| বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
রাষ্ট্র যদি অপরাধের বিচার না করে তখন আইনের শাসন ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে। সরকারি বাহিনীগুলো যদি দলীয় সরকারের আজ্ঞাবহ হিসেবে কাজ করে, তখন দলীয় নেতাকর্মীদের নিপীড়ন, চাঁদাবাজি ও জবরদখলে অতীষ্ঠ সাধারণ মানুষের তাদের অভিযোগ দাখিল করার জন্য আইন প্রয়োগকারী মহলের কাছে গিয়ে ন্যায় লাখের আশা অথবা নিপীড়কের বিরুদ্ধে ব্রবস্থা গ্রহণের আশা করতে পারে না।
অতএব, ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিই সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। সমাজে ও রাষ্ট্রে স্থান করে নেয় ভীতি, প্রতিশোধস্পৃহা। মানুষ আইনের ওপর আস্থা হারিয়ে নিজেরাই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, যা শেষ পর্যন্ত আরও সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়। এই প্রক্রিয়াটি একটি সমাজকে ধীরে ধীরে নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে অন্যায় আর ব্যতিক্রম নয়; বরং এক ধরনের স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়। বাংলাদেশে যুগের পর যুগ ধরে সেই চর্চাই হয়ে আসছে। ১৯৭৫ হোক, ১৯৯০ হোক, ২০২৪ হোক, কোনো ঘটনা থেকেই শাসককূলের কোনো শিক্ষা হয়নি।
জনগণও ধরে নিয়েছে যে, কিছুকাল পর পর তাদেরকে অন্যায়ের প্রতিকারের জন্য আইন নিজেদের হাতে তুলে নিতে হবে। কিন্তু কিছুতেই যখন কিছু ঘটছে না, তখন সমাজকাঠামোতে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের কোনো আশা করা যায় না। তবে দেশে দেশে এর ব্যতিক্রমও আছে। ইতিহাস সাক্ষী, যে সমাজ অতীতের অন্যায়কে স্বীকার করে অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হয়, সেই সমাজই টেকসই শান্তি ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রে বিচারহীনতা যতদিন বহাল রয়েছে এবং একমাত্র সে কারণেই সমাজে প্রতিশোধপরায়ণতা, বিশৃঙ্খলা এবং স্বেচ্ছাচারিতা নতুন নতুন রূপে ফিরে ফিরে আসছে।
কেউ এটুকু উপলব্ধি করতেও চায় না যে, ন্যায়বিচার কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি জাতির নৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অপরিহার্য পূর্বশর্ত। তবে মনে রাখতে হবে, কেবল বিচারহীনতাই নয়, আমাদের সমাজকে গ্রাস করেছে আরও দুটি গভীর ও বিপজ্জনক প্রবণতা: পক্ষপাতিত্ব এবং ‘পানি ঘোলা করার সংস্কৃতি’। পক্ষপাতিত্বের এই প্রবণতা আমাদের নৈতিক মেরুদণ্ডকে ক্রমাগত দুর্বল করে দিয়েছে। আমরা নিজের ক্ষতি হলে উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদ করি, কিন্তু অন্যের ক্ষতির ক্ষেত্রে নীরব থাকি, আমাদের ন্যায়বোধও যেন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীভেদে ভিন্ন হয়ে যায়। ফলে অন্যায়কে আমরা বিচার করি না ন্যায়—অন্যায়ের সার্বজনীন মানদণ্ডে; বরং বিচার করি ব্যক্তি, পরিবার, দল, শ্রেণী কিংবা সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে। অথচ নৈতিক দর্শনের একেবারে মৌলিক সত্য হলো, অন্যায়, যে—ই করুক, অন্যায়ই থাকে।
এই সত্যকে অস্বীকার করা মানে ন্যায়ের ধারণাকেই আপেক্ষিক করে তোলা, যা শেষ পর্যন্ত সমাজের সব স্তরে অন্যায়ের স্বাভাবিকীকরণ ঘটায়। বাংলাদেশে একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এখনো যেভাবে মব সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে চলেছে। সরকার এ ধরনের প্রবণতা প্রতিরোধে কোনো মনোযোগ দিচ্ছে বলে দৃশ্যত মনে হচ্ছে না। একটির পর একটি ঘটনা ঘটে চলেছে রাজধানী ঢাকা থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত। সরকারের আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহ যদি এসব নিয়ন্ত্রণে জরুরী পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তাহলে সরকারের পরিণতিও অতীত সরকারগুলোর মতো হতে বাধ্য।
Posted ১২:১১ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh