| বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬
আগস্ট মাস চলছে। শুধু বাংলাদেশই নয়, উপমহাদেশের ইতিহাসে আগস্ট নানা কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রায় দুইশ বছরের ঔপনিবেশিক পরাধীনতার শেকল ভেঙ্গে পাকিস্তান ও ভারত স্বাধীনতা লাভ করেছিল ১৯৪৭ সালের যথাক্রমে ১৪ ও ১৫ আগস্ট। এর আগে ১৯৪৬ সালের ১৬ থেকে ১৯ আগস্ট ৪ দিন কলকাতায় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গায় হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। ইতিহাসে তা ‘গ্রেট কলকাতা কিলিং’ নামে পরিচিত। এ দাঙ্গার সময় হাজার হাজার মুসলমান পরিবার কলকাতা, আসাম ও বিহার থেকে পূর্ব বাংলায় মাইগ্রেট করতে বাধ্য হয়। হিন্দুরা বাংলা ভাগের পক্ষে থাকলেও মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা ও প্রদেশগুলোর প্রতিনিধিরা শুরুতে ঐক্যবদ্ধ বা অখন্ড বাংলার পক্ষে ছিল। কিন্তু কলকাতায় দাঙ্গার পর সে চিত্র আমূল পাল্টে যায়। পূর্ব বাংলার মুসলমানরা পাকিস্তান আন্দোলনে সমর্থন দিয়ে তা বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। বাহ্যিকভাবে বৃটিশদের গণতান্ত্রিক পন্থাকে সমর্থন করে এবং পশ্চিম বাংলাকে ভারতের সাথে রাখার স্বার্থে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানে ঠেলে দিতে কুণ্ঠিত না হলেও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ব বাংলাকে আলাদা করে পাকিস্তান রাষ্ট্রকে দুর্বল ও খণ্ডিত করার চক্রান্ত শুরু হয়। ভিন্ন প্রেক্ষাপট এবং পাকিস্তানী শাসকদের বৈষম্য নীতি ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বদলে সামরিক শাসন অব্যাহত রাখার বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির সুত্রে শেখ মুজিবুর রহমানও সেই চক্রান্তের সাথে জড়িত হয়ে পড়েন।
কালিদাস বৈদ্য ও চিত্তরঞ্জন সুতারদের লেখায় সেসব ইতিহাস বেরিয়ে এসেছে। ষাটের দশকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সামরিক-বেসামরিক ৩৫ জন আসামীর কেউ কেউ অনেক পরে এই মামলাকে একটি সত্য মামলা হিসেবে স্বীকার করে নেন। ক্যাপ্টেন এ শওকত আলী তাদের একজন। ২০১১ সালে প্রকাশিত তার লেখা বইয়ে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাকে সত্য মামলা হিসেবে স্বীকার করেন। রাজনৈতিক বিষয়গুলোকে পাকিস্তানী সামরিক জান্তার রাজনৈতিকভাবে সমাধানের ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে যেমন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়েছিল, একইভাবে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের গণমানুষের আকাক্সক্ষার বাইরে গিয়ে গণতন্ত্রের পথ চিরতরে রুদ্ধ করে দিয়ে দেশে একদলীয় দু:শাসন চাপিয়ে দেয়ার প্রেক্ষাপটে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবসহ তার পরিবার নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হন। শেখ মুজিবের সেই নিমর্ম হত্যা-কে জাতি স্বাগত জানিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল।
সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিয়ে প্রতিশোধের রাজনীতি করতে গিয়ে মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা পিতার চেয়েও বড় স্বৈরাচারে পরিনত হয়ে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়ে আরেকটি রক্তাক্ত অভ্যুত্থানকে অনিবার্য করে দেড় দশকের আওয়ামী দুঃশাসন থেকে জাতিকে মুক্ত করতে চব্বিশের উত্তাল ছাত্র-জনতা জুলাই মাসকেই বেছে নিয়েছিল। জুলাই অভ্যুত্থান কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে সংঘটিত হয়নি। তবে বিএনপি-জামায়াতের মত মূল ধারার রাজনৈতিক দলগুলোই এই অভ্যুত্থানের বেনিফিশিয়ারি বা সুবিধাভোগী হয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধীদলও পরোক্ষভাবে ক্ষমতার অংশীদার। বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরাও সরকারি দলের মতো একই রকম সুযোগ সুবিধা ভোগ করে থাকেন। জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত বিএনপি সরকারের শপথ গ্রহণের ৬ মাসের মাথায় জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর রাষ্ট্রীয় আয়োজন কিছু অপ্রীতিকর ঘটনার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে।
সেখানে আবারো ইতিহাস বিকৃতি এবং জাতিকে বিভক্ত ও বিভ্রান্তির দিকে নিয়ে যাওয়ার এক নীরব তৎপরতা প্রত্যক্ষ করা গেছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু মুজিবীয় শাসনে স্বাধীন বাংলাদেশ আইয়ুব-ইয়াহিয়ার চেয়েও ভয়ঙ্কর দুঃশাসনের সম্মুখীন হয়। শেখ মুজিবের সাড়ে তিন বছরের শাসনে মুজিববাহিনীর হাতে যত সংখ্যক বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মী গুম-খুন ও হত্যার শিকার হয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধের আগে পাকিস্তানের তেইশ বছরেও তার অর্ধেক হয়নি। এ সময়ে রাষ্ট্রীয় লুন্ঠন এবং বৈষম্যের কারণে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে লাখ লাখ মানুষ মৃত্যুর শিকার হয়েছে। একাত্তর পরবর্তী সরকারের অভ্যন্তরে যে অপরাজনীতির চর্চা, আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি, অদক্ষতা ও বিভাজন- বৈষম্যের সূচনা হয়েছিল, পঁচাত্তরের বিপ্লবী পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যে আমূল পরিবর্তন হওয়ার কথা তার কোনো উদ্যোগই গ্রহণ করা হয়নি। প্রেসিডেন্ট জিয়ার পরিকল্পনায় সবই ছিল, তাঁকে হত্যার মধ্য দিয়ে সে সম্ভাবনা নস্যাৎ করা হয়েছে।
Posted ১:১০ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh