| বৃহস্পতিবার, ০১ মে ২০২৫
গত ২২ এপ্রিলের ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান পেহালগামে তথাকথিত জঙ্গী আক্রমণে ২৬ জন পর্যটক নিহত হওয়ার ঘটনায় ভারত ঘটনা তদন্ত করার আগেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধ লড়ার শপথ ব্যক্ত করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার বিরোধীদলীয় নেতাদের সঙ্গে বসে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ, পাকিস্তানে পানি সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করাসহ সকল ধরনের চুক্তি ও দ্বিপাক্ষিক সাধারণ সম্পর্ক পর্যন্ত বর্জনের অনুমোদন নিয়ে রেখেছে। পাকিস্তানও জোরের সঙ্গে পাল্টা জবাব দিয়েছে যে এ ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই পাকিস্তান জড়িত নয়। ভারত যদি ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় সম্পাদিত সিন্ধু অববাহিকা পানি চুক্তি একতরফাভাবে বাতিল করে পানি সরবরাহ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে পাকিস্তান পানির জন্য প্রয়োজনে ভারতের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে। অর্থ্যাৎ কাশ্মীরের ঘটনা নিয়ে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা আবার চরমে উঠেছে। বিজেপি সরকার ২২ এপ্রিলের ঘটনার পর প্রচার করেছে যে, জঙ্গীরা পর্যটকদের পরিচয় শণাক্ত করার পর হিন্দুদের বেছে বেছে হত্যা করেছে। অথচ নিহত ২৬ জনের যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে সেই তালিকার ১৫ জনই মুসলিম। আহতদের যারা উদ্ধার করে হাসপাতালে পৌছিয়েছে বা নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছে তারাও মুসলিম।
কাশ্মীরের পেহালগাম এলাকায় কর্তব্য পালনকারী এক ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা বলেছেন যে, এ ঘটনা ঘটেছে ইন্টেলিজেন্স ব্যর্থতার কারণে। সেনাবাহিনীর ভূমিকায় কোনো ত্রুটি নেই। অর্থ্যাৎ পুরো ঘটনা বিজেপির সাজানো। আরেক দফা ক্ষমতায় আসার জন্য কাশ্মীরে একটি ইস্যু সৃষ্টি করে প্রতিবেশির সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি বজায় রাখা বিজেপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর গত দেড় দশকে ভারতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা ও মুসলিম বিদ্বেষ ছড়ানো ছাড়া বিজেপির আর কোনো কাজ ছিল না, যা এখন চরম আকার ধারণ করেছে। ভারতের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মূল ন্যারেটিভই হচ্ছে, মুসলমান জঙ্গিবাদী কার্ড ব্যবহার করে ভোটের লড়াইয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করে রাষ্ট্রক্ষমতাকে সাম্প্রদায়িক জনতুষ্টিমূলক এজেন্ডার দ্বারা আচ্ছন্ন রাখা।
একে এখন আর আচ্ছন্নতা বলা যায় না, এটি এখন রক্তপিপাসু উন্মত্ততায় পর্যবসিত হচ্ছে। হাজার বছর ধরে মুসলমান সুলতান ও মোঘলদের দ্বারা ভারত শাসিত হয়েছে। সে সময়টা ছিল ভারতের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক গঠন ও সমৃদ্ধির যুগ। একদা স্থানীয় রাজ-রাজরা ও সামন্ত শাসিত বহুধা বিভক্ত ভারতীয় রাজ্যগুলোকে জয় করে দিল্লীর কেন্দ্রীয় শাসনের সাথে একীভূত করার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠেছিল।
হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য ও সম্প্রীতিই ছিল বৃহত্তর মোঘল সাম্রাজ্যের শক্তি ও সমৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি। মোঘল শাসকরা বিজেপির মত সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন হলে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিদ্ধু বিজয় থেকে বাহাদুর শাহ জাফর পর্যন্ত হাজার বছরে মুসলমান শাসকরা পুরো ভারতকে হিন্দু জনশূন্য করে ফেলতে পারতেন। তারা শুধু হিন্দু-মুসলমান ঐক্য ও সম্প্রীতির মাধ্যমে ভারতকে একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ শান্তির জনপদে পরিনত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ঔপনিবেশিক বৃটিশরা ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসির মাধ্যমে হিন্দু-মুসলমানদের অনাস্থা, অবিশ্বাস ও দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগোষ্ঠিকে হাতে রেখে ভারত শাসন দীর্ঘায়িত করে এদেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে বৃটেনে পাচারের পন্থা গ্রহণ করেছিল। সেই বৃটিশদের সাথে ভারতীয় শাসকগোষ্ঠির কোনোরকম এন্টাগনিজম না থাকলেও তারা ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম গনগোষ্ঠি মুসলমানদের সাথে একটি চিরস্থায়ী বৈরিতার রাজনৈতিক ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও প্রভাবিত ইতিহাস, শিক্ষাব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক দর্শনে মুসলমান বিদ্বেষের বীজ এমনভাবে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল, যাতে দুই জাতি কখনোই একত্রে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে না পারে।
১৯৪৭ সালে টু নেশন থিউরির ফর্মূলায় মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠনের পরও একটি ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের আওতায় ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলমান জনগোষ্ঠির দেশ হিসেবে রয়ে যায়। হাজার বছর ধরে যেভাবে মুসলমানরা হিন্দুদের সাথে নিয়ে বিশাল ভারত সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল, একইভাবে আধুনিক, স্বাধীন গণতান্ত্রিক ভারতের অগ্রযাত্রায়ও মুসলমানদের অবদান হিন্দুদের চেয়ে মোটেও কম নয়। ভারতের স্বাধীনতার লড়াইয়ে আত্মাহুতি দানকারী ভারতীয়দের মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যা হিন্দুদের চেয়ে বেশি। ভারতের রাজনৈতিক গঠন, গণতন্ত্রায়ন, শিল্পায়ন, বাণিজ্যিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সংগীত, চলচ্চিত্র শিল্প থেকে শুরু করে মহাকাশ গবেষণা ও পারমানবিক বোমার অধিকারি হওয়ার মধ্য দিয়ে পরাশক্তি বনে যাওয়ার প্রধান শক্তি মুসলমানরা। দাদাভাই নওরোজি, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, জামশেদজি- জাহাঙ্গির টাটা, রতনজি টাটা, ইউসূফ খান (দিলিপ কুমার) থেকে শুরু করে এ আর রহমান কিংবা ভারতের পরমাণু বোমার জনক এপিজে আব্দুল কালাম পর্যন্ত মুসলমানদের গৌরবজনক ইতিহাসকে এখন উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা ঘৃণা, সংঘাত-সহিংসতার দ্বারা কলুসিত করেই বসে থাকতে চায়না, তারা ভারতীয় মুসলমানদের নির্মূল, ছিন্নমূল বাস্তুহীন করে বিতাড়িত করতে চাইছে।
Posted ১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০১ মে ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh