চৌধুরী মোহাম্মদ কাজল : | বৃহস্পতিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
শেখ হাসিনাকে কেন দেশ ছেড়ে পালাতে হল। তিনিতো ২০০১ সালেও নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিলেন। তারপর বিরোধী দলীয় নেত্রীর ভূমিকা পালন করেছেন। এবার কেন তাকে ভারতে গিয়ে নরেন্দ্র মোদীর আশ্রয়ে হয়ে থাকতে হচ্ছে। বাংলাদেশে টুপ করে ঢুকে পড়ার সুযোগ খুজছেন কিন্তু পারছেন না। এর কারনটা কি? যখন ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর বিতর্কিত বিচারে জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার ফাসি কার্যকর হয়েছিল তখনই তিনি নিজের পায়ে কুড়ালটি মারেন। প্রতিহিংসার রাজনীতি তখন তিনি এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যে ক্ষমতা ছাড়ার পর তার পক্ষে (এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের) আর রাজনীতি করা তো দূরের কথা দেশে থাকাও সম্ভব হবে না।
ভারতের প্ররোচনায় নিজস্ব বিচার বুদ্ধি হারিয়ে তিনি জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে ওঠে পড়ে লেগেছিলেন। ভারত তাকে দিয়ে কাজগুলি করিয়েছে তাকে ফাদে ফেলার জন্য। তাকে একটি লিস্ট ধরিয়ে বলে দিয়েছিল এদেরকে শেষ করতে হবে। এভাবে তারা শেখ হাস্নিাকে একেবারে হাতের মুঠোয় নিয়ে নিয়েছিল।
মীর জাফর যেমন রবার্ট ক্লাইভের হাতের পুতুল হয়ে ওঠেছিল শেখ হাসিনাও তেমনি ক্ষমতার জন্য পুরোপুরি ভারত নির্ভার হয়ে পড়েন। এটা ছিল শেখ হাসিনাকে গনবিচ্ছিন্ন করার একটি ভারতীয় কৌশল, কিন্তু এই অর্ধ শিক্ষিত মহিলা এটা বুঝতে পারেননি। ভারত কখনোই শেখ হাসিনার বন্ধু ছিল না। কিন্তু তাহলে এখন যে তারা শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে? এটা হচ্ছে ভারতের ভবিষ্যত দালাল যারা পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাস্ট্র ক্ষমতায় আসবে তাদেরকে আশ্বস্ত করার জন্য যে দেখ ভারত কিন্তু দুঃসময়ে দালালদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় না। তোমরা নিঃসন্দেহে ভারতের দালালী করতে পার বিপদে আপদে আমরা আছি তোমাদের পাশে।
শেখ হাসিনা কখন যে ভারতের ফাদে আটকা পড়েছিলেন নিজেই বুঝতে পারেননি। জাতিকে কলঙ্ক মুক্ত করার নামে ট্রাইবুনালে কলঙ্কিত বিচারকদের দিয়ে জামায়াত ও বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে একের পর এক রায় বের করে নিয়েছেন। দেশে তখন চলছিল ফাসির মহোৎসব। যারা বোঝার তারা তখনই বুঝে গিয়েছিল যে এই মহিলার পক্ষে আর দেশে থেকে বিরোধী দলীয় রাজনীতি করা সম্ভব নয়। তিনি যেভাবে বিরোধীদের দমন করেছেন ক্ষমতায় না থাকলে তার ও তার দলের লোকদের দেশে থাকাটাই অসম্ভব হয়ে পড়বে। আর এখন এটাই হচ্ছে। তিনিতো ভারতে গিয়ে নিজের জান বাচিয়েছেন। তার চাটুকাররা ধরা পড়ে এখন নাকানি চুবানি খাচ্ছে।
বর্তমানে যারা রাস্ট্র ক্ষমতায় আছে তাদেরও বুঝতে হবে ক্ষমতা কখনও চিরস্থায়ী হয় না। যে কোন সময় পট পরিবর্তন হতে পারে। এভাবে যদি প্রতিহিংসার রাজনীতি চলতে থাকে তাহলে বাচতে পারবে না কেউই।
বর্তমান সরকারকে অনেকে বলছেন বিপ্লবী সরকার। এটা বিপ্লবী সরকার হবে কেন? দেশে কি বিপ্লব হয়েছিল? ওটা ছিল একটি কোটা বিরোধী আন্দোলন। ছ্ত্রারা তাদের চাকুরী পাওয়ার পথটা আরেকটু সুগম করার জন্য আন্দোলন শুরু করেছিল। তারপর এতে সাধারন জনগন যুক্ত হওয়ার পর আকষ্মিকভাবে ঘটনার মোড় ঘুরে যায়। আন্দোলনকারী ছাত্রদের যাদের অনেকেরই লক্ষ্য ছিল একটি সরকারী অফিসের কেরানী হওয়া বা বড় জোড় আমলা হওয়া, আন্দোলনের আকষ্মিক সাফল্যে সরকারের পতন হওয়ার পর তারা বুঝতে পারছিল না কি করতে হবে। তারা তখন রাস্ট্র ক্ষমতা মুহাম্মদ ইউনুস, আসফ নজরুলদের হাতে তুল দেয়। প্রকৃত বিপ্লবীদের বাইরে থেকে নেতা হায়ার করতে হয় না। তাদের নিজস্ব চিন্তা, চেতনা ও দর্শন থাকে।
নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা থাকে। বিপ্লব সফল হলে তারা নিজেরাই দেশের নেতৃত্ব নেয় এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করে থাকে। বর্তমানে আমরা যেসব ছাত্রনেতাদের ফ্রন্টলাইনে দেখছি তারা কেউ বিপ্লবী নয়। যারা পিনাকী ভট্টাচার্য্য ও ইলিয়াসের ভিডিও দেখে নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা নির্ধারন করে তারা বিপ্লবী হতে পারেনা। তারা ক্ষমতা পেয়ে মনে করছে এই ক্ষমতা চিরস্থায়ী। তারা যেভাবে প্রতিহিংসা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে এর মাধ্যমে তারা শুধু আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনকেই তরাহ্নিত করবে। তারা মনে করছে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা হচ্ছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এ দুটি দলকে কখনও নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব না। পচাত্তরের পর মনে হয়েছিল আওয়ামী লীগ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু পুনরায় ক্ষমতায় আসতে তাদের লেগেছিল ২১ বছর। এখন যেভাবে চলছে তাতে মনে হয় এবার ২১ বছরও লাগবে না। তারও আগে আওয়ামী লীগ ফিরে আসতে পারে। পচাত্তরের পর আওয়ামী লীগের দুঃশাসন ভুলতে জনগনের সময় মাত্র কয়েক বছর লেগেছিল। একটা কথা আছে পিপলস মেমোরী ইজ ভেরী শর্ট। জনগন একটি বিষয় বেশীদিন মনে রাখতে পারে না। এভাবে যদি প্রতিহিংসার রাজনীতি চলতে থাকে তাহলে জনগন অচিরেই শেখ হাসিনার দুঃশাসনের কথা ভুলে যাবে ও আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠবে। যদি আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আবারও রাস্ট্র ক্ষমতায় ফিরে আসে সেটা হবে আরও বেশী প্রতিহিংসা পরায়ন এবং দেশের জন্য আরও বেশী ক্ষতিকর। মনে রাখতে হবে আমরা একটি শত্রুরাস্ট্র দ্বারা পরিবেষ্টিত। ওরা সামান্যতম সুযোগটাও কাজে লাগাতে চাইবে। তাই আমাদের বর্তমান নেতৃত্বকে প্রতিহিংসা পরিহার করে বিচক্ষনতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। তাদের অন্যতম প্রধান কাজ হচ্ছে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।
দেশকে দুর্নীতমুক্ত করতে না পারল আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। আইন কখনোই নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া যাবে না। দেশ গড়তে হলে প্রয়োজন সহনশীলতা। প্রতিহিংসা ধ্বংস ডেকে আনে। অহিংস আন্দোলন করেছিলেন মোহনদাস গান্ধী। তার আদর্শে ভারত হয়ে ওঠেছিল তৃতীয় বিশ্বের অন্যতম গনতান্ত্রিক রাস্ট্রের চমৎকার একটি উদাহরন। বর্তমানে নরেন্দ্র মোদীর প্রতিহিংসার রাজনীতি ভারতকে একটি সাম্প্রদায়িক জঙ্গী রাস্ট্রে পরিণত করেছে। আমরা নেলসন ম্যান্ডেলার কথা জানি। জীবনের অনেকটা সময় কারাগারে কাটিয়ে যখন দেশের রাস্ট্রপতি হয়েছিলেন তিনি তখন প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে ওঠেনি। দক্ষিন আফ্রিকা এখন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী গনতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক সমৃদ্ধশালী রাস্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠেছে। আমরাদের রাজনীতিবিদদেরও বুঝতে হবে দলের ও রাস্ট্রের উন্নতি চাইলে প্রতিশোধ পরায়ন হওয়া যাবে না। তাহলে প্রতিশোধ ও পাল্টা প্রতিশোধ -এভাবেই চলেতে থাকবে বছরের পর বছর। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ব্যবহার করে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। তা নাহলে নিজেরাই নিজেদের পতন ডেকে নিয়ে আসবে। তখন তাদের পরিণতি শেখ হাসিনার মতই ভয়াবহ।
Posted ১:০৯ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh