বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬ | ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

Weekly Bangladesh নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত

(পর্ব -২)

আমার বিচিত্র জীবন

কাজী জহিরুল ইসলাম :   |   বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আমার বিচিত্র জীবন

বিকেল হলেই কী এক অমোঘ টানে বিশ্বরোডে চলে যেতাম, সাখাওয়াত সাহেবকে ঘিরে তৈরি হওয়া ভিড়ের একজন হয়ে শুনতাম তার রাজনীতি বিষয়ক বক্তৃতা। দেশের ক্ষমতা-কেন্দ্রিক রাজনীতি কিছুটা বোঝার চেষ্টা করতাম, কিছুটা হয়ত বুঝেও ছিলাম। সাখাওয়াত নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ায় আমার রাজনীতি-জ্ঞান চর্চাই কি শুধু ব্যহত হলো? না, সবচেয়ে বড়ো ক্ষতি যেটা হলো তা হচ্ছে, আমি বন্ধুহীন হয়ে পড়লাম। সমবয়সীদের আমার কখনোই বন্ধু মনে হত না, আসলে আমি হয়ত শিশুকাল থেকেই বন্ধুর ছদ্মাবরণে একজন শিক্ষক খুঁজতাম, যার কাছ থেকে নতুন কিছু শেখা যায়। গৃহশিক্ষক শাহজাহান স্যার ছিলেন আমার শৈশবের প্রথম এবং প্রধান বন্ধু। এরপরে, বাড্ডায় এসে, পাই রুবেল স্যারকে। কিছুদিন আগে তিনি বিমানবাহিনীতে চাকরি পেয়ে চলে যান।

এখন আমি পুরোপুরি বন্ধুহীন। আজ খুব কুয়াশা পড়েছে। অনেক বেলা হয়েছে কিন্তু এখনও সূর্যের দেখা নেই। ঘন কুয়াশায় ঢেকে আছে আকাশ, আমার মনের আকাশও অন্ধকারাচ্ছন্ন। মিনিকেট চালের ভাত এবং চিংড়ি মাছ দিয়ে লাউ তরকারি রান্না করেছেন আম্মা। এই হলো আমাদের সকালের নাশতা। আব্বা সকালে ভাত খেতে পছন্দ করেন, আম্মা পছন্দ করেন রুটি। এই নিয়ে দুজনের চিরবৈরীতা দেখে দেখে আমরা বড়ো হয়েছি। আম্মা রুটি খেতে পছন্দ করলেও পুরো পরিবারের জন্য আব্বার পছন্দে ভাতই সকালের নাশতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। মাঝে মাঝে সকলের খাওয়া হয়ে গেলে আম্মা দুটো রুটি বানিয়ে বড়ো এক মগ চা নিয়ে একা একা খেতে বসেন। আমি পাশে বসে দেখি, কী এক স্বর্গীয় তৃপ্তি আম্মার চোখে-মুখে। এই দৃশ্যটি আমার বড়ো প্রিয় ছিল।
আজ স্কুলে যাইনি। আসলে স্কুলে যেতে আমার আর ভালোও লাগছে না।
অনেকগুলো নতুন কবিতা লিখেছি। রুবেল স্যার চলে যাওয়ায় সেইসব কবিতা কাউকে দেখাতেও পারছি না। কাজী নজরুল ইসলাম মেট্রিক পাশ করেননি, আমার পাশ করার কী দরকার, এই সর্বনেশে চিন্তাটা মাথার মধ্যে ঢুকে গেছে। আমি এখন মোটামুটি একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি, আমি যেহেতু কবিই হবো, কাজেই প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা করার আর কোনো দরকার নেই।

আমার সব কিছু ভালো লাগে, সব কিছু করতে ইচ্ছে করে, শুধু পাঠ্য বইয়ের পড়াটা একদমই ভালো লাগে না। মাঝে মাঝে কৃষক হতে ইচ্ছে করে, কারখানার শ্রমিক হলেও কোনো ক্ষতি নেই। এমন কী আমি মেথর, ঝাড়ুদারও হতে পারি, রিক্সা চালক হতে পারি, ক্ষতি কী? বরং এইসব পেশার কথা ভেবে খুব শিহরণ অনুভব করছি। অন্যরকম একটা জীবন হবে। পেশা যাই হোক, লেখাটাই হবে আমার মূল কাজ, সমস্ত জীবন ধরে নানান জায়গায় যাব শুধু লেখার রসদ সংগ্রহের জন্য। তবে স্কুল, পরীক্ষা এই শব্দগুলো খুব যন্ত্রণাদায়ক লাগছে, এগুলোকে জীবন থেকে মুছে ফেলতে পারলেই ভালো হয়।

আমাদের ক্লাসের ফার্স্ট বয় আলাউদ্দিন ভীষণ পড়ুয়া, ও আমার চেয়ে বয়সে কিছুটা বড়ো। পরিস্কার জামা কাপড় পরে স্কুলে আসে, তেল দিয়ে পরিপাটি করে মাথা আঁচড়ায়, সব সময় ফার্স্ট বেঞ্চে বসে। আলাউদ্দিন অঙ্কের লজিকগুলো বোঝে না। মাঝে মাঝে সে অংকেও সর্বোচ্চ নাম্বার পায়। কারণ বইয়ের সব অংক ওর মুখস্ত। কিন্তু সংখ্যাগুলো একটু ঘুরিয়ে দিলে বা লজিকটা বদলে দিলে ওর পক্ষে আর রেজাল্ট বের করা সম্ভব হয় না।

যেহেতু পরীক্ষায় হুবহু বই থেকেই অংকটা আসে, কাজেই ও পুরো নম্বরই পেয়ে যায়। আমার মনে হয় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড়ো ধরণের গণ্ডগোল আছে। আমি হলফ করে বলতে পারি আলাউদ্দিন অংকে আমার চেয়ে অন্তত দশ ধাপ নিচে কিন্তু প্রায়শই ও আমার চেয়ে বেশি নম্বর পায়। পরীক্ষা পদ্ধতির লক্ষ্য কী? মেধা যাচাই করে মেধাক্রম ঘোষণা করার উদ্দেশ্য কী, যদি সেরা ছাত্র তালিকার শীর্ষে না থাকে? আমাদের পরীক্ষা পদ্ধতি একদমই ঠিক নেই।

শুনেছি আলাউদ্দিন এখন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির মালিক হয়েছে, প্রচুর বিত্ত-বৈভব হয়েছে ওর, জীবনের অঙ্কটাও কি ও আগেভাগেই মুখস্ত করে নিয়েছিল?
সেকেন্ড বয় এনামুল। এনামুল সর্বার্থেই ভালো ছাত্র। অংকের মাথাও ভালো। পরীক্ষা, প্রতিষ্ঠা এইসব বাস্তব জ্ঞানও ওর ভালো, তবে আলাউদ্দিনের মতো মুখস্ত বিদ্যায় ততোটা পারদর্শী নয় বলে সব সময় দ্বিতীয় হয়।

এনামুলও সব সময় পরিপাটি পোশাক পরে স্কুলে আসে এবং ফার্স্ট বেঞ্চে বসে। ক্লাসের ভালো ছাত্র বলতে সবাই এই দু’জনকেই গোনে। আমি সব সময় তৃতীয় হলেও নাইনের বার্ষিক পরীক্ষায় কোত্থেকে কামরুজ্জামান এসে তৃতীয় হয়ে যায় এবং সেও তার সুবোধ আচরণের কারণে ভালো ছাত্রের খাতায় নাম লেখায়। আমি এখন ফোর্থ বয়। পোশাকের কোনো ঠিক নেই, মাথা তো কখনোই আঁচড়াই না। পরীক্ষার আগের রাতে ছাড়া কখনোই বই ধরি না। কালে-ভদ্রে ক্লাসের পড়াটা দিতে পারি। কখনোই ফার্স্ট বেঞ্চে বসি না। কিন্তু অংকের ক্লাসে সবাই আমার দিকেই তাকিয়ে থাকে, কারণ যে কোনো জটিল অংকের উত্তর আমার চেয়ে দ্রুত আর কেউ দিতে পারে না। তারপরেও আমাকে কেউ ভালো ছাত্র বলে না, আমার কথা কেউ মনেও রাখে না। এনামুল এখন অধ্যাপক, ক্যান্টনমেন্ট কলেজে পড়ায়। কামরুজ্জামান কোভিডের সময় মারা গেছে।

আমার কথা যে কেউ মনে রাখে না তার একটা প্রমাণ দেই। আমাদের সঙ্গে পড়ত শামীম বিন সালাম এবং শাহীন বিন সালাম। ওরা দুই ভাইই এখন আমেরিকায় থাকে। শাহীন বিজ্ঞান শাখায় পড়লেও শামীম আমার সঙ্গে বাণিজ্য শাখায়ই ছিল। কয়েক বছর আগে শামীমের সঙ্গে নিউইয়র্কে দেখা। দেখাটা হয় আমাদের আরেক সহপাঠী কাজী ফৌজিয়ার মাধ্যমে। আমি ওকে দেখেই চিনে ফেলি কিন্তু ও আমাকে চিনতে পারল না। আমি ক্লাসের কত খুঁটিনাটি ঘটনা বলে ওকে মনে করাবার চেষ্টা করলাম, ও কিছুতেই আমার কথা মনে করতে পারল না। শামীমের আব্বা সালাম সাহেব ছিলেন স্ট্যাম্প ভেন্ডর, স্বভাবতই তার কাছে পৃথিবীর সব দেশের ডাক টিকিট ছিল, শামীমের সংগ্রহেও নানান দেশের সুন্দর সুন্দর ডাক টিকিট ছিল। মাঝে-মধ্যে ও আমাকে ওর অপছন্দের কিংবা একাধিক আছে এমন স্ট্যাম্পগুলো দিয়ে দিত, সেইসব স্ট্যাম্পের দিকে তাকিয়ে আমি চলে যেতাম দূরের কোনো দেশে। শামীমকে এসব কথাও বলি। ও বলে, আমার কিছুই মনে পড়ছে না।

এখন স্কুলের বন্ধুদের অনেক সোশ্যাল মিডিয়া-গ্রুপ হয়েছে। এসএসসির ব্যাচ, এইচএসসির ব্যাচ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাচ আরো কতো কী। এইরকম আমাদেরও একটা এসএসসির ব্যাচ গ্রুপ আছে। একেবারে খুব সুনির্দিষ্ট করে আমাদের বাড্ডা আলাতুন নেসা হাই স্কুলের গ্রুপও আছে। আমার প্রায়ই মনে হয় সেই গ্রুপের বন্ধুরা কেউ আমার স্কুলের কোনো স্মৃতি মনে করতে পারেনি, আমার সেই সময়ের মুখশ্রীটিও ওদের কারো স্মৃতিতে নেই, শুধু সন, তারিখ, ব্যাচ জেনে আমাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছে।

আমি যখন ওদের মুখগুলো ফেইসবুকে দেখি চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ বছর আগের কত কত স্মৃতি ভেসে ওঠে কিন্তু আমার স্থির বিশ্বাস আমাকে দেখে ওদের কারোরই সেই রকম কোনো স্মৃতি মনে পড়ে না।

তবে শিক্ষকরা কিন্তু আমাকে চিনতেন। আমি স্কুল ছাড়ার পর আমার ছোটোবোন শাহনাজ স্কুলে ভর্তি হয়। কয়েক বছর পরে ছোটো ভাই বিটন। শাহনাজ বেরিয়ে গেলে আরেক ছোটো বোন বিউটি ভর্তি হয়, সবশেষে ছোটো ভাই লিমন। ওদেরকে প্রথম দিন স্কুলে দেখেই প্রধান শিক্ষক থেকে শুরু করে অন্যান্য সকল শিক্ষক চোখ বড়ো বড়ো করে প্রশ্ন করেছেন, তুমি জহিরের বোন? তুই জহিরের ভাই? এগুলো অবশ্য অনেক দিন আগের কথা। তখন শিক্ষকদের এইসব কথা ভাই-বোনদের কাছে শুনে খুব ভালো লাগত। আমার প্রিয় শিক্ষকদের অনেকেই এখন বেঁচে নেই। আমি যখন ভর্তি হই তখন আব্দুল খালেক সাহেব প্রধান শিক্ষক ছিলেন, এরপর তয়েবুর রহমান স্যার প্রথমে প্রধান শিক্ষক এবং পরে স্কুলটি কলেজ হলে প্রিন্সিপাল হন। দুজনই আজ প্রয়াত। প্রিয় শিক্ষকদের মধ্যে বাংলা পড়াতেন মান্নান স্যার, তিনিও বেঁচে নেই। রহিম স্যার অঙ্ক পড়াতেন, সম্ভবত তিনিও প্রয়াত।

শিক্ষকদের প্রিয় হওয়া আর বন্ধুদের প্রিয় হওয়া হয়ত সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। হয়ত আমার মধ্যে এমন কিছু ছিল যা শিক্ষকদের আকৃষ্ট করত কিন্তু বন্ধুদের আকৃষ্ট করত না। একটা বিষয় তো আমি জানিই, আমি বন্ধুদের সান্নিধ্য কখনোই পছন্দ করতাম না, সমবয়সীদের তখনও, এবং এখনও, মনে হয় অনেক দূরে ফেলে আসা পথ, সেই পথের প্রতিটি বাঁক আমার চেনা, ওখানে আর যাবো কেন? আমাকে যেতে হবে সামনে, বড়োরাই সামনের পথের খোঁজ দিতে পারেন। তাই বড়োদের সঙ্গই আমার আজন্ম প্রিয়।

Posted ১:৪০ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

Weekly Bangladesh |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

গল্প : দুই বোন

(9320 বার পঠিত)

মানব পাচার কেন

(1583 বার পঠিত)

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  
Dr. Mohammed Wazed A Khan, President & Editor
Anwar Hossain Manju, Advisor, Editorial Board
Corporate Office

86-47 164th Street, Suite#BH
Jamaica, New York 11432

Tel: 917-304-3912, 718-523-6299 Fax: 718-206-2579

E-mail: [email protected]

Web: weeklybangladeshusa.com

Facebook: fb/weeklybangladeshusa.com

Mohammed Dinaj Khan,
Vice President
Florida Office

1610 NW 3rd Street
Deerfield Beach, FL 33442

Jackson Heights Office

37-55, 72 Street, Jackson Heights, NY 11372, Tel: 718-255-1158

Published by News Bangladesh Inc.