কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
প্রথম যে কবিতাটি খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সেটি লিখি মাত্র ১৯ বছর বয়সে। কবিতার নাম “মুক্তিযুদ্ধ”। এই কবিতা অসংখ্যবার রেডিওতে, বাংলাদেশ টেলিভিশনে, বেসরকারি চ্যানেলে, মঞ্চে, এবং আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ায়, পড়া হয়েছে; এখনও স্বাধীনতা দিবসে, বিজয় দিবসে বিভিন্ন স্কুলে, মঞ্চে পড়া হয়, আবৃত্তির সংগঠনগুলো শিক্ষার্থীদের শেখায়। “এইখানে এক মুক্তিপাগল মানুষ ছিল/ দুই চোখে তার স্বাধীনতার লাল পতাকা/ বুকের ভেতর সবুজ ধানের স্বপ্ন আকা…” এইরকম করে লেখা বেশ বড়ো একটি কবিতা।
তখনও কিন্তু ছন্দের আনুষ্ঠানিক পাঠ আমার হয়নি। পরে যখন ছন্দ শিখেছি, মাত্রা গুনে দেখি কবিতাটি শুদ্ধ স্বরবৃত্ত ছন্দে পূর্ণ পর্বে রচিত। কী করে ছন্দ না শিখেই এক কিশোর এমন শুদ্ধ ছন্দে একটি দীর্ঘ কবিতা লিখে ফেললো? তখনই বুঝতে পারি ছন্দ আসলে যতটা না শেখার বিষয় তার চেয়ে অনেক বেশি প্রকৃতিপ্রদত্ত বা ঐশ্বরিক। সুপ্রাচীনকালে যখন ছন্দের ব্যকরণ তৈরি হয়নি তখন তারাই কবি বলে বিবেচিত হতেন যাদের কথায় ছন্দ ছিল।
এরপর আমাকে দীর্ঘ ১৮ বছর অপেক্ষা করতে হয় দ্বিতীয় জনপ্রিয় কবিতাটির জন্য। এটি আমি লিখি ২০০৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর, আইভরি কোস্টের রাজধানী আবিদজান শহরে বসে। ছুটিতে বাড়ি যাবো, প্রস্তুতি নিচ্ছি, এক রাতে স্ত্রীকে চিঠি লিখতে গিয়ে লিখে ফেলি “বাড়ি আছ” কবিতাটি। মাহিদুল ইসলামের আবৃত্তিমেলা থেকে প্রকাশিত প্রথম অ্যালবামে তিনি এই কবিতাটি আবৃত্তি করেন। এরপরে বিখ্যাত/অখ্যাত অনেকেই কবিতাটি পড়েন। আমি নিজেও বহুবার পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন মঞ্চে এই কবিতাটি পাঠ করেছি। প্রতিবারই মানুষের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা পেয়েছি।
যদিও স্বনামধন্য আবৃত্তিকারেরা কবিতাটি বহুবার আবৃত্তি করেছেন কিন্তু আমার স্ত্রী বলেন, কবিতাটি নাকি আমার কন্ঠে শুনতেই তার কাছে বেশি ভালো লাগে। তার ভাষায়, এই কবিতায় যে আবেগ আছে তা অন্য কারো কণ্ঠে তেমনভাবে আসে না। বলা যায় নিউইয়র্কে এই কবিতাটিই আমাকে ব্যপকভাবে জনপ্রিয় করে তোলে। নিউইয়র্কের অনেকেই বলেন, এটি আমার সিগনেচার পোয়েম। কিন্তু আমি তা মনে করি না। বাড়ি আছ কবিতায় এক প্রবাসীর কষ্টের, স্বপ্নের, আনন্দের কথা আছে। কবিতাটি শুরু হয়েছে এভাবে, “এই, বাড়ি আছ?/ ফোন বাজছে, ধরছ না যে?/ ব্যস্ত নাকি নানান কাজে?/ শেল্ফে রাখা পুরনো সব গ্রন্থগুলো/ নেড়ে চেড়ে ঝাড়ছ বুঝি স্মৃতির ধুলো/ নাকি তুমি ক্যালেন্ডারের পাতার ওপর হুমড়ি খেয়ে সময় বাছ?/ এই বাড়ি আছ?”
শহীদ কাদরী একবার আমাকে বলেছিলেন, “জনপ্রিয়তা একটা ফালতু বিষয়। আগে লোকেরা শহীদ কাদরী মানেই “তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা” মনে করত, পরে “বন্য শূকর খুঁজে পাবে প্রিয় কাদা”।
কখন যে কী জনপ্রিয় হয় বলা মুশকিল। এগুলোর চেয়ে কত ভালো কবিতা আমার আছে সেগুলো নিয়ে কেউ কোনো কথা বলে না।”
আমি অবশ্য মনে করি না যে জনপ্রিয়তা একটা ফালতু বিষয়। শহীদ কাদরীর “বৃষ্টি বৃষ্টি” একটি ভালো কবিতা, তা ছাড়া এই জনপ্রিয় দুটি কবিতাই তার সমগ্রের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কবিতা। একথা ঠিক যে মানুষ সহজ, ছন্দবদ্ধ, দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধ, মা কিংবা প্রিয়তমার প্রতি ভালোবাসার কথা, এইসব কবিতা বেশি পছন্দ করে। কবিতায় একটি আবেগময় গল্প আছে এমন কবিতাও মানুষ পছন্দ করে, যেমন জয় গোস্বামীর মেঘবালিকা, নির্মলেন্দু গুণের স্বাধীনতা শব্দটি কি করে আমাদের হল, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কেউ কথা রাখেনি কিংবা রবীন্দ্রনাথের বাঁশি। এই কবিতাগুলো ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে কারণ এগুলোর মধ্যে একটি সিনেম্যাটিক গল্প আছে। পড়ার সময় মানুষ সেই চিত্রকল্পটি দেখতে পায়।
মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা আমার “পা” কবিতাটিও খুব জনপ্রিয় হয়। এরপর খুব আলোচিত হয়েছে “নষ্ট হবে?”। এই কবিতায় একটি নেতিবাচক শব্দবন্ধ দিয়ে ইতিবাচক আবহ তৈরি করেছি, সমাজের নষ্ট জায়গাগুলো চিহ্নিত করেছি। কবিতাটি বহুল পঠিত, ব্যাপকভাবে আবৃত্তিকারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের, প্রবাসের, ভারতের নামকরা আবৃত্তিশিল্পীরা এই কবিতাটি আবৃত্তি করেছেন।
“…এখন সে খুব নষ্ট নারী
তুড়ি মেরে দিব্যি ওড়ায়
মন্ত্রী, সচিব
ফ্ল্যাগ লাগানো ডিউটি ফ্রি ভলবো গাড়ি।
ধর্ম, টর্ম?
মামলা পুলিশ?
কাজ হবে না,
ওর সঙ্গে তর্কে এখন কেউ পারে না।
চুলের মুঠি ধরতে গেলে হাত ভেঙে দেয়।
শিষ বাজিয়ে একলা হাঁটে ওড়না ছাড়া,
সিগারেটে টান মেরে সে
ধোঁয়া ছাড়ে দূর্ণীতিবাজ নেতার মুখে।…”
মজার ব্যাপার হলো আমার যে কবিতাগুলো সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়েছে তার প্রায় সবগুলোই স্বরবৃত্ত ছন্দে রচিত। তার মানে ছন্দের প্রতি কবিতাপ্রিয় মানুষদের এখনও ব্যাপক আকর্ষণ আছে।
এই সপ্তাহেই একটি আধ্যাত্মিক কবিতা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করি। কবিতাটি ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লিখেছি। কিন্তু হঠাৎ করে কবিতাটিকে পাঠক খুব নিয়েছে। ৩ দিনের মধ্যে ১৭ হাজার পাঠক যখন একটি কবিতায় রিয়েক্ট করে তখন এটিকে অবশ্যই জনপ্রিয় কবিতাই বলা যায়। যদিও এটি জনপ্রিয় ধারার কবিতা নয়। জীবাত্মার চূড়ান্ত পরিণতির অনুসন্ধান রয়েছে এই কবিতায়। এটির শিরোনাম “অন্ধকার-৪”। অন্ধকার শিরোনামে যেহেতু এর আগে আরো ৩টি কবিতা লিখেছি তাই এটি অন্ধকার ৪। এই সময়ে এই কবিতাটিকে পাঠক প্রাসঙ্গিক এজন্য মনে করেছেন, আমি সদ্য কাবাঘর তাওয়াফ করে এসেছি, ওমরাহ করে এসেছি, কবিতাটির সঙ্গে কাবাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে তোলা একটি ছবি পোস্ট করেছি।
কবিতাটিতে বেশি রিয়েক্ট পড়ার এটি একটি প্রধান কারণ। তবে এর আগেও এই কবিতায় পাঁচ শতাধিক রিয়েক্ট পড়েছিল।
এ ছাড়া আরো বেশ কিছু কবিতা, যেমন গাছ ও পাখি সিরিজের কবিতাগুলো পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লেখা কবিতাগুলোও মানুষ পছন্দ করেছে। অতি সম্প্রতি কবি আসাদ চৌধুরীর মৃত্যুসংবাদ পেয়ে একটি কবিতা লিখি, কবিতাটির শিরোনাম, “আসাদ ভাই, যাচ্ছেন?”, এটিও ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
তবে এইসব জনপ্রিয়তাকে এখনই জনপ্রিয়তা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। একটি কবিতা রচনার ৫০ বছর পরেও যদি পাঠক সেই কবিতা পড়ে তখনই কেবল বলা যাবে কবিতাটি জনপ্রিয় হয়েছে এবং দাঁড়িয়েছে।
Posted ৩:৪৪ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh