| বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত
ইরান যুদ্ধ পঞ্চম সপ্তাহে পড়েছে। সহসা যুদ্ধ বন্ধের কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। বরং শিগগির তা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো অবস্থান খার্গ দ্বীপে স্থল সেনা মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর যুদ্ধের ভয়াবহতা যে আরো বৃদ্ধি পাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এদিকে পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর ও ওমান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিরোধ নিস্পত্তির যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা সামনে রেখে ইসরায়েল ইরানের সামরিক ও কৌশলগত সকল স্থাপনার ওপর বোমাবর্ষণ বৃদ্ধি করেছে।
ইসরায়েল ভাবছে যে, আলোচনার ফলাফল যদি সাময়িক যুদ্ধবিরতিও হয়, তাহলে তাদের পক্ষে ইরানের ওপর হামলা করা সম্ভব হবে না। সে কারণে তারা ইরানে তাদের মরণ কামড় দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। আমেরিকান যুদ্ধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, ইরান যেহেতু দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা দীর্ঘীদন থেকেই নিয়েছে, সেজন্য খার্গ দ্বীপ হোক অথবা অন্য যেকোনো স্থানে স্থল সেনা মোতায়েন করার উদ্যোগে আমেরিকান সৈন্যদের জীবননাশের হুমকি যেমন বৃদ্ধি পাবে, একইভাবে যুদ্ধের অবসান ঘটানোও অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাছাড়া এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও আধিপত্য ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর প্রধান সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালী যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়েছে। ইরান কেবল বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোর কিছু তেলবাহী জাহাজকে হরমুজ অতিক্রম করার অনুমতি দিয়েছে। ফলে ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে খুচরা জ্বালানির মূল্য বিভিন্ন স্টেটে গ্যালন প্রতি দেড় থেকে দুই ডলার পর্যন্ত বেড়েছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শুধু জ্বালানি নয়, জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল সকল পন্য ও সার্ভিসের মূল্য আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাবে। বিশ্বের দেশে দেশে সরকারগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল দেশের জনগণের ওপর সবকিছুর বর্ধিত মূল্যের চাপ পড়বে। দিশেহারা হয়ে পড়বে বিশ্ববাসী। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথ হামলা শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রব্যাপী পেট্রোলের গড়মূল্য গ্যালনপ্রতি ৩.৪৮ ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে সাধারণ ভোক্তা পর্যায়ে গত ২৬ মার্চ ৪.৫৬ ডলার হয়েছে, অর্থাৎ প্রতি গ্যালনে ১.০৮ ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় পেট্রোলের খুচরা মূল্য বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। যুদ্ধ শুরুর দিনের গ্যালনপ্রতি পেট্রোলের মূল্য ৩.৪৮ ডলার থেকে ২৬ মার্চ ৫.৪১ ডলারে উন্নীত হয়েছে, অর্থাৎ গ্যালনপ্রতি মূল্য বেড়েছে ১.৯৩ ডলার।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফুয়েল, যা প্রধানত ডিজেল, যুক্তরাষ্ট্রে এ পণ্যের পাইকারি মূল্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৭০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ইউরোপীয় দেশগুলোতে ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে গ্যালনপ্রতি প্রায় ৮০ শতাংশ। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ব্যয় নির্বাহের উদ্দেশ্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসের কাছে ২০০ বিলিয়ন ডলার বা আরো অধিক পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ চাইতে পারেন বলে আভাস পাওয়া গেছে। যদিও এ বিপুল পরিমাণ অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কল্যাণে নিবেদিত সোশ্যাল সিকিউরিটি, মেডিকেয়ার ও মেডিকেইডের জন্য ব্যয়ের চেয়ে অনেক কম; কিন্তু যুদ্ধের প্রভাব-প্রতিক্রিয়ার সার্বিক অর্থনৈতিক চাপ ভয়াবহ ও সুদূরপ্রসারী, যা প্রত্যেক আমেরিকানের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। যুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলো এবং বুদ্ধিজীবীরা ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের কাছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর যুক্তরাষ্ট্রের বড় ও প্রলম্বিত কয়েকটি সামরিক অভিযানের ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান তুলে ধরে এ পর্যায়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে অহেতুক ও অসময়োচিত বলে বর্ণনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল, ইরানে ‘রেজিম চেঞ্জের’ জন্য তাদের হামলা হবে সহজ ও ঝামেলাবিহীন। কিন্তু ইরানের পালটা হামলার প্রচণ্ডতা হ্রাস না পাওয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে যুদ্ধের হিসাব-নিকাশ নতুন করে করতে হচ্ছে। যুদ্ধের চার সপ্তাহে আমেরিকান হতাহতের সংখ্যা ন্যূনতম; কিন্তু সামরিক ব্যয় অনেক বেশি। ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব অর্থনীতির নেতিবাচক প্রবণতাকে যে মন্দ থেকে মন্দতর অবস্থার দিকে ঠেলে দেবে, সেসব আলামত সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, অর্থনীতির নেতিবাচক পরিণতি ঠেকানো ততই কঠিন হবে। বিশ্ব এমন একটি পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে চায় না। তারা যত দ্রুত সম্ভব যুদ্ধের অবসান চায়।
Posted ১২:২৪ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh