কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২৫
আজ রোববার, জানুয়ারি মাসের ১২ তারিখ। প্রচণ্ড ঠাণ্ডার মধ্যে হঠাৎ এক ঝকঝকে রোদেলা দিন। একটা জিনিস আমি খুব লক্ষ করেছি, সাধারণত রোববারগুলো নিউইয়র্কে রোদেলা হয়। নামের প্রভাব, নাকি আমার যুক্তি খোঁজা? মানুষের মন কেবল হিসেব মেলাতে চায়।
গত ৪/৫ দিন ধরে হাওয়ার দানব আছড়ে পড়ছিল জানালা-দরজায়। এমনিতেই তাপমাত্রা ছিল হিমাঙ্কের বেশ নিচে, শৈত্যপ্রবাহের কারণে তা মাইনাস কুড়ি/পঁচিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস অব্দি পৌঁছে যায়। যারাই সুযোগটা নিতে পেরেছেন, উষ্ণ গৃহ ছেড়ে বেরোননি এ-ক’দিন, কোভিডের পরে তো ভার্চুয়ালি কাজ-কর্ম করার একটা সংস্কৃতি তৈরি হয়েই গেছে।
নাশতা সেরে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে কাচঘেরা সানরুমে ঢুকি। শৈত্যপ্রবাহের কারণে এই কদিন সানরুমে ঢোকাই হয়নি। তিনপাশে কাচঘেরা হবার কারণে শীতের সময় এ-ঘরটি বরং একটু বেশিই শীতল থাকে, যদিও বিশাল একটি বেইসবোর্ড সারাক্ষণই তাপ ছড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই দানবীয় শীতের সঙ্গে পেরে উঠছে কই।
সূর্যটা যেন লোভনীয় মাত্রার আলো এবং উত্তাপ ছড়াচ্ছিল সানরুমে। কাচের স্লাইডিং ডোর বাঁ দিকে সরিয়ে ঢুকতে ঢুকতে বলি, শীতের সকালে এ-যেন সোনা-ঝরা রোদ। এর চেয়ে বড়ো উপহার আর কী হতে পারে আজকের দিনে?
সঙ্গে সঙ্গে কথাটা লুফে নেয় মুক্তি,
চলো বেরিয়ে পড়ি।
কোথায় যাবে, পার্কে?
যেখানে গেলে রোদটা পুরোপুরি উপভোগ করা যায়। হাঁটতেও চাই। আজ জিমে যাওয়া বাদ দিই, পার্কেই চলো।
আমরা বেরুবার প্রস্তুতি নিই। গাড়িতে উঠে মুক্তিকে জিজ্ঞেস করি,
কোন পার্কে যাবে?
সারপ্রাইজ মি।
শহরের ভেতরে আমার খুব পছন্দের করোনা পার্ক। ওখানে গেলে একই সঙ্গে জাদুঘর, চিড়িয়াখানা, বিশ্বখ্যাত টেনিস স্টেডিয়াম সিটি ফিল্ড, যেখানে ইউএস ওপেন খেলা হয়, বিশাল একটি গ্লোব, যেটির নাম দেয়া হয়েছে ইউনিস্ফেয়ার, সহ বহু কিছু এক সঙ্গে পাওয়া যায়। তা ছাড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকেও পার্কটি অনন্য। পার্কের মাঝখানে একটি কৃত্রিম লেইক ছাড়াও পেছনের দিকে আছে প্রশস্ত ফ্লাশিং রিভার। ঘাটে বাঁধা নৌকা তো আছেই, নদীর ওপর হামাগুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকা কাশবন-ঝোপ আমাকে অন্যরকম আনন্দ দেয়।
বিশাল করোনা পার্কের ভেতরে ঘন্টাখানেক হাঁটলেও কোনো রাস্তায় দুবার যেতে হয় না। নদীর দিকে ছুটে চলা ওয়াক-ওয়েগুলোর দুপাশে বার্চ গাছের সারি। আমেরিকানরা যাকে বলে ট্রি-লাইন্ড স্ট্রিট। সেই গাছের নিচে পাতা আছে সুদৃশ্য কাঠের বেঞ্চ। আহা, কী যে শান্তি। দেখলেই ইচ্ছে হয় একটা বই নিয়ে বসে পড়ি।
কিন্তু মুক্তি নিমরাজী। কোনো এক অদ্ভুত কারণে এই অসাধারণ পার্কটি মুক্তি পছন্দ করে না। অবশ্য আমাদের হাতে যে পরিমান সময় আছে তা বিবেচনা করে ও বলে,
ঠিক আছে চলো।
মিনিট পনের ড্রাইভ করে গ্রান্ড সেন্ট্রাল পার্কওয়ে থেকে নাইন পি এক্সিট নিয়ে পার্কের রাস্তায় ঢুকে পড়ি। কিন্তু পাশের সীটে বসা মানুষটির মুখে আনন্দের কোনো দ্যুতি দেখছি না। পার্কিং লটে ঢোকার আগে মুক্তি আবারও বলে, যদিও কণ্ঠ তেমন জোরালো নয়,
জানি না কেন, এই পার্কটিতে এলে আমার কোনো আনন্দ হয় না। অথচ পার্ক আমার এতো পছন্দ।
আমি সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি ঘোরাই।
যেখানে গেলে তোমার আনন্দ হয় না, সেখানে কেন যাবো? চলো অন্য কোথাও।
গাড়ি তো ঘোরালাম, কিন্তু যাবো কোথায়?
গুগল ম্যাপে লিখলাম, পার্ক। সবার ওপরে ভেসে উঠল, গেন্ট্রি প্লাজা স্টেইট পার্ক। সময় লাগবে একুশ মিনিট। ব্যাস, ডেস্টিনেশনে চাপ দিয়ে এক্সেলেটর দাবালাম।
সারাপথ মুক্তি প্যানপ্যান করছিল।
জিপিএস তো ম্যানহাটনে নিয়ে যাচ্ছে, টোল দিয়ে এই অবেলায় ম্যানহাটনে যাওয়ার কোনো মানে হয়?
ভালো কথা, অনেকেই হয়ত এখনো টের পাননি, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে গাড়ি নিয়ে ম্যানহাটনে ঢুকলেই, গুনতে হচ্ছে ১৫ ডলার বাড়তি টোল।
আমি বলি, মানুষ কত কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে আনন্দ কেনে, এ-তো সামান্য ১৫ ডলার।
টোল বড়ো বিষয় না, বিষয় হলো পার্কিং। ম্যানহাটনে পার্কিং পাওয়া, রোববারেও, সোনার হরিণ পাওয়ার মত ঘটনা। তার চেয়েও বড়ো কথা, ম্যানহাটনের কোথায় সেই গেন্ট্রি পার্ক? বড়ো পার্ক বলতে তো সেন্ট্রাল পার্ক। আমরা যারপরনাই বিভ্রান্ত। শুধু পার্ক লেখা থাকলেও হত, লেখা আছে গেন্ট্রি প্লাজা স্টেইট পার্ক। সাধারণত স্টেইট পার্কগুলো খুব বড়ো হয় এবং বিশেষ কোনো একটি প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য থাকেই। যেমন: নদী, সমুদ্র, পাহাড়, লেইক, ঘন অরণ্য, হাইকিং ট্রেইল ইত্যাদি।
এই রাস্তা সেই রাস্তা ঘুরিয়ে জিপিএস যখন দেখাচ্ছে আর মাত্র আধামাইলের মধ্যেই সেই স্টেইট পার্ক, অথচ আমরা তখনও দালানের সারি আর কাড়ি কাড়ি গাড়ির ভিড়ের মধ্যে পড়ে যুদ্ধ করছি, তখন আমাদের বিভ্রান্তি চরমে।
মুক্তিকে বলি, ধরো আমরা আজ ভালো কোনো পার্ক খুজে পেলাম না। এই যে দুজন চমৎকার রৌদ্রকরোজ্জ্বল শীতের দুপুরে নিউইয়র্ক শহরে একসঙ্গে ড্রাইভ করছি, গাড়ির স্পিকারে জগজিৎ সিং গাইছেন: “ইয়ে দৌলত ভি লে লো/ ইয়ে শোহরত ভি লে লো/ ভালে ছিন লো মুজসে মেরি জওয়ানি/ মাগার মুঝকো লোটা দো বাচপান কি সাওন/ ও কাগজ কি কাশতি/ ও বারিষ কা পানি…” এইটুকুই কী অনেক বড়ো প্রাপ্তি নয়?
বুঝতে পারি মুক্তি নিজেও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছে। মুখে কিছু বলছে না যদিও কিন্তু আমি জানি সে তার এক্সপেকটেশনের পারদ অনেক নামিয়ে এনেছে কিংবা প্রাপ্তির, আনন্দের অর্থটা এখন ওর কাছে অন্যরকমভাবে ধরা দিয়েছে। আমি ওর চোখ দেখেই তা বুঝতে পারছি, মুখে কিছু বলার দরকার নেই। এই যে বেশ কিছুক্ষণ ট্রাফিক জ্যামে বসে আছি, ওর মুখে সামান্যতম বিরক্তি তো নেইই বরং সে কসোভোর পাহাড়ে পাহাড়ে ছুটে বেড়ানো আমাদের সেই স্বর্ণালী দিনগুলোর স্মৃতি রোমন্থন করতে শুরু করে দিল। মানুষ যখন তার প্রিয় কোনো বর্তমানে পৌঁছায় তখনই অতীতের সুন্দর স্মৃতিগুলো লাফ দিয়ে বেরিয়ে আসে।
জিপিএসের নির্দেশ মত শহরের কোলাহলের ভেতরেই এক অদ্ভুত সুন্দর নির্জনতায় এসে পৌঁছুলাম। ও মাই গড। এ-তো স্বর্গ! কী অপূর্ব দৃশ্য। ইস্ট নদীর তীর ধরে লম্বালম্বি তৈরি করা হয়েছে ১২ একরের এক সুপরিকল্পিত পার্ক। একেই বলে ওয়েসিস। কোলাহলে পূর্ণ নগরের ভেতরে শান্তির নিঃশ্বাস ফেলার এক অভূতপূর্ব সুযোগ। নদীর তির ধরে ছুটে চলা কাঠের বোর্ড-ওয়াক, মাঝে মাঝেই টেনে তা নিয়ে যাওয়া হয়েছে নদীর ভেতরে। কোথাও কোথাও উঁচু বোর্ড-ওয়াক থেকে নেমে গেছে নদীর জল ঘেঁষে ছোট্ট একটি পায়ে হাঁটার রাস্তা। দূর থেকে দেখলে ঠিক মেঠোরাস্তা বলে মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে ওটাও, খুব সরু যদিও, পেইভমেন্টেরি রাস্তা।
পার্কিং পাওয়া এখানেই কম ঝক্কি-ঝামেলার নয়, জায়গাটা কুইন্সে হলেও মাঝখানে তো মাত্র ছোট্ট একটা নদী, পেরুলেই ম্যানহাটন। দেখতে দেখতে গত এক দশকের মধ্যে এখানে, এই লং আইল্যান্ড সিটিতে, নদীর দিকে মুখ করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য আকাশ-ছোঁয়া অট্টলিকা।
কপাল ভালো আমাদের। একটি ছোট্ট ডেড-এন্ডে পার্কিং পেয়ে গেলাম। ড্রাইভিং টেস্ট দেবার মত অবস্থা, যখন গাড়িটা ঠিক মত পার্ক করলাম, মুক্তির মুখে বিজয়ের, স্বস্তির এবং পরিতৃপ্তির হাসি। গাড়ি থেকে বের হতেই শৈত্যপ্রবাহটা কানের মধ্যে এসে লাগলো। ভাগ্যিস গাড়িতেই দুজনের টুপি এবং মাফলার ছিল। বাতাশকে উপেক্ষা করে আমরা জানুয়ারির রোদ পোহাতে উঠে আসি বোর্ড ওয়াকে। মুক্তি আঙুল তুলে বলে, আরে, ওই তো আমাদের অফিস। ঠিক তাই, যে জায়গাটিতে আমরা এখন দাঁড়িয়ে আছি, নদীর ঠিক ওপাড়েই, আমাদের মুখোমুখি জাতিসংঘ সদর দফতরের সেই বিখ্যাত ম্যাচবাক্স আকৃতির দালানটি দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকটা বিল্ডিংয়ের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে অ্যাম্পায়ার স্টেইট বিল্ডিংয়ের চূড়ো। ভালো কথা, আপনারা জানেন তো, নিউইয়র্ক স্টেইটের একটি ডাকনাম আছে, সেটি হচ্ছে দ্য অ্যাম্পায়ার স্টেইট?
ডান দিকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শহর ম্যানহাটনের সিনিক বিউটি, বাঁ দিকে নতুন গড়ে ওঠা, গডজিলার মতো মাথা তুলে দাঁড়ানো লং আইল্যান্ড সিটি, মাঝখানে দূর বাংলাদেশ থেকে স্বপ্নের ঝাঁপি কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়া দুই পর্যটক, হেঁটে যাচ্ছে ছোঁবে বলে উড়ন্ত সী-গালের ডানা। হাঁটতে হাঁটতে মুক্তির খুব কাছে গিয়ে বলি, আর ইউ সারপ্রাইজড? পরিতৃপ্তির একটি হাসি ছড়িয়ে ও বলে, টোটালি।
এবার আমার ক্রেডিট নেবার পালা। আসলে পুরো বিষয়টাই ছিল পরিকল্পিত। তোমাকে দ্বিগুণ সারপ্রাইজ দেবো বলেই, প্রথমে করোনা পার্কে নিয়ে যাই হতাশা তৈরি করতে।
হলিসউড, নিউইয়র্ক। ১২ জানুয়ারি ২০২৫
Posted ২:১১ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh