| বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
ভাগ্য বদলানোর এক বুক আশা নিয়ে প্রতিবছর কয়েক লাখ বাংলাদেশি পাড়ি জমান বিদেশে। বাংলাদেশের জন্য তারা পাঠান মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা, যা দেশের উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা রাখে। গতবছরও প্রবাসীরা পাঠিয়েছে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা। এ আয় বাংলাদেশের মোট জিডিপির ৭ শতাংশের বেশি। কিন্তু যারা কঠোর পরিশ্রমে এই বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স প্রেরণ করেন, তারা যে স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমান, তাদের সেই স্বপ্নের গন্তব্য অনেকের জীবনের শেষ ঠিকানা হয়ে দাঁড়ায়। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য বলছে, ১৯৯৩ সাল থেকে গত ৩১ বছরে ৫২ হাজার ৩৭১ প্রবাসীর লাশ দেশে এসেছে। এই ৩২ বছরের তথ্যই বোর্ডের কাছে আছে। তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতিবছরই লাশের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।
কল্যাণ বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, এর বাইরে অনেক লাশ বিদেশের মাটিতেই দাফন করা হয়। অনেক পরিবার লাশ দেশে আনতে চান না। যার ফলে পরিবারের অনুমতি সাপেক্ষে বিদেশেই লাশ দাফনের ব্যবস্থা করে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস। করোনা মহামারির সময়ে এই সংখ্যা অনেক বেশি ছিল বলে জানান তারা। প্রসঙ্গত, লাশ দেশে আসলে বিমানবন্দরে অবস্থিত প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে দাফন ও লাশ পরিবহনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা দেওয়া হয় বোর্ডের পক্ষ থেকে। ২০০৫ সালের পর থেকে দেশে প্রবাসীদের লাশ আসার সংখ্যা বাড়ছে।
সবচেয়ে বেশি লাশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মতে, কোনও রোগে মারা গেলে সেটিকে স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে ধরা হয়। এর বাইরে প্রবাসীদের বেশিরভাগ মৃত্যুর কারণ হচ্ছে দুর্ঘটনা। প্রবাসী কর্মীদের মৃত্যুর কারণ জানতে সরকারিভাবে কোনও গবেষণা করা হয়নি। তবে প্রাপ্ত প্রবাসী কর্মীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মারা যায় মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে। মৃতদের বড় অংশই মধ্যবয়সী বা তরুণ। এছাড়াও হৃদরোগসহ বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, সড়ক দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা, কিংবা প্রতিপক্ষের হাতেও খুন হন বাংলাদেশিরা। বিদেশে প্রবাসী কর্মীদের মৃত্যুর হার এত বেশি কেন তা কখনও খতিয়ে দেখা হয়নি। এত বেশি কর্মী স্ট্রোক অথবা হার্ট অ্যাটাকে কেন মারা যাচ্ছেন তার সঠিক কারণ জানতেও অনুসন্ধান করা হয়নি। প্রবাসী কর্মীদের অভিযোগ, কর্মস্থলে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ এড়াতেও স্ট্রোকে কিংবা হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর কথা ডেথ সার্টিফিকেটে লেখা হয় অনেক সময়। প্রবাসীদের প্রায় ৫৬ শতাংশই মারা যান ব্রেন স্ট্রোকে। তরুণ বা মধ্যবয়সি শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এটি এক অস্বাভাবিক বিষয়। ২০ শতাংশ মৃত্যুর কারণ হৃদরোগ।
চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত গরম থেকে হঠাৎ এসির ঠান্ডায় আসা বা দীর্ঘ সময় পানিশূন্যতায় থাকা হার্টের ওপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করে। গরমে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয় অনেক অদক্ষ শ্রমিককে। এই অতিরিক্ত শারীরিক চাপ শরীর সহ্য করতে পারে না। জমি বিক্রি বা ঋণ করে বিদেশে যাওয়ায় কিস্তি শোধের চিন্তা, পরিবারের থেকে দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা এবং প্রবাস জীবনের একাকিত্ব থেকে তৈরি হওয়া মানসিক চাপ স্ট্রোকের অন্যতম বড় কারণ। প্রবাসীদের অকাল মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে রাষ্ট্রীয় গবেষণার পাশাপাশি প্রতিটি দেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোতে নিয়মিত ‘হেলথ ক্যাম্প’ ও ‘মানসিক কাউন্সেলিং’ চালু করা এখন সময়ের দাবি। এ ছাড়াও বিমা সুবিধা নিশ্চিত করা এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা জরুরি। রেমিট্যান্সের চাকা সচল রাখা প্রবাসীরা আমাদের দেশের গর্ব। কিন্তু কফিনের এই দীর্ঘ মিছিল আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, তাদের জীবনের নিরাপত্তা আজও অবহেলিত। সচেতনতা এবং সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই পারে এই অকাল মৃত্যুর মিছিল থামাতে।
Posted ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh