| বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই ২০২৫
ছবি : সংগৃহীত
গত সোমবার ২১ জুলাই মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক এক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে দেশবাসী। রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভবনে সহসাৎ আছড়ে পড়ে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান। বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তেও মাইলস্টোনের শিক্ষার্থীদের কেউ ক্লাস করছিল, কেউ স্কুল শেষে বাসায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। বাইরে অপেক্ষা করছিলেন অভিভাবকরা।
কিন্তু সোয়া ১টার সময় সব ওলট-পালট হয়ে যায়। ভবনের একাংশে আছড়ে পড়ে একটি প্রশিক্ষণ বিমান এবং বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট আগুনে দগ্ধ হয়ে মৃত্যু ঘটে ছাত্র ও শিক্ষকসহ অনেকে। শেষ হিসাব অনুযায়ী মৃতের সংখ্যঅ দাঁড়িয়েছে ৩২ এ। অগ্নিদগ্ধ হয়ে রাজধানীর আটটি হাসপাতালে আট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে ১৭১জন। আহত সন্তান নিয়ে অভিভাবকদের গগনবিদারী আর্তনাদে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। হাসপাতালে হাসপাতালে কান্না আর আহাজারিতে দিনটি হয়ে ওঠেছিল বিভীষিকাময়। দেশের ইতিহাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনা এটিই প্রথম।
স্কুলের যে ভবনে বিমানটি বিস্ফোরিত হয়, সেখানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শতাধিক শিক্ষার্থী ছিল। বিস্ফোরণের তীব্রতায় ভবনে আগুন ধরে যায়, মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো পুরো ভবনে। বিস্ফোরণের তাপে ও ধোঁয়ার মধ্যে চিৎকার, আতঙ্ক ও ছুটোছুটিতে পুরো এলাকা পরিণত হয় এক মৃত্যুপুরীতে। ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধারকর্মীরা এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং আহতদের বের করে এনে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠান। দেশে এর আগেও একাধিকবার প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। তবে এবারের মতো জনবহুল এলাকায় এতো ভয়াবহ দুর্ঘটনা ও সাধারণ মানুষের মৃত্যু ঘটেনি। স্কুলের ছোট ছোট শিক্ষার্থীর মৃত্যু মানুষের পক্ষে সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ধরনের মর্মবিদারক ও হৃদয় ভেঙে দেয়ার মতো প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনা বাংলাদেশে আর ঘটেনি ঘটেনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ২০১৮ সালের নভেম্বরে টাঙ্গাইলে একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়।
এতে বিমানটির পাইলট উইং কমান্ডার আরিফ আহমেদ নিহত হন। ২০১৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর কক্সবাজারে প্রশিক্ষণের সময় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর দুটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় রাশিয়ায় নির্মিত ইয়াক-১৩০ মডেলের দুটি বিমান বিধ্বস্ত হলেও চারজন বৈমানিক নিরাপদে বের হয়ে আসতে সক্ষম হন। এর আগে ২০১৫ সালের ১ এপ্রিল রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে তামান্না রহমান নামের এক পাইলট নিহত হন।
প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এই বিমান দুর্ঘটনা নিছক কোনো দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে নাশকতা রয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, এয়ারফোর্স এটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে দেখছে। কারণ, এ ধরনের যুদ্ধ প্রশিক্ষণ বিমানের মহড়া নিয়মিত করা হয়। যুদ্ধ প্রশিক্ষণ বিমান শুধু এয়ারফোর্সের কাছেই রয়েছে। সেনাবাহিনী, নৌ বাহিনীর কাছে পরিবহন বিমান ও হেলিকপ্টার থাকে। প্রশিক্ষণ যুদ্ধ বিমান কেবল বিমানবাহিনীর কাছেই রয়েছে। যে বিমানটি (এফটি-৭ বিজিআই) বিধ্বস্ত হয়েছে, এটি যুদ্ধক্ষেত্রেও ব্যবহার করার উপযোগী। তদন্ত কমিটি গঠন হওয়ার পর বিমানটি কোন পরিস্থিতিতে বিধ্বস্ত হয়েছে, তা পরিষ্কার হবে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, জনবহুল এলাকায় কেন এ প্রশিক্ষণ হবে? এ প্রশ্নের উত্তরে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যেকোনো প্রকার ফ্লাইট প্রশিক্ষণ সিভিলিয়ান এরিয়া থেকে দূরে হয়ে থাকে। বিমানবাহিনীর যুদ্ধপ্রশিক্ষণ বিমানের মান নিয়ে বহু বছর ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। যে বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ বিমান নিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া উচিৎ নয়। এগুলো অনেকটা ‘উড়ন্ত কফিনে’ পরিণত হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে বাজেট বাড়িয়ে উন্নত প্রশিক্ষণ বিমান কেনা জরুরি। তারা বলেছেন, একটি যুদ্ধবিমানের কার্যকাল থাকে ১০ থেকে ১২ বছর। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকলেও বিমানে ত্রুটি দেখা দিতে পারে। এ দুর্ঘটনার কারণ নিশ্চয়ই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা তদন্ত শেষে বের করতে সক্ষম হবে। এ মর্মান্তিক ঘটনায় স্বজনহারাদের সান্ত্বনা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। তবু নিহতদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি রইল আমাদের গভীর সমবেদনা। পরম করুণাময় আল্লাহ যেন সব নিহতের পরিবারকে এ শোক সইবার তৌফিক দান করেন। আল্লাহর কাছে তাদের রূহের মাগফিরাত কামনা করছি। তিনি যেন এসব মাসুম শিশুকে মাফ করে তার প্রিয় বান্দা হিসেবে কবুল করে নেন।
Posted ১:০১ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh