| বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর ২০২৫
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় শেখ হাসিনা নিজেকে এবং তার দল আওয়ামী লীগকে চিরস্থায়ী করার অসদুদ্দেশ্যে দেশ থেকে তাদের সম্ভাব্য বিরোধীদের চিরতরে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে যে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে জামায়াতে ইসলামীর প্রায় সকল শীর্ষ নেতা এবং বিএনপির একজন নেতাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছিল, সেই ট্রাইব্যুনালই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অফরাধের দায়ে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেছে। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকেও একই অপরাধে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছে।
গতবছর জুলাই-আগস্টে ছাত্র জনতার অভ্যুত্থান প্রতিহত করতে তার নির্দেশে তার দলের ও রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগকারী বাহিনীগুলো যে নিষ্ঠুর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল, তাতে প্রায় দেড় হাজার লোক নিহত এবং প্রায় ৩০ হাজার লোক আহত হয়েছে। পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সাল থেকে ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতিকে তার মর্জিমত পরিচালনা করতে গিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা কর্মী এবং বিরোধী দলীয় ল্কেজনের মালিকানাধীন প্রতিটি স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান দখল, গুম, খুন, অপহরণসহ এক বিভীষিকার রাজত্ব কায়ের করেছিলেন। সমগ্র দেশ পরিণত হয়েছিল এক উন্মুক্ত কারাগারে। তাকে ও তার দলের প্রতি আনুগত্য পোষণ করে না, এমন সাধারণ নাগরিকও আওয়ামী লীগারদের নির্মমতা থেকে রেহাই পায়নি।
মানুষের হৃদয়ে জমে থাকা ক্ষোভের বহি:প্রকাশ ঘটেছিল ২০২৪ এর জুলাই-আগস্টে, যে গণবিক্ষোভ দমন করতে হাসিনা সরকারের কর্তৃত্বমূলক কর্মকাণ্ডে অগণন প্রাণ ঝরেছিল বিক্ষোভকারীদের। তার মানবতা বিরোধী অপরাধে ট্রাইব্যুনালের রায় তিনি বলেছেন যে, এ রায় ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ এবং ‘ট্রাইব্যুনালের পূর্ব পরিকল্ডিত সিদ্ধান্ত।’ শেখ হাসিনা যে অপরাধ সংঘটন করেছেন, তা মাত্র এক বছর আগের ঘটনা, জনমনে এখনো প্রোজ্জ্বল।
অথচ তার শাসনামলে কেবল জেদের বশবর্তী হয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার লক্ষ্যে গঠিত এই বিশেষ আদালত কিছু বরেন্য রাজনীতিবিদকে ৪০ বছর আগের কল্পিত অপরাধকে যখন অকাট্য বলে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছিল এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনসহ বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা এ ধরনের বিচারকে ‘প্রহসনের বিচার,’ ‘ক্যাঙারু কোর্টে বিচার,’ এমনকি ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ড’ বলে বর্ণনা করেছিল, তখন শেখ হাসিনা নির্বিকার ছিলেন এবং রায় কার্যকর করতে কোনো বিলম্ব করেননি। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যখন একই ট্রাইব্যুনালে বিচারচলছিল তখর তিনিই তার গড়া ট্রাইব্যুনালকে বর্ণনা করেছেন ‘ক্যাঙারু কোর্ট’ বলে এবং তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকে বলেছেন ‘প্রহসনের বিচার’। আন্তর্জাতিক মহল তখন এই বিচার প্রক্রিয়াকে অনৈতিক ও পক্ষপাতদুষ্ট মনে করেছে। কিন্তু নিরপরাধ লোকগুলোকে বিচারের নামে হত্যা করায় শেখ হাসিনার হৃদয় কাঁপেনি। তিনি নিজেই যখন তার আদালতের শিকার হয়েছেন তখন তিনি রায়কে বলছেন ‘পক্ষপাতদুষ্ট’।
তিনি যাই বলুন না কেন, বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও যথাসম্ভব স্বল্প সময়ের মধ্যে রায় ঘোষণা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, কিন্তু এ বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই যে, শেখ হাসিনার শাসন ছিল সম্পূর্ণ স্বৈরতান্ত্রিক এবং তিনি রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেছিলেন তার মর্জি অনুযায়ী কাজ করতে। এতে বিরোধীদল চরম হেনস্থা হয়েছে, বলা চলে যে তার পতনের পূর্বের প্রায় ষোল বছরে দেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ প্রায় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছিল। গণতান্ত্র ছিল না দেশে। বিচার বিভাগ কাজ করতো তার ক্ষমতার দাপটে। শেখ হাসিনা ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করার জন্য তার মৃত পিতা শেখ মুজিব এবং তার দল আওয়ামী লীগের চারপাশে একটি ব্যক্তিগত রাজনীতি গড়ে তুলেছিলেন। আওয়ামী লীগের দু:শাসনের কারণেই স্বাধীনতার ৫৫ বছরের বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসেনি। শেখ হাসিনা দেশ থেকে প্রাণে বেঁচে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই প্রত্যক্ষভাবে অন্তবর্তী সরকারের বিরুদ্ধে এবং পরোক্ষভাবে জনগণের বিরুদ্ধে যে আস্ফালন প্রদর্শন করেছে, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর সেই আস্ফালন ও হুমকিতে ভাটা পড়েনি। তার সকল কথার মূল কথা ‘দেখে নেব’।
তার মাঝে কৃতকর্মের জন্য বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই, তার দলেও কারও মধ্যে কোনো অনুতাপ নেই। তার ও তার সমর্থকদের এই মনোভাব তাদের জন্যই এত ক্ষতিকর যে কেউ আর বিবেচনা করে না যে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবং শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডের রায়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব পড়বে। হাসিনার মৃত্যুদন্ডের রায়কে কেন্দ্র করে আওয়ামী মহলে হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের নেত্রীর পক্ষে তারা একটা দৃশ্যমান প্রতিবাদ বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে পারেন। বিগত ১৫ মাস ধরে ক্ষমতার রাজনীতি থেকে বহিষ্কৃত আওয়ামী লীগের এখন ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা। দেশবাসী এবং প্রতিটি রাজনৈাতিক দল এখন নির্বাচনমুখী। সর্বত্র আলোচনার বিষয়বস্তু গণভোট ও সংসদ নির্বাচন। এ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের দ্বারা নাশকতা সৃষ্টির অপচেষ্টা তাদের জন্যই বিপদ ডেকে আনবে।
Posted ১১:৪০ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh