| বৃহস্পতিবার, ১৭ জুলাই ২০২৫
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গৌরবময় ঘটনা। জুলাই বিপ্লব নামে পরিচিত ছাত্র-জনতার আন্দোলন ছিল একটি গণতান্ত্রিক গণঅভ্যুত্থান, যা ২০২৪ সালের ৫ জুন থেকে ৫ আগস্ট গিয়ে শেষ হয়। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সকল বয়সী অগণিত মানুষের জীবনের বিনিময়ে অবসান হয় বিগত ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের।
স্বাধীনতা-পূর্ব ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ছাত্রদের নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়েছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৯০ সালের আন্দোলনে ছাত্ররা এরশাদ সরকারের পতনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলনেও ছাত্রদের অবদানকে অস্বীকার করার উপায় নেই। ঐতিহাসিক এই বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবির আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। স্বৈরশাসক হাসিনার একগুঁয়েমির কারণে আরো প্রবল হয়ে উঠেছিল সেই আন্দোলন, ৫ আগস্ট চূড়ান্ত রূপ লাভ করে।
অগণিত মানুষকে হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে ১৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে অবৈধভাবে দেশকে শাসন করার পর শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। এর তিন দিন পর নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। হাসিনার পতন এত সহজ ছিল না। গতবছরের ১৮ জুলাই ‘সম্পূর্ণ শাটডাউন’ কর্মসূচির পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকাসহ জেলাগুলোতে ব্যাপক সহিংসতা ঘটে। হাজার হাজার শিক্ষার্থী পরিবহন বন্ধ করে দেয়। পুলিশ ও ছাত্রলীগের ক্যাডার বাহিনী আন্দোলনকারীদের ওপর আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলি চালালে কমপক্ষে ২৯ জন শহীদ হন।
এছাড়া আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দমনে অবৈধ হাসিনা সরকার দেশের সর্বত্র ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেয়। ঢাকা ছাড়াও দেশের ৪৭টি জেলায় বিক্ষোভ, সংঘর্ষ, পুলিশের গুলি ও হামলা হয়। এসব ঘটনায় আহত হয় অন্তত দেড় হাজার মানুষ। ১৯ জুলাই মধ্যরাতে শেখ হাসিনা সরকার দেশব্যাপী কারফিউ জারি করে। দিনব্যাপী আন্দোলনকারীদের হত্যাকাণ্ড শুরু হয়। সেদিন কমপক্ষে ৬৬ জন নিহত হন। দেশব্যাপী মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনী। নরসিংদীর কারাগার, মেট্রোরেল স্টেশন ও বিআরটিএ অফিসসহ আরো সরকারি প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। শিক্ষার্থীদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন সহিংসতা, গুলি, অগ্নিসংযোগ ও মৃত্যুতে কেঁপে ওঠে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশ।
ওইদিন শুধু রাজধানীতেই ৪৪ জনকে হত্যা করা হয়। ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে কমপক্ষে ৫৯ জনকে হত্যা করে হাসিনার পেটুয়া বাহিনী। শুরু থেকে শুধু শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে অংশ নিলেও ওইদিন থেকে স্থানীয় ও সাধারণ মানুষ আন্দোলনে যোগ দেন। হত্যা, গণগ্রেফতার, হামলা, মামলা, জোরপূর্বক গুম এবং ছাত্র ও নাগরিকদের হত্যার প্রতিবাদে সারাদেশে ছাত্ররা ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ প্রতিবাদ শুরু করে। সবশেষ ৫ আগস্ট দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ কারফিউ অমান্য করে রাজধানীতে একত্রিত হয়। ‘মার্চ টু ঢাকা’ ডাকে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও দেশবাসী রাজধানী অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। দুপুর নাগাদ লাখো জনতা এগিয়ে যেতে শুরু করে হাসিনার সরকারি আবাস গণভবনে। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের কাছে পদত্যাগপত্র হস্তান্তর করেন স্বৈরশাসক হাসিনা।
এরপর হাসিনা তার বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে সামরিক বিমানে করে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পালিয়ে যান। ফ্যাসিবাদ বিতাড়িত হয়। শেখ হাসিনার সাথে ৩৫০ এমপি-মন্ত্রীসহ দেশের সকল জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগ যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ সকল অঙ্গসংগঠনের নেতাদের অনেকেই দেশের বাইরে পালিয়ে যান।
অনেকে দেশেই আত্মগোপন করেন। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বেশিভাগ মানুষের সমর্থনে এ সরকার গঠিত হয়। দল-মত নির্বিশেষে সবার উচিত এ সরকারকে সার্বিক সহযোগিতা করা। জুলাই ২৪-এ আন্দোলন করতে গিয়ে যারা শহীদ হয়েছেন, আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধ ’৭১-এর মতো ‘জুলাই ২৪’কেও যেন স্মরণ করতে পারি সেই প্রত্যাশা সবার কাছে।
Posted ১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৭ জুলাই ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh