| বৃহস্পতিবার, ০৯ জানুয়ারি ২০২৫
যে সংস্কার গত আগষ্টে হওয়া উচিত ছিল, তা এখন হচ্ছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা যদি বড় কোনো ভুল করে থাকে, সেটি হলো রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ে বৈপ্লবিক সংস্কার সাধনের শর্ত অন্তবর্তীকালীন সরকারের ওপর চাপিয়ে না দেওয়া। যেকোনো বিপ্লবের সাফল্যের পর পরাজিত পক্ষের কি হাল হয়ে থাকে এবং বিপ্লবী সরকার কি পদক্ষেপ গ্রহণ করে বিশ্ব ইতিহাসে এর ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের বিপ্লবীরা তেমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
কেবল একটি অন্তবর্তী সরকার প্রতিষ্ঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চেয়েছিল তারা। বিলম্বে হলেও বিপ্লবীদের হুশ হয়েছে যে তাদের কাক্সিক্ষত পথে সরকার দেশ পরিচালনা করতে পদে পদে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে তারা কঠোর হতে বাধ্য হয়েছে এবং রাষ্ট্রের সংস্কার সাধনের জন্য তাদের শর্ত আরোপ করেছে অন্তবর্তীকালীন সরকারের ওপর। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ থেকে ২০২৬ এর মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলেছিল। এমনও বলেছিল যে, রাজনৈতিক দলগুলো বেশি সংস্কার না চাইলে ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন হতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে বিএনপি অবিলম্বে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ বা অবিলম্বে আন্দোলন করার প্রচ্ছন্ন হুমকিও দিতে শুরু করেছে।
তারা আসলে ভুলে গেছে যে, তাদের আন্দোলনের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল এবং ছাত্রজনতার বিপ্লবের সাফল্যের সুযোগে তারা কিছুটা মাত্রার বাইরে লাফালাফি শুরু করেছে ‘নির্বাচন চাই, নির্বাচন চাই,’ বলে। তারা ভুলে গেছে যে শেখ হাসিনা থাকলে তারা নির্বাচনের ধারেকাছে আসতে পারতো না। তাদের ধীরস্থির থাকা উচিত। তবে এরই মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা অন্তবর্তী সরকারের কাছে সংস্কারের শর্ত আরোপ করেছে। আশা করা যায় যে অন্তবর্তী সরকার কাক্সিক্ষত সংস্কার সাধন করার পরই সরকার তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পন্ন করবেন। একটি সুষ্ঠু অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত রাজনৈতিক দলের কাছে ক্ষমতা তুলে দিয়ে বিদায় নেবেন। এ দিকে, স্বৈরাচার হটানোর আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্ররা ঘোষণা করেছে, খুনি, লুটেরা শেখ হাসিনার বিচার ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করার পরই নির্বাচন হতে হবে। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত অংশীজন হলো রাজনৈতিক দল। কিছু দল পরিপূর্ণ সংস্কারের জন্য অপেক্ষা করতে প্রস্তুত নয়। তারা মোটামুটি কিছু সংস্কার করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে। সন্দেহ নেই, তাদের চাওয়ার পেছনে যৌক্তিক কারণ আছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে এরই মধ্যে নানা গুঞ্জনের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের অনেক উপদেষ্টার কর্মকাণ্ড বিতর্কের সৃষ্টি করছে এবং তাদের সদিচ্ছা নিয়ে সংশয়ও দেখা দিচ্ছে।
এমনকি এক-এগারোর সরকারের সময়ের মাইনাস টু’র আদলে কিছু করার চেষ্টা চলছে- এমন রটনাও ছড়িয়েছে। কিন্তু গুজব রটনা বা গুঞ্জনের ওপর ভিত্তি করে কোনো রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত নেয়া অনুচিত। এতে বরং দলটির দেশ পরিচালনার সামর্থ্য প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। আমরা মনে করি, একটি জাতির জীবনে বৈপ্লবিক সংস্কারের সুযোগ সচরাচর আসে না। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে একবার এসেছিল। তখনকার আওয়ামী লীগ সরকার সে সম্ভাবনা ধুলায় মিশিয়ে দেয়। ২০২৪ সালে আবারো সেই আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের উৎখাতের মাধ্যমে ৫৩ বছর পর নতুন আরেকটি সুযোগ জাতির সামনে হাজির হয়েছে। এই সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগানোর সম্ভাবনা উজ্জ্বলতর এ কারণে যে, দায়িত্বটা সম্পন্ন করার জন্য আমরা একজন যোগ্যতর ব্যক্তি ড. ইউনূসকে পেয়েছি। তিনি বেশ কয়েকটি কমিশন গঠন করে সংস্কারের সুপারিশ প্রণয়নের দায়িত্ব দিয়েছেন। কমিশন কাজ করছে। শুরুতেই সে প্রক্রিয়া থেমে গেলে, রাষ্ট্র সংস্কারের ঐতিহাসিক সুযোগ হাতছাড়া হবে। সেটি হবে দেশ ও জাতির জন্য আত্মঘাতী। নির্বাচন ও সংস্কার নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা অংশীজনদের সাথে সংলাপ করবেন। সেখানে বিষয়টির ইতিবাচক সুরাহা হবে- এটিই প্রত্যাশিত।
তবে জুলাই বিপ্লবের অন্যতম রাজনৈতিক অংশীদার বিএনপি নেতাদের সাম্প্রতিক কথাবার্তায় ভিন্ন সুর লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তারা বাহাত্তুরের সংবিধানকে অক্ষুণ্ন রাখার কথা বলছেন, তারা শেখ মুজিবের ফ্যাসিবাদি কাল্টকে প্রতিষ্ঠিত রেখেই ক্ষমতায় যেতে চাইছেন, যেখানে বিপ্লবী ছাত্র-জনতা হাসিনার মাফিয়াতন্ত্র ও আওয়ামী ফ্যাসিবাদের প্রতীক শেখ মুজিবের ছবি ও ভার্স্কযকে গুঁড়িয়ে দিতে চাইছেন। হাজার হাজার গুম-খুন, লাখ লাখ কোটি টাকা পাচার, দেশের সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংসে করে ভারতে পালিয়ে গিয়ে সেখানে বসে বাংলাদেশবিরোধী ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র ও উস্কানির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও প্রতিকারই যেখানে ছাত্র-জনতার অগ্রাধিকার সেখানে বিএনপি নেতাদের প্রতিক্রিয়ায় মনে হচ্ছে, তারা যেনতেন প্রকারে একটি নির্বাচন আদায় করে ক্ষমতার মসনদে বসার জন্য পতিত স্বৈরাচারের সব এস্টাবলিশমেন্টের সাথে আপস করতে চাইছেন।
Posted ১:১৬ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৯ জানুয়ারি ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh