কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ১৭ জুলাই ২০২৫
বাংলাদেশ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা ২০২৪ সালের জুলাই মাসে এদেশের ছাত্র-জনতা লিখে দিয়েছে দেশের প্রতিটি দেয়ালে। লক্ষ-কোটি গ্রাফিতির কোথাও লেখা ছিল না, নির্বাচন চাই। নষ্ট হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রযন্ত্রটি মেরামত করে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার কথাই প্রতিফলিত হয়েছে বাংলাদেশের দেয়ালে দেয়ালে, গ্রাফিতি নামক এই মহাকাব্য রচনা করতে রক্ত দিতে হয়েছে ১৪০০ তরুণকে, শেখ হাসিনার নগ্ন বুলেটে আহত হতে হয়েছে ৩০ হাজার মানুষকে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণের যে স্বপ্ন দেখে আমরা উজ্জীবিত হয়েছি সেই স্বপ্নের কথাই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ও এর পূর্বাপর ধারা বর্ণনার মধ্য দিয়ে গ্রন্থবদ্ধ করেছেন সাংবাদিক ডা. ওয়াজেদ খান তার “বাংলাদেশের স্বপ্ন ও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান” গ্রন্থে।
বইটি প্রকাশ হয় ২০২৫ এর একুশে বইমেলায়। এর একটি আনুষ্ঠানিক প্রকাশনা উৎসব হয় ঢাকার প্রেসক্লাবে, ফেব্রুয়ারিতেই, কিন্তু তাতে তৃপ্ত হতে পারেননি লেখক, কারণ তার যে সুবিশাল বন্ধু-সুহৃদ রয়েছে দীর্ঘদিনের প্রবাস-নিবাস নিউইয়র্কে, তাদের রেখে প্রকাশনা উৎসব? না, হতেই পারে না, বুকের ভেতরে একটা খচখচানি থেকেই যায়। এই অতৃপ্তি দূর করতেই দ্বিতীয়বার বইটির প্রকাশনা উৎসবের আয়োজন করা হয় নিউইয়র্কে। অন্যদের সঙ্গে আমিও গ্রন্থটির একজন আলোচক ছিলাম।

যে সংস্কারের জন্য এতো এতো প্রাণ হলো বলিদান, সেই বিষয়টিকেই লেখক ওয়াজেদ খান এই গ্রন্থে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি লেখেন, “নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে বাধ্যতামূলক করতে হবে গণতান্ত্রিক চর্চা।
পরিবর্তন আনতে হবে নেতৃত্বের কাঠামোতে। তৃণমূল থেকে দলের শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি কমিটি গঠিত হতে হবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়। নেতাকর্মীদের গোপন ব্যালটে নির্বাচিত হতে হবে নেতৃত্ব। সুগম করতে হবে যোগ্য, মেধাবী নেতৃত্ব বিকাশের পথ। অবসান ঘটাতে হবে পরিবারতান্ত্রিক ব্যক্তিপূজার রাজনীতির।”
শুধু এখানেই থেমে থাকেননি, ওয়াজেদ খান আরো খানিকটা এগিয়ে বলেন, “একই ব্যক্তি দুবারের বেশি শীর্ষ নেতৃত্ব ধরে রাখতে পারবেন না। কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করলে যিনি সরকার প্রধান হবেন, অবশ্যই তাকে ত্যাগ করতে হবে দলের নির্বাহী পদ। আর যারা দলের শীর্ষস্থানীয় পদগুলোতে থাকবেন তারা মন্ত্রীত্ব গ্রহণ করতে পারবেন না” (পৃষ্ঠা ২০)
তিনি সম্ভবত দলের সাধার সম্পাদক পর্যায়ের ব্যক্তিদের কথা বলেছেন। হয়ত এই পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব হবে না তবে অবশ্যই দলের প্রধান এবং সরকার প্রধান কিছুতেই এক ব্যক্তি হতে পারবেন না এটা নিশ্চিত করতেই হবে। অতীতে আমরা দেখেছি সরকার প্রধান যখন একটি দলের প্রধান হন তখন তিনি কিছুতেই দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন না, তার প্রতিটি আচরণে মনে হয় তিনি একটি দলের প্রধানমন্ত্রী। তার কাজ শুধু দলের নেতা-কর্মী সমর্থকদের সুরক্ষা প্রদান করা।
তিনি যথার্থই বলেছেন এদেশের রাজনীতি থেকে পরিবারতন্ত্র চিরকালের মত দূর করতে হবে। এটি গণতন্ত্র বিকাশের পথকে রাহুর মতো গ্রাস করে রেখেছে। এই বিষয়ে আমি নিজেও একাধিক কলাম/প্রবন্ধ লিখেছি এবং সুস্পষ্ট করে বলে দিয়েছি কাজটি কীভাবে করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের কার্যবিধানের কোনো এক জায়গায় এই রকম একটি ধারা থাকতে হবে যে, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে কাউন্সিল করে নতুন কমিটি গঠন করতে হবে এবং কোনো ব্যক্তি দুইবারের বেশি সাংবিধানিক প্রধান (সভাপতি বা সমমর্যাদার) এবং নির্বাহী প্রধানের (সাধারণ সম্পাদক বা সমমর্যাদার) পদ গ্রহণ করতে পারবেন না।
তাহলেই পারিবারিক ক্ষমতার ধারাবাহিকতা ভেঙে যাবে, দলের শীর্ষ পদগুলো সকলের জন্য উন্মুক্ত হবে এবং মেধাবীরা নেতৃত্বে আসবে। এতে দল এবং সর্বোপরি দেশ যোগ্য ও মেধাবী নেতৃত্ব পাবে, মেধাবীরা রাজনীতিতে আসার উৎসাহ পাবে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় বদিউল আলম মজুমদারের সংস্কার কমিশন নির্বাচন কমিশন সংস্কারের সুপারিশের কোথাও এই বিষয়টি উল্লেখ করেননি।
অন্য এক জায়গায় ওয়াজেদ খান লিখেছেন, “চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মৌলিক আকাঙ্খা হচ্ছে বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। যে রাষ্ট্র সংরক্ষণ করবে তার নাগরিকদের সকল অধিকার ও মর্যাদা। সিলগালা করে দেবে ফ্যাসিবাদের সকল প্রবেশদ্বার। সময় এসেছে সংস্কারের মধ্য দিয়ে এই অচলায়তন থেকে বেরিয়ে এসে মেধাভিত্তিক রাজনীতি চর্চার।” (পৃষ্ঠা ২৭) ঠিক এই কথাগুলোই এদেশের ছাত্র-জনতা চব্বিশের রাজপথে রক্তের আলপনায় লিখে রেখেছিল।
মানুষের বুকের রক্ত দিয়ে রচিত এই কথাগুলো যদি এদেশের রাষ্ট্রকাঠামোর ভিত্তি না হয় তাহলে আবারো রক্তপাত হবে, আবারো এদেশের মানুষ বন্দুকের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াবে, আর আকাশ বাতাস কাপিয়ে স্লোগান তুলবে, “বুকের ভেতর দারুণ ঝড়/ বুক পেতেছি গুলি কর”।
জুলাই-আগস্ট এবং তৎসম্পর্কিত একটি রাজনৈতিক কমেন্ট্রি এই গ্রন্থ। ফলে “গণঅভ্যুত্থান কি বেহাত হওয়ার পথে?”, “ রাজনীতিতে নির্বাচনী রোডম্যাপ জটিলতা”, “বদলে যাচ্ছে প্রজাতন্ত্রের মালিকানা”, “গণঅভ্যুত্থানে সেনাবাহিনীর অবিস্মরণীয় ভূমিকা”, “ হাসিনার পতনের মূলে রাজাকার গালি” প্রভৃতি শিরোনামে আন্দোলনের এবং তৎপরবর্তী ঘটনাবলী উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের আধিপত্য একটি বহুল আলোচিত বিষয়। এদেশের বেশিরভাগ মানুষ বিশ্বাস করে ভারত বাংলাদেশের রাজনীতিতে চিরকাল অনধিকার চর্চা করে আসছে এবং রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় থাকার জন্য প্রতিবেশী বৃহৎ শক্তির প্রতি নতজানু পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করে আসছে। এক্ষেত্রে মুখে ভিন্ন কথা বললেও প্রকৃতপক্ষে সকল রাজনৈতিক দলই ভারতের প্রতি নতজানু। এই বিষয়টিও লেখক “ভারতের মানচিত্র খেকো পররাষ্ট্রনীতি” শিরোনামের রচনায় তুলে আনেন। তিনি লেখেন, “পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চলকে ভারতের অংশ দাবী করছে দেশটির কতিপয় সংবাদ মাধ্যম ও বুদ্ধিজীবী।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ নিয়ে চালানো হচ্ছে অপপ্রচার।…ভারতের আধিপত্যবাদ অনেক পুরনো।…এখনো তারা বিশ্বাস করে অখণ্ড ভারতে। দিল্লিতে ২০২৩ সালের জুনে উন্মুক্ত করা হয়েছে নতুন সংসদ ভবন। যেখানে রাখা হয়েছে ‘অখণ্ড ভারত’ এর একটি মানচিত্র।” (পৃষ্ঠা ১০২)
জুলাই অভ্যুত্থানের পারম্পর্য হিসেবে তিনি ইতিহাস থেকে তুলে আনেন ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৭৫, ১৯৯০ সহ সকল ঐতিহাসিক ঘটনা। ফলে “বাংলাদেশের স্বপ্ন ও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান” একটি ঐতিহাসিক দলিল হয়ে উঠেছে। “একটি দেয়াল লিখন ও সিরিয়ার স্বৈরশাসকের পতন” শিরোনামের নিবন্ধটি দেখে কেউ কেউ বিভ্রান্ত হতে পারেন, বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে রচনাটি সম্পর্কহীন মনে করতে পারেন। লেখক নিজেই ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, দেয়াল লিখন কী করে একটি স্বৈরশাসকের পতন ঘটিয়ে দিতে পারে তার দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে আছে, সিরিয়ায় তা ঘটেছে, যার সঙ্গে চব্বিশের বাংলাদেশের দেয়াল লিখনের শক্তির একটা সাযুজ্য বা আন্তর্জাতিক পারম্পর্য রয়েছে। এই বিবেচনায় রচনাটি এই গ্রন্থের জন্য মোটেও অপ্রাসঙ্গিক নয়।
অনুষ্ঠানে গ্রন্থটির ওপর আলোচনা করেন মনজুর আহমদ, আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু, হাসান ফেরদৌস ও মাহমুদ রেজা চৌধুরী। এ ছাড়া নিউইয়র্কে বসবাসরত বাঙালি সমাজের নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রধানগণ শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন। ফলে গ্রন্থের প্রকাশনাটি যথার্থই একটি উৎসবে পরিণত হয়।
খুব গোছানো এবং পরিচ্ছন্ন একটি অনুষ্ঠান ছিল। জ্ঞানচর্চায় নিয়োজিত কম্যুনিটির এমন সুনির্বাচিত ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানে একটা জ্ঞান-গাম্ভীর্য বজায় ছিল। সঞ্চালনা করেন আমার খুব প্রিয় মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আদিত্য শাহীন। সব মিলিয়ে অনেক দিন পর একটি অনুষ্ঠান প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত উপভোগ করেছি।
Posted ১১:৩১ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৭ জুলাই ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh