| বৃহস্পতিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
ছবি : সংগৃহীত
ছাত্রজনতার বিপ্লবের সাফল্যে গত আগস্টে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে ভারতের বিজেপি সরকারের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে বাংলাদেশে অরাজকতা সৃষ্টির জন্য একের পর এক চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি নিজে এবং আওয়ামী লীগের আরো অনেক পলাতক নেতা আত্মগোপনে থেকে একের পর এক অন্তবর্তীকালীর সরকারের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। প্রশাসনের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা হাসিনার আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও তলে তলে এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে বিভিন্ন সেক্টরের লোকজনকে উৎসাহিত করছেন তাদের দাবিদাওয়া আদায়ের নামে সরকারকে ব্যস্ত রাখতে। যারা সাড়ে পনেরো বছর মুখ খুলতে সাহস করেনি। তারা এখন মুখে কথার ফুলঝুড়ি ছড়াচ্ছে।
নানা ছলছুতায় ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে উস্কানি দিচ্ছে। তারই একটি ছিল বাংলা একাডেমির অমর একুশের বইমেলায় একটি প্রকাশনী কর্তৃক প্রকাশিত বিতর্কিত লেখিকা তাসলিমা নাসরিনের ইসলাম বিদ্বেষী একটি বইকে কেন্দ্র করে হাঙ্গামা সৃষ্টি। যেকোনো ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বিষয় থাকতে পারে এমন বইপত্র প্রদর্শন ও বিক্রয় একুশের বইমেলায় নিষিদ্ধ ছিল। গত পনেরো বছর ধরে বইমেলায় এক ব্যক্তি ও তার পরিবারের বন্দনা ও স্তুতিগাঁথার প্রচার ছিল মূখ্য বিষয়। ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানে পতিত স্বৈরাচার দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর দেশের মানুষ এক নতুন বাংলাদেশ পেয়েছে।
এখন ছাত্র-জনতা স্বৈরাচার ফ্যাসিবাদের আইকন ও সিম্বলগুলো উপড়ে ফেলতে চাইবে, এটাই স্বাভাবিক। ৫ আগস্টের পর ৬ মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও অনেক কিছুই অপরিবর্তিত রয়েছে। অর্ন্তবর্তী সরকারের অনেকটা ধীরগতি ও আপসকামী মনোভাব দ্বারা পরিচালিত হওয়ার সুযোগে ঘাপটি মেরে থাকা পতিত স্বৈরাচারের দোসররা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে। অন্যদিকে আওয়ামী শাসনামলে যারা নির্যাতিত হয়েছে, যারা মুখ খুলতে পারেনি, যেসব প্রকাশককে জাতীয়তাবাদী বা ইসলামী ঘরানার বলে চিহ্নিত করে মেলায় স্টল পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়নি, তাদের ক্ষোভের প্রকাশ ঘটেছে তসলিমা নাসরিনের ইসলাম ও বাংলােেশর সংস্কৃতি বিরোধী গ্রন্থ কেন্দ্র করে। আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবীরা এমন ভাষায় এর প্রতিবাদে নেমেছেন যে, অতীতে বইমেলায় এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। তারা তাদের দ্বারা কৃত কোনো অপকর্মকে ইচ্ছে করেই স্মরণে রাখেন না। সাধারণ মানুষও সদ্য ঘটে যাওয়া ঘটনাকে মনে করেই, এই ঘটনা প্রথম ঘটলো। মেলায় তাসলিমার বই প্রদর্শনের প্রতিবাদ ছিল স্বাভাবিক বহি:প্রকাশ। কিন্তু উলটো প্রতিবাদকারী মারধরের শিকার হওয়ায় তার পক্ষ নিয়েছে অনেকে। আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরা এইসব প্রতিবাদী মানুষকে মৌলবাদী আখ্যা দিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে ফুলিয়ে-ফাপিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা থেকেই বোঝা যায়, এর পেছনে আওয়ামী ও ভারতীয় স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধন ও যোগসাজশ আছে। একযুগ আগে ঢাকার শ্হাবাগে নাস্তিক-ব্লগারদের মাধ্যমে যে গণজাগরণ মঞ্চের উত্থান ঘটেছিল তার নেপথ্যে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার যোগসাজশের বিষয়টি এখন আর গোপন নেই। সেখান থেকেই বিচারের নামে জুডিসিয়াল কিলিং ও আওয়ামী ফ্যাসিবাদ ভয়ঙ্কর রূপে আবির্ভুত হয়েছিল। এখনো তারা অনুরূপ পরিস্থিতিই সৃষ্টি করতে তৎপর।
জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে একুশের বইমেলায় ইসলামপন্থী মৌলবাদীদের ঊগ্রতার একটি চিত্র তুলে ধরতে পরিকল্পিতভাবে নানা ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। প্রতিরোধের জন্য অন্তবর্তী সরকার বা গোয়েন্দা সংস্থা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ করতে না পরায় চক্রান্তকারীরা আরো আস্কারা পাচ্ছে বলে মনে হয়। এ ব্যর্থতার কারণে পতিত স্বৈরাচার ও ভারতের পাতা ফাঁদে পা দিচ্ছে এক শ্রেনির মানুষ। তৌহিদী জনতার ছদ্মবেশে মব জাস্টিসের ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হলেও বাস্তবে মব জাস্টিস যে থামেনি তার দৃষ্টান্ত ধানমন্ডির কথিত ৩২ নম্বরের বাড়ি ধ্বংসসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগৈর নেতাদের বাড়িতে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসসাধন। কঠোর হাতে এ ধরনের উন্মাদনা বন্ধ করা সরকারের দায়িত্ব। গুম-খুন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাধ্যমে হাসিনার স্বৈরাচারি ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে জঙ্গিবাদ-ইসলামিক মৌলবাদ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বাধীনতা বিরোধীতা ইত্যাদি বয়ান ব্যবহার করা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের চেয়ে কথিত অলিগার্ক, গণমাধ্যম এবং একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মীদের ভূমিকা ছিল প্রকট। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে অনেকে পালিয়ে কিংবা আত্মগোপণে থাকলেও গিরগিটির মত রং বদল করে অনেকেই ছাত্র-জনতা ও অর্ন্তবর্তী সরকারের বিরুদ্ধে ক্যামোফ্লেজ-সাবোটাজ করার অপচেষ্টা করছে।
এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে, ভারতীয় গণমাধ্যমের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া, যাতে অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশকে ইসলামি চরমপন্থার উত্থান হিসেবে দেখানো যায়। পতিত স্বৈরাচার ও দোসরদের উস্কানির ফাঁদে পা দিয়ে তাদেরকে সে সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে বলে অনেকে মনে করেন। এ ব্যাপারে সকলের সতর্ক ও সাবধান হওয়া জরুরি। পতিত স্বৈরাচার ও ভারতীয় কুশীলবরা একাট্টা হয়ে বাংলাদেশ মৌলবাদী, ইসলামি জঙ্গিবাদীদের দখলে চলে গেছে, এ রকম একটি ন্যারেটিভ দাঁড় করার চেষ্টা করছে। বাস্তবে এ ন্যারেটিভ প্রমাণ করতে তারা নানাবিধ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। ছাত্র-জনতা তাদের পাতা ফাঁদে পা দিবে কেন? হাজারো ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশের সব অংশীজনকে এ বিষয়ে আরো সতর্ক থাকতে হবে। অতি আবেগ কিংবা মতলবি প্রচারণায় বিভ্রান্ত হয়ে মাজার ভাঙ্গা, নিরপরাধ মানুষের ঘরবাড়ি ভাঙ্গা, নারী ফুটবলে বাঁধা প্রদান করার মত ঘটনাগুলো পরিবর্তিত বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্বের কাছে ভুল মেসেজ তুলে দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। কৃতকর্মের বিচারের আগে পতিত স্বৈরাচারের সাথে আপসের যেমন সুযোগ নেই, তেমনি আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে মব জাস্টিসের ধারণাকে এস্টাবলিশ করার যে কোনো অপপ্রয়াসকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের দায়িত্ব।
Posted ১:০৫ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh