কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ ২০২৫
শেখ হাসিনা যখন দম্ভের সঙ্গে বলতেন, ‘আমার বাপ এদেশ স্বাধীন করেছে, এটা আমার বাপের দেশ’। এবং সেই দম্ভে তিনি যখন এদেশের মানুষকে পাখির মত খুন করার, গুম করার নির্দেশ দিতেন, ক্রমাগত মিথ্যা কথা বলতেন, যাকে খুশি তাকে ভোট ছাড়া সাংসদ বানাতেন, মন্ত্রী বানাতেন, এমন কী রাষ্ট্রপতি বানাতেন, পছন্দের লোকদের দেশের সম্পদ লুটপাট করার অনুমতি দিতেন, তখন দেশের সৎ ও সচেতন মানুষ তাকে পরিত্যাগ করলেও বিরাট এক শ্রেণির মানুষ তার নামে জয়োধ্বনী দিতেন, তাকে সমর্থন করতেন। তার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে তার নিকটস্থ চেলা-চামুণ্ডারাও ফোসফাস করত, সেইসবেও জয়োধ্বনী দিতেন কিছু মানুষ। রাজপথে প্রকাশ্যে তার দলের কর্মীরা কুপিয়ে মানুষ হত্যা করত, তার দলের ছাত্র সংগঠনের কর্মী ঘোষণা দিয়ে ক্রমাগত নারী শিক্ষার্থীদের ধর্ষণ করত, ধর্ষণের সেঞ্চুরি করে কেক কেটে তা উদযাপন করত, তারপরেও একদল শিক্ষার্থী সেই ছাত্র সংগঠনের মিছিলে যেত, তাদেরও একটা আদর্শ আছে বলে প্রচার করত।
আগস্টের ৫ তারিখে গণমানুষের অভ্যুত্থানের মুখে দাম্ভিক হাসিনা ও তার দলের প্রায় সকল নেতা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে অত্যাচারের শূন্যস্থান পুরণ করতে এগিয়ে আসে আরেকটি বড়ো রাজনৈতিক দল, বিএনপি। তারা প্রায় বিনা বাঁধায় দেশের চাঁদাবাজির হাবগুলোর দখল নিয়ে নিয়েছে। সিংহের মত এখন বিএনপির নেতা কর্মীরা রাজপথে বুক ফুলিয়ে হাঁটছেন, যারা হাসিনার আমলে ভয়ে লুকানোর জন্য সারাদিন গর্ত খুঁজত। যখন তারা ইঁদুর তখন তাদের পেছনে কেউ ছিল না, যখন তারা সিংহ তখন তাদের অনেক চাটুকার, তোষামোদকারী। পুরোপুরি যখন তারা রাষ্ট্রক্ষমতার মালিক হবে, পুলিশ ও প্রশাসনের নির্দেশদাতা হবে তখন তাদের চাটুকারের সংখ্যাও বাড়বে।
কেন এমন হয়? কেন মানুষ অত্যাচারীর চাটুকারিতা করে? ধামাধরা হয়? কেন অত্যাচারীর সীলমোহর, উপাধী ইত্যাদি গর্বের সঙ্গে নিজের নামের পাশে বসিয়ে আনন্দ পায়? হাসিনা ছিল একজন পরিক্ষীত খুনি, মিথ্যুক, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী, একজন খুব বড়ো মাপের দেশোদ্রোহী, এসব জেনেও একদল উচ্চশিক্ষিত, পিএইচডি ডিগ্রিধারী মানুষ কেন তার দেয়া পদ-পদবী, পুরস্কার, সম্মাননা, উপাধী গ্রহণ করত? কারণ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হচ্ছে পেশীশক্তির পুজো করা।
বিষয়টি একটি উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করি। আপনাকে যদি কেউ বলে, তুমি একটা গরু। আপনি কি খুশি হবেন? না, আপনি খুব রেগে যাবেন। যদি বলে, তুমি একটা গাধা, তাহলে তো শুধু রেগেই যাবেন না, ক্ষেপে গিয়ে তাকে মারতে আসবেন। কিন্তু আপনাকে যদি কেউ বলে, তুমি তো দেখি একটা সিংহ, তাহলে খুশিতে বুকটা আরো দুই ইঞ্চি ফুলিয়ে কৃতজ্ঞ-দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাবেন। যদি বলে, আপনি তো দেখি একটা বাঘের বাচ্চা, তাহলে তো আর কথাই নেই। খুশিতে নাচতে শুরু করবেন। শুধু কি এই কথাগুলো আমরা মুখে মুখে বলি, লিখিত উপাধিও দিই, অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী আবুল কাশেম ফজলুল হককে তার বিশাল ব্যক্তিত্ব ও সাহসের জন্য বাঙালি তাকে উপাধী দিল, শের-এ বাংলা, মানে বাংলার বাঘ। আমরা তাকে ‘বাংলার গরু’ কিংবা ‘বাংলার গাধা’ উপাধি দিইনি। তিনিও বুক ফুলিয়ে এই উপাধী গ্রহণ করেছেন।
গরু কী করে? গরুর উলান থেকে তার বাছুরের জন্য সংরক্ষিত দুধ আমরা চুরি করে খাই। এই যে বাছুরের দুধ চুরি করে খাই এটি পৃথিবীর মানুষের মাথায়ই নেই। আমাদের কাছে এটি খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা, সবাই ধরেই নিয়েছি গরুর জন্মই হয়েছে তার সন্তানের দুধ আমাকে দেবার জন্য। শুধু তাই না, তাকে হত্যা করে আমরা তার মাংসও খাই। এতো উপকার যার কাছ থেকে পাই তার নাম আমার নামের সঙ্গে কখনো যুক্ত করি না। গাধা কি স্বেচ্ছায় বোঝা টানে? ঘোড়া কি নিজের ইচ্ছায় তার পিঠে আমাকে চড়িয়ে নিয়ে দূর দূরান্তে ছুটে যায়? না, এই কাজগুলো করতে আমরা ওদের বাধ্য করি। সিংহের ওলানে কি দুধ হয় না? বাঘের ওলানে কি দুধ নেই? আছে, কিন্তু আমাদের কী সাধ্য বাঘ, সিংহের ওলান থেকে তাদের সন্তানের দুধ চুরি করি। বাঘ, সিংহ কি বোঝা বইতে পারে না? বাঘের পিঠে চড়ে কি ঘোড়ার মত দূর দূরান্তে যাওয়া সম্ভব নয়?
ওদের গায়ে তো গাধা, ঘোড়ার চেয়ে অধিক শক্তি আছে। তাহলে আমরা ওদের পিঠে কেন আমাদের বোঝা চাপাই না? কারণ আমাদের সেই সামর্থ নেই। বাঘ, সিংহের পিঠে বোঝা চাপানোর সাধ্য আমাদের নেই, ওদের ওলান থেকে দুধ চুরি করে নেবারও সাধ্য নেই। ওরা আমাদের উপকার তো করেই না বরং সুযোগ পেলেই আমাদের ওপর হামলে পড়ে এবং আমাদের হত্যা করে, হাসিনার মত। তারপরও আমরা আমাদের নামের পাশে বাঘের নাম চাই, সিংহের নাম চাই, গরু, গাধা কিংবা উট, ঘোড়ার মত উপকারী প্রাণীর নাম চাই না। কারণ আমাদের ভেতরে পেশীশক্তির প্রতি দারুণ এক ভক্তি কাজ করে। এই ভক্তিটা হচ্ছে প্রাকৃতিক, এর ভিত্তি হচ্ছে ভীতি। সকল প্রাণীর মধ্যে এই ভীতি কাজ করে। মানুষকে শিক্ষা-দীক্ষা অর্জনের মধ্য দিয়ে এই ভীতি দূর করতে হয়, প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে হয়, তখন সে পেশীশক্তির কাছে নয়, নতজানু হয় জ্ঞানের কাছে, সততার কাছে, নৈতিকতার কাছে। সেই জায়গাটায় পৌঁছানোর জন্যই একজন মানুষকে আজীবন চেষ্টা করতে হয়।
হলিসউড, নিউইয়র্ক।
Posted ১:০৬ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh