কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৪
নতুন একটি সংবিধান রচনাই যথার্থ হবে। বর্তমান সংবিধান সংশোধন করতে গেলে এতো কাটাছেঁড়া করতে হবে যে প্রকৃতপক্ষে একটি নতুন সংবিধানই রচিত হয়ে যাবে। এটি থাকুক, পটভূমি হিসেবে, ইতিহাস হিসেবে, স্মৃতি হিসেবে। পৃথিবীর বহু দেশ রাষ্ট্র ব্যবস্থা মেরামতের প্রয়োজনে সংবিধান নতুন করে লিখেছে। চিলি, ব্রাজিল, ভেনিজুয়েলা, শ্রীলংকা, নেপাল, বেলারুশ, কাজাখস্তান, কিরগিজিস্থান, লুক্সেমবার্গ প্রভৃতি দেশ নতুন করে তাদের সংবিধান পুনর্লিখন করেছে। হাইতি, আর্মেনিয়া, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, বার্বাডোজ তাদের সংবিধান নতুন করে রচনার পথে রয়েছে। যদি বাংলাদেশ এই পথে পা রাখে তাহলে এই তালিকায় বাংলাদেশের নামও যুক্ত হবে।
নতুন সংবিধান কেমন হবে, কী পদ্ধতিতে তা রচিত হবে এই প্রসঙ্গে ফরহাদ মজহারের বক্তব্য আমার খুব পছন্দ হয়েছে। তিনি বলেছেন, একটি সহজপাঠ্য ১৬ পৃষ্ঠার সংবিধান চাই, যেটা যে কেউ পড়তে ও বুঝতে পারবে। তিনি এই সংবিধান কেমন হবে তা ঠিক করার জন্য জনসম্পৃক্ততার কথা বলেছেন। একটি অংশগ্রহণমূলক আলাপের মধ্য দিয়ে সংবিধানের ধরণ ঠিক করতে বলেছেন। খুবই ভালো প্রস্তাব। দেশের মালিক জনগণ, তারাই ঠিক করবে এই দেশ কীভাবে, কোন সংবিধানের আলোকে পরিচালিত হবে। থানা, ইউনিয়ন পর্যায়ের সংলাপের কথা তিনি সুপারিশ করেছেন।
এখন কথা হলো আমরা যখন ইউনিয়ন বা থানা পর্যায়ের মানুষদের নিয়ে এক বা একাধিক সংবিধান-সংলাপের আয়োজন করবো এবং তাদের কাছে জানতে চাইব, বাংলাদেশের জন্য আপনি কেমন সংবিধান চান? সবাই শূন্য দৃষ্টিতে প্রশ্নকর্তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবে, কেউ কোনো উত্তর, মতামত বা পরামর্শ দিতে পারবে না। দিলেও তা হবে খুবই অপ্রাসঙ্গিক, কোনো কাজের উত্তর আসবে না। কারণ বাংলাদেশের মানুষ তো তাদের সংবিধান কখনো পড়েনি। অনেকটা হরিজনদের বেদ পড়তে না দেয়ার মত আমাদের শাসকেরা কখনো চাননি দেশের জনগণ সংবিধান পড়ে তাদের অধিকারের বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠুক।
সাধারণ মানুষের মধ্যে সংবিধান কি জিনিস সেই বিষয়ে হয়ত ভাসা ভাসা একটা ধারণা আছে কিন্তু মূলত কেন একটি সংবিধান রচিত হয়, কী কী তাতে লেখা থাকতে হয় বা কী লেখা থাকলে গণমানুষের কী লাভ হয় তা তারা জানে না। সংবিধান-সংলাপ আয়োজনের ধারণাটি অসাধারণ। এজন্য কিছু প্রস্তুতিমূলক কাজ আগে থেকেই করে নিতে হবে। বাংলাদেশের মানুষের জন্য যে একটি নতুন এবং অধিকতর জনকল্যাণমুখী সংবিধান রচনা করা হবে তা দেশের মানুষকে জানাতে হবে। এজন্য সিভিক এডুকেশনের আয়োজন করতে হবে।
কাজটি স্কুলগুলোর মাধ্যমে হতে পারে। এরপর প্রতিটি ইউনিয়নের সংবিধান-সংলাপে অংশগ্রহণকারীদের ক্রাইটেরিয়া ঠিক করতে হবে। হতে পারে, প্রতিটি স্কুল থেকে একজন করে শিক্ষক প্রতিনিধি, প্রতিটি গ্রাম থেকে একজন সচেতন মানুষ। ইউনিয়ন পর্যায়ের সভা পরিচালনা করতে পারেন উপজেলার একজন সরকারী কর্মকর্তা। সকল ইউনিয়নের প্রস্তাবগুলো নিয়ে থানা পর্যায়ে সংলাপ হবে, সেখানকার মূল পয়েন্টগুলো নিয়ে জেলা পর্যায়ে সংলাপ হবে। সেখান থেকে বিভাগীয় সংবিধান-সংলাপ এবং সবশেষে কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকায়। এইসব সংলাপের সারমর্ম জমা দেওয়া হবে সংবিধান রচনা যারা করবেন সেই বিশেষজ্ঞ প্যানেলের কাছে।
সংলাপ শুরুর আগেই বর্তমান সংবিধানের সঙ্গে সম্ভাব্য সংবিধানের কী কী পার্থক্য হতে পারে তার একটি তালিকা তৈরি করে নিতে হবে এবং সেই তালিকা ধরে প্রোবিং কোয়েশ্চেন করতে হবে। নাহলে সংলাপ থেকে কোনো ফল বেরিয়ে আসবে না।
যেমন: এখন তো একজন ব্যক্তি যতবার খুশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারে, যদি নতুন সংবিধানে এমন বিধান থাকে একজন মানুষ সর্বোচ্চ দুইবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না, তাহলে কেমন হয়? বিশেষজ্ঞরা সাধারণত এরকম লিডিং কোয়েশ্চেন না করতে বলেন কিন্তু এক্ষেত্রে মুক্ত প্রশ্নে ভালো উত্তর না আসার জোর সম্ভাবনা থাকায় লিডিং প্রশ্নই করতে হবে। খুব সহজ ভাষায় ফ্লোর ক্রসিংয়ের বিষয়টাও বুঝিয়ে বলতে হবে। বলতে হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট সংসদের কথাও। প্রধানমন্ত্রী হবার সঙ্গে সঙ্গে দলের প্রধান থেকে ইস্তফা হয়ে যাবে এটাও বলতে হবে। যদি সরকারের মেয়াদ ৫ বছর থেকে কমিয়ে ৪ বছর করা হয় তাহলে কি ভালো হবে? এসব প্রশ্ন করলে গ্রাসরুটের মানুষেরা কথা বলার একটা গ্রাউন্ড পাবে।
সংবিধান যারা রচনা করবেন সেই কমিটিতে বা প্যানেলে সহজ ও শুদ্ধ বাংলা লিখতে পারেন এমন একজনকে যেন রাখা হয়। আমাদের সরকারি কাগজপত্রে অনেক হাস্যকর ভুল থাকে, সংবিধান যেন হয় শতভাগ শুদ্ধ। ছোটো সংবিধান হওয়াই ভালো। সংবিধানে থাকবে রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন, মূলনীতি, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ধরণ, দায়িত্ব ও কর্তব্য। এর আলোকে তৈরি হবে নানান রকম আইন। কোথাও ব্যাখ্যার প্রয়োজন হলে কোর্ট তার ব্যাখ্যা দেবে। সংবিধানে সকল কিছুর চুলচেরা ব্যাখ্যার তো প্রয়োজন নেই।
হলিসউড, নিউইয়র্ক। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪
Posted ১:২৫ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh