কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত উপ-উপাচার্য এবং কোষাধ্যক্ষকে ছাত্ররা শপথ পাঠ করিয়েছেন। এ-নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। তসলিমা নাসরিনসহ আমার অনেক ফেইসবুক বন্ধু তাদের ওয়ালে সমালোচনা করে পোস্ট দিয়েছেন। সকলেই এই ঘটনার নিন্দা করেছেন। সমালোচনা-ঝড়ে ছাত্ররাও উড়ে গেছেন। তারা শিক্ষকদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন, জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। শপথের অর্থ কী? কেন আমরা শপথ করি? শপথ হচ্ছে একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিজ্ঞা। আনুষ্ঠানিক এ-কারণে যে আমি বহু মানুষের সামনে প্রতিজ্ঞাটা করলে তা সহজে ভঙ্গ করতে পারবো না, একটা সামাজিক এবং নৈতিক দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক শপথের ক্ষেত্রে আইনগত বাধ্যবাধকতাও আছে।শিক্ষকেরা ছাত্রদের নৈতিকতা শেখাবেন, এটিই স্বাভাবিক কিন্তু যখন ছাত্ররা শিক্ষকদের নৈতিকতার শপথ পড়ান তখন আমাদের কাছে তা অস্বাভাবিক লাগে, আমরা তা মেনে নিতে পারি না।
আমরা যদি একটু পেছনে ফিরে তাকাই তাহলে দেখবো একজন শিক্ষক, যিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়ার পরে বলেছিলেন, আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য না করে যদি যুবলীগের সভাপতি করা হত বেশি খুশি হতাম। নৈতিকতার দিক থেকে চরমভাবে স্খলিত একটি সংগঠনের সভাপতি হতে চান একজন শিক্ষক। ১৫/১৬ বছর সময়কালে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের লোভ এবং দুর্নীতির ঘোলাজলে ডুবে দেশের সকল প্রতিষ্ঠান, সকল পেশা নোংরা হয়েছে, অস্বচ্ছ হয়েছে এবং অনৈতিকতার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছে। সাংবাদিক সমাজকে তারা তৈরি করেছিল গোয়েবলস ক্লাব বা চাটুকারিতার রঙে সাজানো সরকার-প্রধানের বিনোদন সংঘ। দেশের আইন, বিচার হয়ে উঠেছিল প্রহসনের এক চরম পরিহাস। পুলিশ বিভাগ হয়ে উঠেছিল গণমানুষের প্রধান দুশমন। দেশের রাষ্ট্রীয় সেবাপ্রদানকারী প্রতিটি বিভাগের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বেঁধেছিল দুর্নীতি।
রাষ্ট্রের আইনসভা বা জাতীয় সংসদ ছিল সম্পুর্ণ অবৈধ এবং সেই অবৈধ সংসদকে তারা ব্যবহার করত নিজেদের সকল অপকর্মকে বৈধতা দেবার জন্য, এর চেয়ে ভয়ানক তামাশা একটি জাতির জন্য আর হতেই পারে না। ঠিক এই রকম একটি সময়ে সকল রাজনৈতিক দলকে প্রত্যাখ্যান করে দেশের তরুণ সমাজ, যাদের বড়ো অংশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার জন্য দুর্বার এক আন্দোলনের ডাক দিল। সেই ডাকে সাড়া দিয়েছে দেশের আপামর জনসাধারণ।
তারা সফল হয়েছে। ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধান পালিয়েছে, তার দোসরদেরও অধিকাংশ পালিয়েছে, অনেকে পালাতে গিয়ে ধরা পড়েছে, অনেকে এখনো দেশের ভেতরে আত্মগোপনে আছে। অব্যবহিত বিপ্লবোত্তরকালে দেশ এক ভয়াবহ বন্যাকবলিত হয়। দেশ-বিদেশে অবস্থানরত মানুষ বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াবার জন্য ছুটে যায় টিএসসিতে, ছাত্রদের হাতে তুলে দেয় ত্রাণের অর্থ। নারীরা তাদের সবচেয়ে প্রিয় সোনার গহনা টিএসসিতে ছাত্রদের হাতে তুলে দেয়। ছাত্ররা এদেশের মানুষের অকুণ্ঠ বিশ্বাস অর্জন করেছে। জাতির ভালোবাসার তীর্থ হয়ে উঠেছে টিএসসি।
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রকৃতিই হচ্ছে প্রসারণ এবং সঙ্কোচন। সকল প্রসারণই একসময় স্থির হয় এবং এরপর সঙ্কুচিত হতে থাকে। ছাত্র-জনতার বিপ্লবের উত্তাপও সঙ্কোচণের সূত্র অনুসরণ করে প্রশমিত হয়েছে। তাদের প্রতি মানুষের ভালোবাসা এখনও আছে, তবে প্রত্যাশার পারদ এতো উঁচুতে তা ঠিক মত সামাল দিতে না পারলে ভালোবাসা ঘৃণায় পরিণত হতেও বেশি সময় লাগবে না। ভালোবাসার এই জোয়ার বা আবেগের শক্তিকে ঠিকমত কাজে লাগাতে পারলে নষ্ট হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রকে আমরা মেরামত করতে পারবো। রাষ্ট্র মেরামতের এমন অভিনব সুযোগ এই জাতি আগে আর কখনো পায়নি।
কাজেই এই কর্মযজ্ঞের একটি সুপরিকল্পিত কর্মকৌশল ঠিক করে নিতে না পারলে ভুল করার সম্ভাবনা আছে। এবার যদি আমরা ব্যর্থ হই তাহলে এই জাতিকে এই রকম আরেকটি সুযোগ পাবার জন্য হয়ত অপেক্ষা করতে হবে আরো ১০০ বছর।
কর্মকৌশলের শুরুতেই ঠিক করে নিতে হবে একটি গাইডিং প্রিন্সিপাল বা চালিকা নীতি। আমরা যখন আন্দোলন করছিলাম এবং আন্দোলনে সফল হবার অব্যবহিত পরে আমাদের চালিকা নীতি ছিল রাষ্ট্র সংস্কার। এখন রাষ্ট্র সংস্কার আমাদের প্রতিদিনের কাজ। এই কাজ করারও একটা চালিকা নীতি থাকা দরকার। হতে পারে সেটি ড. ইউনূসের তিন শূন্য, এর সঙ্গে বাংলাদেশ শব্দটি যোগ করে আমাদের আমাদের চালিকা নীতি ঠিক করে নিতে পারি, “তিন শূন্যের বাংলাদেশ”। কর্মযজ্ঞের প্রতিটি ধাপে আমাদের এই চালিকা নীতিটি মাথায় রাখতে হবে। ১. আমরা বাংলাদেশকে বেকারত্ব মুক্ত করবো, ২. কয়েকজনের হাতে বা কয়েকটি গোষ্ঠী/কোম্পানির হাতে অধিকাংশ সম্পদ পুঞ্জিভূত হতে দেব না অর্থাৎ সম্পদের সুষম বন্টন ব্যবস্থা নিশ্চিত করে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করবো ৩. কার্বন এমিশন শূন্যে বা শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে এনে প্রাকৃতিক পরিবেশ কলুষমুক্ত করবো, প্রকৃতিকে নির্মল রাখবো। দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ নির্মল করা ও রাখার যাবতীয় কাজ এই অংশে রাখা যেতে পারে।
চালিকা নীতি অন্য কিছুও হতে পারে। যে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন আমরা মানুষকে দেখিয়েছি, যে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা বলেছি, যে বাক স্বাধীনতার কথা বলেছি সেই আলোকেই গাইডিং প্রিন্সিপাল ঠিক করে নিতে হবে। এবার আসি শুরুর কথায়। গাইডিং প্রিন্সিপাল ঠিক হয়ে গেলে, সেই আলোকে বিপ্লবের চেতনাকে সর্বক্ষণ ধারণ করার জন্য একটি কার্যকর শপথ রচনা করতে হবে। ছোটো কিন্তু জুলাই বিপ্লবের চেতনায় পূর্ণ উদ্ভাসিত। সরকারীভাবে এই শপথকে জুলাই বিপ্লবের শপথ হিসেবে অনুমোদন দিতে হবে। প্রশাসনের সকলকে, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্র-শিক্ষককে এই শপথ পাঠ করতে হবে। যাতে তারা তাদের কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাক্ষেত্রে সর্বক্ষণ এই শপথের মধ্যে অবস্থান করেন। ছাত্ররা যদি এলোমেলোভাবে শিক্ষকদের বা অন্য যে কাউকে তাদের ইচ্ছেমত শপথ পাঠ করায় তা বিপ্লবের চেতনাকে এক বিশৃঙ্খলায় পর্যবসিত করবে। তবে বিপ্লবের শপথ নিয়েই নতুন প্রশাসনের সর্বনিম্ন কর্মচারী থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি পর্যন্ত, সকলকে কাজে বসতে হবে। এভাবেই বিল্পবের চেতনায় একটি নতুন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটবে। বিপ্লবের একটি সুনির্দিষ্ট শপথ থাকা অত্যাবশ্যক।
হলিসউড, নিউইয়র্ক। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪
Posted ৩:২০ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh