কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ২৯ মে ২০২৫
জুলাই বিপ্লব আমাদের প্রত্যাশার পারদ অনেক উঁচুতে তুলে দিয়েছিল। জাতিকে এই স্বপ্ন যারা দেখিয়েছিলেন কিছুদিনের মধ্যেই তারা স্বপ্নের কক্ষপথ থেকে ছিটকে গেছেন, ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায়। যারা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা বলেছিলেন তারাই এখন পুরনো বন্দোবস্তের ভেতরে ঢুকে গতানুগতিক উপায়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার রাস্তা খুঁজছেন। এইসব দেখে এদেশের স্বপ্নচারী মানুষ ভীষণ হতাশ। অনেকেই একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলছেন, ‘এই দেশের আর কিছু হবে না।’
জুলাই বিপ্লব কি তাহলে সত্যিই ব্যর্থ হলো? প্রসঙ্গটি উঠেছিল রোববার আমাদের ঊনবাঙালের অরণ্যসভায়। দেশ নিয়ে বেশ ভাবেন ইমাম চৌধুরী, এক সময় কলেজে পড়াতেন, কোয়ান্টাম গ্রাজুয়েট এবং কোয়ান্টাম-শিক্ষক।
কোয়ান্টামের একটা দারুণ ভিশন আছে, তারা চরিত্রবান, সৎ মানুষ গড়ে তুলতে চান, এই সৎ মানুষেরা একটা নৈতিক বাংলাদেশ গড়ে তুলবে এই স্বপ্ন তারা দেখেন। ইমাম চৌধুরী এইসব কথা আমাকে বহুবার বলেছেন। আমি ঠিক জানি না কোয়ান্টামের সকল সদস্যই দেশ নিয়ে এতোটা ভাবেন কি-না কিন্তু ইমাম চৌধুরী ভাবেন, বলা যায় দেশের প্রতিটি ঘটনার প্রতিই তার সচেতন দৃষ্টি নিবদ্ধ। তিনিও হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, জুলাই বিপ্লবের একটাই প্রাপ্তি, ফ্যসিস্ট হাসিনা-সরকারকে উৎখাত।
এর পরের যে কথাটি তিনি বলতে গিয়েও বলেননি তা হচ্ছে, এই উৎখাতের পরে আবারও দেশ হাসিনার তৈরি করা পথেই এগুচ্ছে। সত্যি কি তাই?
আমাদের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হচ্ছে আমাদের স্বপ্নগুলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের পরে আমাদের সকল স্বপ্ন বন্ধক রেখেছিলাম বঙ্গবন্ধুর কাছে। তিনিই সব সমস্যার সমাধান করে দেবেন। মানুষ রীতিমতো তাকে পুজো করতে শুরু করে। ফলে তিনি হয়ে ওঠেন দানব। তিনি মনে করতে শুরু করেন দেশের ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতা এবং অধিকার কেবল তারই আছে, আর কারো নেই। দেশবাসী তার কাছে তুচ্ছ প্রজামাত্র। গণমানুষের আকাঙ্খাকে মূল্য না দিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধূলিস্যাৎ করে দেন। যে গণতন্ত্রের জন্য, গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, এদেশের মানুষ জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করলো, ত্রিশ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিলো, তাদের রক্তের সাথে বেঈমানী করে তিনি গণতন্ত্রকে চিরকালের মত কবর দেবার ব্যবস্থা করেন। প্রতিষ্ঠা করেন বাকশাল। ফলে তার নির্মম পতন হয়।
এরপর আমরা পাই দেশপ্রেমিক এক সৈনিককে। তিনি হাল ধরেন বাংলাদেশের। ১৮ দফার ঘোষণা দিয়ে নেমে পড়েন উন্নয়নের কাজে। ১৮ দফার মূল লক্ষ্য ছিল উৎপাদন বাড়াও, জনসংখ্যা কমাও। জনসংখ্যা তো আর কমানো যায় না, এর মানে হলো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখো। আমরা তার পেছনে হুমড়ি খেয়ে পড়ি। মনে হচ্ছিল, পেয়ে গেছি আমাদের কাঙ্খিত নেতা। কিন্তু তার অধ্যায়টিরও নির্মম পরিসমাপ্তি ঘটে।
এরপর আমরা একজন দুর্বৃত্ত, অদূরদর্শী জেনারেলকে পাই। যার মধ্যে দেশপ্রেমের চেয়ে ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাস ছিল অধিক গুরুত্বপূর্ণ । তিনি ছিলেন একজন ভীতু মানুষ। ক্ষমতায় থাকার জন্য দেশের ও দেশের মানুষের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে ভিনদেশের বশ্যতা মেনে নেন। জনরোষে তার পতন হয়। শুরু হয় গণতন্ত্রের পথে নতুন করে হাঁটা।
কিন্তু প্রকৃত গণতন্ত্রের পথ আমরা নির্মাণ করতে পারিনি। ব্যক্তিপুজা, পারিবারিক রাজনীতি, ক্ষমতা কুক্ষিগত করার লালসা ইত্যাদি গণতন্ত্রকে কেবল দূরেই ঠেলে দিয়েছে। দাঁতে দাঁত চেপে মানুষ তা মেনে নিয়েছিল, প্রত্যাশা করেছিল হোক না পরিবারতন্ত্র, গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে এর মধ্য দিয়েই হয়ত সুশাসন প্রতিষ্ঠা পাবে। কিন্তু না, এই মন্দ গণতন্ত্রকেও পিতার মতই হত্যা করল মুজিব-কন্যা শেখ হাসিনা। তার দখলবাজির যাঁতাকলে পড়ে বাংলাদেশ হয়ে ওঠে একটা মাফিয়া-রাষ্ট্র।
ঘুমিয়ে থাকা জনতা জেগে ওঠে। তাকে বিতাড়িত করে। শুধু তিনি একা নন, মাফিয়া রাজ্যের ছানা-পোনা, আন্ডা-বাচ্চাসহ তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। দেশের প্রধান মসজিদের ইমাম পর্যন্ত মাফিয়া সম্রাজ্ঞীর দোসর হয়ে উঠেছিলেন এবং তাকেও প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যেতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, মসজিদ, পাঠাগার, পানশালা সকল কিছুই ছিল মাফিয়াদের দখলে। দেশের মানুষ অতিষ্ট হয়ে তাদেরকে সবংশ বিতাড়িত করে। এমন ঘটনা সম্ভবত পৃথিবীর আর কোথাও ঘটেনি যে সরকার প্রধান তার সকল মন্ত্রী, এমপি, দলের প্রধান নেতা-নেত্রী, অঙ্গসংগঠনের নেতা-নেত্রীকে নিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান এবং প্রায় সকলের বিরুদ্ধেই খুন, গুম, দুর্নীতির অভিযোগে মামলা হয়।
হাসিনার মাফিয়া রাজ্যে মানুষ এতোটাই অসহায় এবং অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল যে তারা হাসিনার পতন অথবা নিজেদের মৃত্যু এই দুটি ছাড়া আর কোনো বিকল্প দেখছিল না। জুলাই বিপ্লবীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালাবার নির্দেশ দিয়েছিল হাসিনার প্রশাসন। তারই পুলিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে রিপোর্ট করতে গিয়ে নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, ‘গুলি খায় একটা, মরে একটা, বাকিডি যায় না।’ মিছিলে পাশের সঙ্গীর মৃত্যু দেখেও যখন অন্যজন মিছিল ছেড়ে পালাতে চায় না তখন এই মিছিলের বিজয় ঠেকানো অসম্ভব। ঘটলোও তাই, ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে হাসিনা সিংহাসন ছেড়ে পালিয়ে গেল। জনতা গণভবনে ঝড় তুললো। তার দম্ভের প্রাসাদ ডিমের খোসার মত পায়ের নিচে ফেলে ভেঙ্গে চুরমার করে দিল উত্তেজিত ছাত্র-জনতা।
এই বিপ্লবে ভিড়ের ভেতর থেকে কয়েকজন নেতা বেরিয়ে এলো। তারা বয়সে সবাই তরুণ। তাদের নাম নাহিদ, আসিফ, হাসনাত, সারজিস, উমামা…তারা বললেন, এই রাষ্ট্র নষ্ট হয়ে গেছে, এটিকে মেরামত করতে হবে। আঠারো কোটি মানুষ নতুন করে আবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। নতুন সরকার হলো। তারা নিজেদের নির্লোভ প্রমাণ করলো একজন সৎ ও নির্লোভ ব্যক্তিকে সরকার প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়ে। দেশের মানুষ তাদের বাহবা দিলো। বিপ্লবের পর পিতার বয়সী, মায়ের বয়সী, দাদা-দাদীর বয়সী মানুষেরা সমস্বরে বলতে শুরু করল, হে তরুণ বিপ্লবী, তোমরাই আমাদের নেতা, তোমরা দেশের দায়িত্ব নাও, তোমরা যা বলবে আমরা তাই করবো, তোমাদের পেছনেই হাঁটবো আমরা। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতা রুহুল কবির রিজভী কারামুক্ত হয়ে কেঁদে কেঁদে তরুণ বিপ্লবীদের “মাসুম বাচ্চা” বলে অভিহিত করেন এবং তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
অনভিজ্ঞতার কারণে এবং স্বার্থান্বেষী মুরুব্বীদের ভুল দিকনির্দেশনার কারণে আমাদের তরুণ বিপ্লবীরা অনেকগুলো ভুল করেন। বিপ্লবোত্তর প্রক্লেমেশন প্রথম দিনই ঘোষণা করা উচিত ছিল, বিপ্লবের সুনির্দিষ্ট স্লোগান, বিপ্লবের শপথ, বিপ্লবের সঙ্গীত ঘোষণা করা উচিত ছিল। প্রচলিত সংবিধান বাতিল করে বিপ্লবী সরকার গঠন করা উচিত ছিল। এগুলো কিছুই তারা করতে পারেননি কিছু ভীতু এবং অদূরদর্শী মুরুব্বীর ভুল পরামর্শের কারণে।
বিপ্লবীরা হয় অকুতোভয়। জুলাই-আগস্টে যাদের আমরা অকুতোভয় দেখেছি তারা অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ক্ষমতার স্বাদের কাছে, কিছুটা হলেও, পরাজিত হন এবং ক্রমশ মৃত্যুভয়ে ভীত হয়ে পড়েন। তারা বাঁচার রাস্তা খুঁজতে শুরু করেন এবং এই পর্যায়ে এসে তারা দ্বিতীয় ভুলটি করেন। একটি ভুল রাজনৈতিক দল গঠন করেন।
নতুন বন্দোবস্তের কথা যারা বলেন তাদের রাজনৈতিক দল কখনো ক্ষমতা কেন্দ্রিক, মধ্যপন্থী হতে পারে না। তারা হবেন একরৈখিক, দেশপ্রেমিক, পবিত্র বিপ্লবের প্রতি অনুগত। রাষ্ট্র মেরামতের যে স্বপ্ন তারা জাতিকে দেখিয়েছিলেন তা ক্রমশ কেবল কথার কথা হয়ে উঠছে। সেজন্য তারা একা দায়ী নন, মূলত দায়ী দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো। কিন্তু তারা তো জানেন তাদের যুদ্ধটা হাসিনা-সরকারের বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল এই পুরনো বন্দোবস্তের বিরুদ্ধে। আজ যারা তাদেরকে রাষ্ট্র মেরামতে বাঁধা দিচ্ছে তারা পুরনো বন্দোবস্তের সুবিধাভোগী, এই ব্যবস্থা তারা বদলাতে দেবে না এটাই স্বাভাবিক। তদের কি এখন উচিত হবে না অসমাপ্ত বিপ্লবের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে মূল লক্ষ্যে অটল থাকা?
তাদের এখন এমন একটি বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তুলতে হবে যে সংগঠনের কাজ হবে সমাজের সকল স্তর থেকে পুরনো বন্দোবস্ত উৎখাত করা। যে সরকার তারাই গঠন করেছেন সাহসের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সেই সরকারকে ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করতে হবে তারা যেন মূল লক্ষ্য থেকে এক চুলও বিচ্যুত না হন। এই জায়গাটিতে স্থির থাকতে পারলে দেশের ১৮ কোটি মানুষ আবার তাদের পেছনে দাঁড়াবে।
অনেকের সন্দেহ তারা বিভ্রান্ত, লোভের কাজে পরাজিত কিংবা নিরাপত্তাহীনতায় ভীত। বিপ্লবীদের আমৃত্যু নির্লোভ থাকতে হয়, মৃত্যু তাদের হাতের খেলনা। চে গুয়েভারা মন্ত্রীত্বকে দু’পায়ে ঠেলে দিয়ে ছুটে যান বলিভিয়ায় নতুন বিপ্লবের ডাক দিতে। স্ত্রী, সন্তানকেও ত্যাগ করেন। স্বপ্ন দেখেন সমস্ত পৃথিবীতে বিপ্লব ঘটাবেন। আমাদের তরুণ বিপ্লবীরা প্রচুর পড়াশোনা করেন বলে জেনেছি, নিশ্চয়ই তারা চে’র জীবন পাঠ করেছেন।
এখন কথা হচ্ছে নাহিদ, আসিফ, উমামারা বিপথগামী হলে কি জুলাই ব্যর্থ হবে? না, হবে না। জুলাই-ই এই নামগুলোর জন্ম দিয়েছে। জুলাইয়ের অর্জন এই নামগুলো নয়, জুলাইয়ের অর্জন হচ্ছে জাগরণ। একদল নাহিদ, হাসনাত, সারজিস যেমন ভিড়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে, তারা ব্যর্থ হলে আরেকদল বেরিয়ে আসবে, এবং ভবিষ্যতের নেতৃত্ব ব্যর্থ হলে আরো একদল নেতা বেরিয়ে আসবে।
বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষকে শুধু জুলাইয়ের চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। যখন হাসিনার অত্যাচারে বিএনপির কর্মীরা কোথাও দাঁড়াতে পারত না তখন অভিমন্যুর মত বেরিয়ে এসেছিলেন এক তরুণ নেতা ভিপি নূর।
বারবার রক্তাক্ত হয়েও রাজপথে বীরের মত দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু নূর নানান কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় মূল স্রোত থেকে ছিটকে পড়েন, স্রোতের হাল ধরেন নাহিদ, আসিফ, সারজিসরা। যদি ওরা মূল লক্ষ্য থেকে ছিটকে পড়েন, নতুন একদল উঠে আসবে। এই রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ মেরামতের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিপ্লবের এই ধারাবাহিকতা চলতেই থাকবে। মনে রাখতে হবে শেখ মুজিবের নামে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল কিন্তু আমাদের অর্জন শেখ মুজিব নয়,আমাদের অর্জন মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে অবশ্যই শেখ মুজিবের কথা বলবো কিন্তু শেখ মুজিবের কারণে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলবো না।
ব্যক্তি কখনোই একটি জনযুদ্ধের বা জনজাগরণের চেয়ে বড়ো হতে পারে না। জুলাইয়ের অর্জন কোনো ব্যক্তি নয়, জুলাইয়ের অর্জন এক মহাজাগরণ। ভবিষ্যতে যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেবেন তাদেরকে প্রতি মুহূর্তে এই জাগরণের হুঙ্কার শোনাতে হবে।
হলিসউড, নিউইয়র্ক। ২১ মে ২০২৫
Posted ১১:২৯ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৯ মে ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh