কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশে গিয়েছিলাম ২০২৩ সালের অক্টোবরে ৩ সপ্তাহের জন্য। অনেক জায়গায় ঘুরেছি, অনেক মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত ও বিত্তহীন ভাসমান মানুষ, যারা কখনো এই দেশ এই পরিবেশের বাইরে যাননি, তারা জানেনও না যে তারা অতি নিম্নমানের একটি জীবন যাপন করছেন।
ঢাকা শহরের অপ্রতুল রাস্তায় বিচিত্র গতির মাত্রাতিরিক্ত যানবাহন কোনো রকম নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে চলাচল করে। শহরের কোথাও রাস্তা পার হওয়ার জন্য কোনো সেইফ জেব্রা ক্রসিং নেই। জেব্রা ক্রসিং আছে কিন্তু সেগুলো কখনোই পথচারির জন্য সম্পুর্ণ ফ্রি থাকে না। কিছু ফ্লাইওভার আছে, মানুষ ফ্লাইওভারে ওঠে না। বৃদ্ধ, শারিরীকভাবে অক্ষম মানুষ ফ্লাইওভারে উঠে রাস্তা পার হতে যেন পারে সেজন্য লিফটের কোনো ব্যবস্থা নেই।
ফুটপাতে হুইল চেয়ার ওঠার জন্য কোনো ডিসেবল এক্সেস নেই। আসলে হুইল চেয়ার এদেশে ধনীদের জন্য, তারা তো গাড়িতেই চড়ে। দরিদ্র পঙ্গু মানুষের চলাফেরা নিয়ে কে মাথা ঘামায়। মানুষ যত্রতত্র দিয়ে রাস্তা পার হয় এবং তারা রাস্তা পার হওয়ার সময় অদ্ভুত এক নৃত্য করতে থাকে। আমার কাছে এই দৃশ্যটি দেখে সব সময়ই মনে হয় মানুষগুলো সার্কাসের দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটছে, নিচে মৃত্যুকুপ, পড়ে গেলেই শেষ। দক্ষিণ বনশ্রীতে, আমার ছোটো বোন বিউটি যে বাড়িতে থাকে, সেই বাড়ির একজন অধিবাসী বিকেলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রেস্টুরেন্টে যাচ্ছিল চা খেতে। পেছন থেকে দ্রুত গতির মোটর সাইকেল এসে তাকে তুলে নিয়ে অনেক দূরে ছিটকে ফেলে দেয়।
লোকটি সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। অথচ এটি যে একটি মর্মান্তিক ঘটনা এইরকম কোনো উদ্বেগ উৎকণ্ঠা কারো মধ্যে নেই। সকলের ভাবটা এমন যাক বাবা আমার তো কিছু হয় নাই। ভিক্ষুক থেকে কোটিপতি, সাংবাদিক, আমলা, পুলিশের বড়ো কর্তা, শিক্ষাবিদ, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ সকলের মধ্যেই একটা অস্থিরতা। কেউ কিছু পাওয়ার জন্য অস্থির, কেউ কিছু হারাবার ভয়ে অস্থির। কেউ অযথাই অস্থির। মানুষের মানবিক গুণাবলীর যথেষ্ঠ অবনতি হয়েছে বলেই আমার মনে হয়েছে। নিজের কিছুটা ক্ষতি স্বীকার করে কেউ যে দুকদম হেঁটে গিয়ে অন্যের উপকার করবে, এমন কী একজন বয়স্ক মানুষকে দেখতে যাবে, সেই মানসিকতা অনেকের মধ্যেই নেই।
আমি অনেকের বাড়িতে গিয়েছি, অনেকেরই অনেক টাকা আছে, বাড়িতে দামী আসবাবপত্র আছে, নিজেদের এপার্টমেন্ট সাজিয়েছেন মনের মাধুরি মিশিয়ে কিন্তু খুব কম বাড়িতেই বইয়ের আলমারি বা বুকশেলফ দেখেছি। কে কত বড়ো তা প্রদর্শনের একটা মহড়া সর্বত্র পরিলক্ষিত, এবং এই বড়োর মানদণ্ড অর্থ, শুধুই অর্থ আর কিছু নয়।
এই মুহূর্তে যে শিশুটি ভূমিষ্ঠ হলো সে এক অমিত সম্ভাবনার নাম। সে যদি কোনো গণতান্ত্রিক দেশে জন্ম নেয় তাহলে সেই দেশের যে কোনো কিছুই সে হতে পারবে। বিজ্ঞানী, কবি, চিকিৎসক, নভোচারী, অধ্যাপক, বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর, রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, যে কোনো কিছু। এটা নির্ভর করছে তার যোগ্যতা, মেধা ও কর্মদক্ষতার ওপর।
কিন্তু শিশুটি যদি বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করে, সে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রধান বিচারপতি, সেনাপ্রধান, পুলিশপ্রধান এমন কী ঠুটো জগন্নাথ রাষ্ট্রপতিও হতে পারবে কিন্তু কিছুতেই দেশের সরকার প্রধান বা প্রধানমন্ত্রী হতে পারবে না। কারণ এই পদে আসীন হতে হলে শিশুটিকে অবশ্যই দুটি বিশেষ পরিবারে জন্ম নিতে হবে। এটি হচ্ছে আমাদের ব্যধিগ্রস্ত গণতন্ত্র।
দেখুন বাংলাদেশের মানুষ কতটা নতজানু, কতটা সহিষ্ণু, তারা শুধু এইটুকু অধিকার চায়, কোন পরিবার এদেশের সম্পদ লুট করবে, কোন পরিবারের নির্দেশে এদেশের পুলিশ আমাকে পেটাবে, অন্তত সেইটুকু ঠিক করার অধিকার আমাকে দিন। না, তারা সেই অধিকারটুকুও এদেশের মানুষকে দিতে চায় না। এই দেশে আজ যে শিশু জন্ম নিলো সে কী মাথা উঁচু করে, মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে শিখবে? বাংলাদেশের মানুষ কী রাজপথে হাঁটে না হামাগুড়ি দিয়ে চলে?
রাজপথে, টিভিতে নানান আলোচনা, গুঞ্জন, কী হবে, কী হবে? কিন্তু কেউ আসলে জানে না কী হবে। কী দূর্ভাগ্য এ-জাতির, এ-দেশের মানুষের। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পার করে এখনও গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করতে হয়, প্রাণ দিতে হয়। তাও একটি ব্যধিগ্রস্ত গণতন্ত্রের জন্য। প্রকৃত গণতন্ত্র কি এই দেশে কোনোদিনও আসবে?
লেখক : কবি, ভাষাশিল্পী।
Posted ১২:১৬ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh