কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫
২০২৩ সালের অক্টোবর মাসের একটি ঘটনা বলি। রাত পৌনে আটটা বাজে। আমার সঙ্গে গাড়ি নেই। আসলে আমি ইচ্ছে করেই আজ গাড়ি নিইনি। চাইছিলাম রিক্সায় চড়ে সেই পুরনো দিনগুলোতে ফিরে যেতে। মেরুল বৌদ্ধ মন্দির থেকে হেঁটে হেঁটে রামপুরা ব্রিজের কাছে এসে একটি রিক্সা নেই। এখন প্রায় সব রিক্সায়ই মোটর লাগানো। প্যাডেল মেরে চালাতে হয় না। বৈদ্যুতিক মোটরে রিক্সা চলে কিন্তু থামানোর জন্য ম্যানুয়াল পদ্ধতির ব্রেকই চেপে ধরে। ফলে এই রিক্সাগুলো আমার কাছে অধিক ঝুকিপূর্ণ মনে হয়।
ই ব্লকে কে যাবেন? বলতেই কয়েকজন হাত উঁচু করে ডাকতে শুরু করল। আমি একজনের দিকে তাকিয়ে বলি, আপনার রিক্সায় কি ইঞ্জিন আছে? রিক্সাচালক আমার কণ্ঠের এবং দেহের অভিব্যক্তি পড়েই বুঝে ফেলেছে আমি ইঞ্জিনচালিত রিক্সা চাইছি না। অন্য একজন তার রিক্সাটা টান দিয়ে আমার পায়ের কাছে এনে বলে, আমারটায় ইঞ্জিন নাই, ওঠেন।
বনশ্রীর ই-ব্লকে নেমে বলি, ভাড়া কত? ও বলে, দেন চল্লিশ/পঞ্চাশ যা দেবেন। আমি ৫০ টাকা ওর হাতে তুলে দেই। রিক্সাচালকের নাম মুদাব্বিরুল ইসলাম। বাড়ি নীলফামারী। বয়স ত্রিশ। মুদাব্বির বলে, ভালোই দেছেন, আলহামদুলিল্লাহ। এই কাজ বড়ো কষ্টের, আর পারি না। আমি লোহার গেইটের ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে ঢুকি না, ফিরে তাকাই। বলি, কতক্ষণ ধরে চালাচ্ছেন?
সকাল আটটায় বেরোইছি।
এতক্ষণ?
কী করবো মামা, বাচ্চা দুটোকে দুই বচ্ছর হলো ইলিশ মাছ খাওয়াবো বলে আসতেছি, আজও খাওয়াতে পারিনি।
আমি চোখের জল গোপন করে ওয়ালেটে হাত দিই। কিছু টাকা ওর হাতে তুলে দিয়ে বলি, বাকিটা ভরে আজই ইলিশ মাছ কিনবেন।
ওরা তো বাড়িতে। আমি পনের দিন রিক্সা চালাই, তারপর বাড়ি যাই। সামনের রোববারে যাবো।
এখানে একা থাকতে কত খরচ হয়? ঘর ভাড়া কত?
ঘর ভাড়া লাগে না মামা। রিক্সার জন্য জমা দিই ১২০ টাকা, খাওয়ার জন্য আড়াই’শ। এইই খরচ।
তাহলে ঘুমান কোথায়?
রিক্সার গ্যারেজেই, একটা খোপের মদ্যি রিক্সা রাখি, তার ওপরে তক্তা পাতা, সেই তক্তার ওপরে ঘুমাই।
বালিশ, তোষক?
এইসব কিচ্ছু নেই। সারা গা ব্যাথা হয়ে যায়।
বলেন কি?
মাত্র ১৫ দিনেরই তো ব্যাপার। কষ্ট করে কিছু পয়সা জমাই, যাতে বাচ্চাগুলার পাতে খাবার তুলে দিতে পারি।
কত হয় সারা দিনে?
হাজার খানিক হয়।অন্য আর কোনো কাজ পেলেন না?
এক আত্মীয় একটা কাজ জোগাড় করে দিয়েছিল, ইউনিয়ন কাউন্সিলে। ক’বছর করিছি। বেতন দেবার পারে না, তাই ছেড়ে দিয়েছি।
বাচ্চারা স্কুলে যায়?
যায় মামা। দোয়া করবেন ওদের জীবনডা জানি আমার মতন না হয়।
দোয়া করছি। আপনি নিজেও চেষ্টা করবেন ওদের লেখাপড়া যেন বন্ধ না হয়। আমি কি আপনার একটা ছবি তুলতে পারি? আমার এই প্রশ্ন শুনে মুদাব্বির বেশ একটা পোজ দিয়ে সিটের ওপর বসলো।
লিফটে চড়ে ছ’তলায় উঠছি আর বারবার মনে মনে বলছি, আল্লাহ, মুদাব্বিরের ছেলে-মেয়ে দুটি যেন খুব শিগগিরই ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত খেতে পারে।কাকতালীয় ব্যাপার কি জানেন, আজ বিকেলে আম্মাকে বলেছি, বাসায় কি ইলিশ মাছ আছে? আগামীকাল ইলিশ মাছ ভাজা খাব। আম্মা বলেন, আমি আজ রাতেই তোমার জন্য ইলিশ মাছ ভাজবো।
ঘরে ঢুকেই ইলিশ মাছ ভাজার সুঘ্রাণ পাচ্ছি। আমি জানি না এই ইলিশ মাছ আমি কীভাবে খাব। ঠিক এই মুহূর্তে, যখন আমি দরোজা বন্ধ করে এই পোস্ট লিখছি, কেউ যদি আমাকে দেখত, একটা বুড়ো লোক কেন অকারণে কাঁদছে তা ভেবে অবাক হত নিশ্চয়ই।
Posted ১০:১৭ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh