বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬ | ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

Weekly Bangladesh নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন জাগরণ

কাজী জহিরুল ইসলাম :   |   বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন জাগরণ

২০২৫ সালে আমাদের বড়ো প্রাপ্তি ছিল শরীফ ওসমান হাদীর রাজনীতিতে আগমন, সবচেয়ে বড়ো ক্ষতিও বছরের শেষে এসে তাকে হারানো। ৫৪ বছরের বাংলাদেশে যে রাজনীতি গড়ে উঠেছে তা আমাদের কোনো আলোর পথ দেখায়নি। চূড়ান্তভাবে এই রাজনীতি আমাদের একটি পরিবারতন্ত্র উপহার দিয়েছে যার অর্থ হচ্ছে সকল সম্ভাবনার মৃত্যু। এর চেয়ে ভয়াবহ অভিশাপ একটি দেশের জন্য আর কিছু হতে পারে না। যে দেশে ১৮ কোটি মানুষ বাস করে, যে দেশে প্রতি বছর ৩২ লক্ষ শিশু জন্মগ্রহণ করে সেই দেশের রাষ্ট্র পরিচালনা কে করবে তা নির্ধারিত হয় মাত্র দুটি পরিবার থেকে! কী ভয়াবহ, কী নির্মম! দেশের অমিত সম্ভাবনাকে গলা টিপে হত্যা করার কী জঘন্য ব্যবস্থা।

এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল একদল তরুণ, তারা মুখে বলছিল বটে সরকারী চাকরিতে মেধার মূল্যায়ন চাই, কিন্তু সেই শব্দের হুংকার দেশের কোটি মানুষের কানে অনূদিত হচ্ছিল, আমরা রাষ্ট্র পরিচালনায় মেধার অগ্রাধিকার চাই। এদেশের ভবিষ্যত রাষ্ট্রনায়কেরা বিশেষ কোনো পরিবার থেকে নয়, উঠে আসবে ৬৮ হাজার গ্রাম থেকে, দেশের যে কোনো ক্ষুদ্র শহর থেকে, মফস্বল থেকে। পারিবারিক ঐতিহ্য নয়, মেধাই ঠিক করবে কে এবং কারা রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। আমরা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানের হাতেই তুলে দিতে চাই দেশের নেতৃত্ব। কঠিন হলেও ৫৪ বছরের সংস্কৃতি ভেঙে হয়ত রাজনীতি দিয়ে, স্লোগান দিয়ে, কর্মসূচি দিয়ে, রক্ত দিয়ে এই দাবী আদায় করা সম্ভব, দুয়েকবার এদেশের মানুষ তা করেও দেখিয়েছে কিন্তু এর টেকসই অবস্থা নিশ্চিত করতে হলে দরকার একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন।

গণমানুষের বোধে এই বিশ্বাস জন্ম নিতে হবে রাষ্ট্রের নায়ক কোনো বিশেষ পরিবার থেকে নয় উঠে আসতে পারে দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে, যে কোনো সাধারণ পরিবার থেকে। কেননা রাষ্ট্রের মালিক দেশের সকল মানুষ, বিশেষ কোনো পরিবার নয়। মানুষের মধ্যে এই বৈষম্যমুক্ত বোধ তৈরি করার লক্ষ্যে শরীফ ওসমান হাদী একটি সাংস্কৃতিক মঞ্চ গঠন করেন, যার নাম দেন ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার। একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক সংস্কৃতি পাল্টে দেবার জন্য নিজেই ঢাকা ৮ আসনের সংসদ সদস্য পদে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার ঘোষণা দেন। শতভাগ সততা এবং স্বচ্ছতার মধ্যে থেকে পেশিশক্তিহীন, অর্থশক্তিহীন, কর্মীশক্তিহীন, এমন কী কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য না হয়েও কীভাবে মানুষের ভালোবাসা আদায় করা যায় তা তিনি দেখিয়ে দেন।

সকাল থেকে মধ্যরাত অবধি তিনি মসজিদে, বাজারে, রাস্তায়, মানুষের ঘরে ঘরে ছুটে যান, বিনয়ের সঙ্গে কথা বলেন। শুধু ভোটই চান না, নির্বাচিত হলে কী করবেন সেইসব কথাও বলেন। তিনি বলেন, আমি নির্বাচিত হলে ঢাকা ৮ আসনে কোনো চাঁদাবাজ থাকবে না। যখন পচা রাজনীতির ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা চাঁদাবাজী, সন্ত্রাস, টেন্ডারবাজীর যন্ত্রণায় অতীষ্ঠ নগরবাসী তখন এই ঘোষণা আমাদের আশার আলো দেখায়। প্রতিপক্ষ প্রার্থীদের সম্পর্কে একটিও নেতিবাচক শব্দ উচ্চারণ না করে কীভাবে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যায় এবং ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠা যায় সেই দৃষ্টান্ত তিনি তৈরি করেন। ভিনদেশের আধিপত্যমুক্ত স্বদেশ গড়ে তোলার স্বপ্নকে তিনি বাস্তবে রূপ দেবার লড়াইয়ে নেমেছিলেন। আরো সুস্পষ্ট করে যদি বলি ভারতের আধিপত্যমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে তিনি ছিলেন আপোষহীন এবং অকুতোভয়। তবে তিনি এও বলেন, তার এই যুদ্ধটা দিল্লির বিরুদ্ধে, ভারতের মানুষের বিরুদ্ধে নয়।

শরীফ ওসমান হাদী ছিলেন একজন কবি। সীমান্ত শরীফ নামে তিনি কবিতা লিখতেন। এক কবিতায় তিনি নিজেকে মৃত এবং তার দেহকে ভক্ষণযোগ্য ঘোষণা করেন। ভিনদেশি পরাশক্তিদের তিনি আহ্বান করেন তাকে ভক্ষণ করার জন্য। নিজের কলিজা, উরু সব খেতে বলেছেন শুধু মস্তিষ্কটা খেতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, ওটা খেলে তোমরা দাস হয়ে যাবে। কী অসাধারণ কটাক্ষ, কী নির্মম এক চপেটাঘাত আমাদের দাসত্বপ্রবণ মানসিকতার প্রতি। এই দাসত্ব ইঙ্গিত দেয় গত ৫৪ বছর ধরে দিল্লির দাসত্ব করাকে, ইঙ্গিত দেয় দেশের মানুষের দুই রাজপরিবারের দাসত্ব করার প্রতিও। এই দাসত্ব থেকে বের হয়ে আসার জন্য আমাদের যে দিক নির্দেশনা দরকার ছিল তার সুস্পষ্ট বাতিঘর হয়ে এদেশের মানুষের হৃদয়ে ভোরের এক অত্যুজ্জ্বল সূর্যের মত আবির্ভূত হয়েছিলেন শরীফ ওসমান হাদী।

হিন্দুরাই শুধু বাঙালি, এদেশের মুসলমান জনগোষ্ঠী বাঙালি নয়, পশ্চিমবঙ্গের এই বয়ান তিনি যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করেছেন। সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন পদ্মা, মেঘনার মতো বাঙালিদের দুটি ধারা বাঙালি হিন্দু এবং বাঙালি মুসলমান, পাশাপাশি বয়ে চলেছে যুগ যুগ ধরে। তাদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আমাদের সমৃদ্ধির জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে তার কণ্ঠ ছিল সোচ্চার। তিনি বহুবার বহু জায়গায় বক্তৃতা করে বলেছেন, এটা অন্যায়। ধর্ম এবং পোশাকের কারণে কাউকে লাঞ্ছিত করা যাবে না। রোকেয়া হলে গরুর মাংস রান্না করা নিষিদ্ধ করেছিল হাসিনা-সরকার, এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হলের অধিকাংশ ছাত্রী মুসলমান, তারা গরুর মাংস খেতে চায়, তাদের আপনি বঞ্চিত করতে পারেন না। বরং এটা নিশ্চিত করা দরকার অন্য ধর্মালম্বী যারা আছে, যারা গরুর মাংস খায় না, তারা যেন তাদের ন্যায্য খাবারটা পায়। কী অকাট্য, ন্যায়সঙ্গত যুক্তি।

৫৪ বছর ধরে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় আগাছা জন্মেছে, জঙ্গল তৈরি হয়েছে, জঞ্জাল তৈরি হয়েছে, সেই জঞ্জালের ওপর শেখ হাসিনা তার ১৫ বছরের শাসনকালে রোপন করেছেন অজস্র কাটাগুল্ম। চব্বিশের জুলাই মাসে একদল তরুণ এই শ্বাপদশঙ্কুল অরণ্য সাফ করার জন্য হাতে হাতে কাস্তে, কোদাল নিয়ে নেমে পড়েন সমগ্র বাংলাদেশে। তারা শুধু শেখ হাসিনার রোপন করা কাটাগুল্মই সাফ করেননি, নির্মূল করেছেন অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির তৈরি করা আগাছাও। সূচনা করেছেন এক অনিন্দ্য সুন্দর বাগানের ভিত্তিপ্রস্তর। সেই বাগানে জন্ম নিয়েছে কিছু উজ্জ্বল পুষ্প। সবচেয়ে উজ্জ্বল পুষ্পটির নাম শরীফ ওসমান হাদী। হাদীর মত নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, হাসনাত আব্দুল্লাহ, সারজিস আলম, তাসনিম জারা, সাদেক কায়েমসহ অসংখ্য পুষ্প ক্রমশ বিকশিত হচ্ছে। এই পুষ্পিত বাগানের সুবাস ভেতরে ভেতরে টের পেলেও প্রকাশ্যে বিএনপি, জাতীয় পার্টির মত আগাছা উৎপাদনকারী দলগুলো তা মেনে নিতে চাইছে না। চব্বিশের জুলাই বিপ্লব, ফ্রান্সে বসবাসরত বাঙালি বুদ্ধিজীবী পিনাকী ভট্টাচার্য যেটিকে নাম দিয়েছেন “বর্ষা বিপ্লব” দৃশ্যত হাসিনাকে বিতাড়িত করলেও তাত্বিকভাবে রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে উৎখাত করেছে ফ্যাসিবাদী সকল বন্দোবস্ত। বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনুসরণ করে বিএনপি ঈদের আনন্দ উদযাপন করছে। হাসিনা ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা পালিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে সকল অবৈধ দখলদারিত্বের মালিকানা নিজেদের দখলে নিয়ে নিয়েছে। অতীতে মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি, এক দলের প্রতি মানুষ ক্ষিপ্ত হলে অন্যদল ক্ষমতাকেন্দ্র চলে আসত, সেই সূত্র অনুসরণ করে তারা দখলদারিত্ব করায়ত্ব করেছে এবং তা নির্বাচনে জয়লাভের মধ্য দিয়ে পাকাপাকি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু তারা টের পেলেও স্বীকার করছে না এবার বৈতরণী পার হওয়া ততোটা সহজ হবে না। গত এক যুগ ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে বিপ্লব ঘটে গেছে তার প্রভাবে শুধু উন্নত পৃথিবীই বদলে যায়নি বদলে গেছে বাংলাদেশও। এখন সুদূর ঝালকাঠিতে বসবাস করা এক হতদরিদ্র অসহায় বৃদ্ধাও সোশ্যাল মিডিয়ায় এসে কাঁদতে কাঁদতে বলতে পারেন, ‘হাদী আমারে পের্তেক মাসে এক হাজার টাহা দেতে, অহন তো আমারে দেহার আর কেউ থাকলে না’। তার এই কষ্টার্তি মুহূর্তেই পৌঁছে যাচ্ছে দেশের কোটি জনতার কাছে। মানুষ জেনে যাচ্ছে, মির্জা আব্বাস বা সালাহউদ্দিন আহমেদ নয়, এদেশের মানুষের প্রকৃত বন্ধু শরীফ ওসমান হাদী। এই মুহূর্তে দেশে বিএনপির সমকক্ষ একটি রাজনৈতিক দল নেই, শেষ বিবেচনায় হয়ত বিএনপি ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে উৎরে যেতেও পারে, তবে তা খুব একটা সহজ হবে না। একাত্তর প্রশ্নে, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রশ্নে, ভিন্ন ধর্মালম্বীদের নিরাপত্তার প্রশ্নে, নারীদের পোষাকের স্বাধীনতার প্রশ্নে পিছিয়ে থাকা সত্বেও সততা ও ইনসাফের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী অতি দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাচ্ছে তরুণদের দল, জুলাইয়ে নেতৃত্ব দানকারী এনসিপিও।

প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে প্রত্যাখ্যান করে নতুন বাংলাদেশ গড়ার পথে এ-এক মহাজাগরণ। এই জাগরণই জুলাইয়ের মূল অর্জন, আমাদের নতুন সম্ভাবনা। একথা নিশ্চিত করেই বলা যায়, চব্বিশের জুলাইয়ে বিপ্লবের যে আগুন প্রজ্জ্বলিত হয়েছে এদেশের মানুষের হৃদয়ে তা খুব সহজেই নিভে যাবে না, এ-আগুন খুব সহসাই পুড়িয়ে ভষ্ম করে দেবে বৈষম্যের সকল আস্তানা। পরিপূর্ণ বৈষম্যহীন সমাজ, পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” স্লোগানে ক্রমশ প্রকম্পিত হতে থাকবে এদেশের আকাশ, বাতাস, এই গাঙ্গেয় বদ্বীপের প্রতি ইঞ্চি ভূমি।

হলিসউড, নিউইয়র্ক। ২২ ডিসেম্বর ২০২৫

Posted ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫

Weekly Bangladesh |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

গল্প : দুই বোন

(9320 বার পঠিত)

মানব পাচার কেন

(1583 বার পঠিত)

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  
Dr. Mohammed Wazed A Khan, President & Editor
Anwar Hossain Manju, Advisor, Editorial Board
Corporate Office

86-47 164th Street, Suite#BH
Jamaica, New York 11432

Tel: 917-304-3912, 718-523-6299 Fax: 718-206-2579

E-mail: [email protected]

Web: weeklybangladeshusa.com

Facebook: fb/weeklybangladeshusa.com

Mohammed Dinaj Khan,
Vice President
Florida Office

1610 NW 3rd Street
Deerfield Beach, FL 33442

Jackson Heights Office

37-55, 72 Street, Jackson Heights, NY 11372, Tel: 718-255-1158

Published by News Bangladesh Inc.