলো নিয়ে এখনই জরুরি পদক্ষেপ ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশেষত জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে যে কোনো অনিশ্চয়তা বা অচলাবস্থা দেশের জন্য বড় সংকট হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই এমন একটি আঞ্চলিক যুুদ্ধের স্বীকার হচ্ছে। ভ’রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই একটি কৌশলগত আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার ভরকেন্দ্রে পরিনত হয়েছে। একদিকে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে চীনসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অবস্থান বাংলাদেশের বাণিজ্য ও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হয়ে উঠেছে।
এই যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, কোনো পরাশক্তির সামরিক ঘাঁটি বা নিরাপত্তা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশকে নিরাপত্তা দিতে পারছে না। চীন-রাশিয়া- ভারত ও ইরান যেমন বাংলাদেশের আঞ্চলিক অবস্থান ও উন্নয়ন অংশীদারিত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, পক্ষান্তরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের সাথেও বাংলাদেশের বাণিজ্যসহ বিশাল অর্থনৈতিক অংশিদারিত্ব রয়েছে। চলমান যুদ্ধ এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশকে সঠিক পন্থা অবলম্বন করতে হবে। সমর্থন ও কূটনৈতিক বোঝাপড়া কোনো এক পক্ষে হেলে পড়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের নতুন সরকারকে মেরুদন্ড শক্ত করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সাহস রাখতে হবে। এ সময়ে পুলিশের পোশাক বদলের চেয়ে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও কূটনৈতিক বন্দোবস্তের দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
Posted ৯:৪২ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh