কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৫
আমরা যদি একটি বর্ধিষ্ণু চারাগাছের লকলকে মাথাটি কেটে দিই তাহলে কী হয়? মূল কাণ্ডটি আর বড়ো হতে পারে না, তখন চারাগাছটির দেহ থেকে কয়েকটি শাখা বের হয় এবং শাখাগুলো উঁচু হতে থাকে। শেকড়ে যদি পুষ্টি থাকে তাহলে গাছ বড়ো হবেই, প্রধান কাণ্ড কেটে দিলে শাখা কাণ্ড বড়ো হবে।
এবার যদি ফের আমরা শাখাগুলোর মাথা কেটে দিই তাহলে কী হবে? ওরা কি থেমে যাবে? আর বাড়বে না? গাছটি এরপরেও বাড়বে, যদি না ওর শেকড় পুষ্টিহীন হয়ে পড়ে, যদি না বার্ধক্যে, অসুখ-বিসুখে গাছটি রুগ্ন হয়ে পড়ে। স্বাভাবিক অবস্থায় সে তখন প্রতিটি শাখা থেকে কিছু নতুন উপশাখা বের করে দিয়ে বড়ো হতে থাকবে। গাছটি উঁচু হতে পারবে না ঠিকই কিন্তু চারপাশে ছড়িয়ে পড়বে, পাশাপাশি বাড়তে থাকবে।
বাংলাদেশের রাজনীতির চিত্রটিও তাই। যদিও ঘুরে ফিরে ভোটের মাধ্যমে দুটি রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আসে, কিন্তু দেশে রাজনৈতিক দলের সংখ্যা অনেক।
এই মুহূর্তে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত দলের সংখ্যা ৫৫টি, অনিবন্ধিত আরো বহু দল আছে। ভারত অনেক বড়ো একটি গণতান্ত্রিক দেশ। সেই দেশেও জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক দল আছে মাত্র ৬টি, প্রাদেশিক দল আছে ৫৮টি। উন্নত দেশগুলোর দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখবো প্রায় সব দেশেই দুটি রাজনৈতিক দল, একটি দল ক্ষমতায় থাকে, অন্যটি থাকে বিরোধী দলে এবং এই দুই দলের কার্যক্রমের কারণেই তাদের জনপ্রিয়তা ওঠানামা করে, ফলে ঘুরে ফিরে একেক দল একেকবার নির্বাচনে জয়লাভ করে। সম্প্রতি বিলেতে লেবার এবং কনজারবেটিভ পার্টির বাইরে একটি তৃতীয় রাজনৈতিক দল, লিবারেল ডেমোক্রেট দলের আবির্ভাব ঘটেছে। আমেরিকাতে রিপাবলিকান এবং ডেমোক্রেটের বাইরে তৃতীয় কোনো দল হই হই করেও সেইভাবে হয়ে উঠছে না।
তাহলে ছোট্ট একটা দেশ হওয়া সত্বেও আমাদের দেশে এতো রাজনৈতিক দল কেন?
অনেকেই বলবেন, লোভ, বাঙালিদের সকলেই নেতা হতে চায়। প্রবাসে একটি প্রবাদ আছে, দুজন বাঙালি একসঙ্গে হলে তিনটি সংগঠন তৈরি হয়। একটি আমার, একটি তোমার আর একটি আমাদের। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নেতা হতে চাওয়াটা কি অন্যায়? যদি কারো নেতা হবার যোগ্যতা থাকে তাহলে সে নেতা হবে, এতে সমস্যা কোথায়? সমস্যাটা আসলে এই “যোগ্যতার” জায়গাটিতেই। এখানে অযোগ্যরা যেমন নেতা হতে চায়, মানে আগাছাও বৃক্ষ হতে চায়, আবার যোগ্যরাও নেতা হতে পারে না, তাদের মাথা কেটে বনসাই করে রাখা হয়। ফলে তারা ওপরে উঠতে না পেরে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে পাশাপাশি বাড়ে, মানে নতুন দল গঠন করে। এভাবেই বিকল্প ধারা, গণফোরাম, এলডিপি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ইত্যাদি শাখাদল তৈরি হয়েছে।
কারো যোগ্যতা থাকলেই বাংলাদেশের প্রধান দলগুলোর শীর্ষনেতা হতে পারে না। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের সভাপতি হন। ১৯৭৫ সালে তিনিই আওয়ামী লীগ বিলুপ্ত করেন। বিলুপ্ত হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনিই সভাপতি ছিলেন। এই ৯ বছর দলের নেতৃত্ব তিনি আর কারো হাতে যেতে দেননি। ১৯৮১ সালে তার কন্যা শেখ হাসিনা ভারতের নির্বাসন থেকে ফিরে এসে কোনো অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা ছাড়াই শুধুমাত্র মুজিব কন্যা হবার কারণে দলের সভাপতি হন এবং আজও অবধি, ৪৪ বছর ধরে তিনিই এই পদ আঁকড়ে ধরে আছেন।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরে তার বিধবা স্ত্রী, একজন গৃহবধূ, বেগম খালেদা জিয়া কোনো যোগ্যতার বলে নয়, জিয়ার স্ত্রী হবার সুবাদে দলের চেয়ারপার্সন হন, আজও অবধি তিনিই এই পদে বহাল আছেন। আর কারো সাধ্যই নেই তার জীবদ্দশায় এই পদে আসীন হবার কথা চিন্তা করতে পারেন।
তিনি অসুস্থ, কারাগারে, তাতে কী? তিনিই চেয়ারপার্সন। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, এই পদের কী আদৌ কোনো কাজ আছে? যদি কাজ থাকে তো একজন বছরের পর বছর অসুস্থ থাকলে, কারাগারে থাকলে কী করে এই পদে বহাল থাকেন? মূল কারণ হচ্ছে এগুলো রাজতান্ত্রিক পদ, তাদের কোনো জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নেই। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পরে উত্তরাধিকার সূত্রে এই পদে আসীন হবেন তার পুত্র তারেক রহমান।
এই ধরণের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কিংবা রাজনৈতিক বন্দোবস্ত দেশের কী ক্ষতি করে? যদি একই ব্যক্তি একটি দলের প্রধান থাকেন ৪৪ বছর সেই দলে গতি আসবে কোত্থেকে? যদি এই ৪৪ বছরে দলটি ১৫/১৬ জন সভাপতি পেত তাহলে ১৫/১৬ জনের বৈচিত্রপূর্ণ চিন্তা, মেধা, অভিজ্ঞতায় দলটি সমৃদ্ধ হত। তাদের কেউ কেউ অতি মেধাবী, দক্ষ, পরিশ্রমী ও সৎ মানুষ হতেন, কেউ কেউ হয়ত অপেক্ষাকৃত কম মেধাবী বা অসৎ হতেন। প্রধানের পদটি সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকলে একটা প্রতিযোগিতা থাকত, এই প্রতিযোগিতাই সবচেয়ে যোগ্য মানুষটিকে শীর্ষে নিয়ে আসত, অসৎ ও অদক্ষরা ঝরে পড়ত। শেখ হাসিনার মত নিম্ন মেধার মানুষ নেতৃত্ব থেকে বহু আগেই ঝরে পড়ত। দল ভালো নেতৃত্ব পেত এবং সেই দল নির্বাচিত হলে দেশও পেত সেরা নেতৃত্ব।
বড়ো দুটি রাজনৈতিক দলে যদি এই ধরণের সুস্থ প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা থাকে এবং পদ পদবীগুলো এমনভাবে উন্মুক্ত থাকে যে প্রত্যেকে তার মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী পদায়িত হবেন তাহলে দলগুলোতে গতি আসবে। তখন উঁচু হতে হতে দলের প্রধান পদটি কেউ ছুঁয়ে ফেললে তার মাথা কেটে দেওয়া হবে না, ফলে তাকে শাখা বিস্তার করে ড. কামাল হোসেন, কাদের সিদ্দিকী, বদরুদ্দোজা চৌধুরী, অলী আহমদ প্রমূখের মত ভিন্ন পথে প্রবাহিত হবার দরকার হবে না। দেশে এতো এতো রাজনৈতিক দল তৈরি হবে না। এই পুরনো অকার্যকর রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বদলে ফেলার এখনই উপযুক্ত সময়। পারিবারিক বিবেচনায় কেউ যেন দলের প্রধান, অতঃপর দেশের প্রধান হতে না পারেন সেই ব্যবস্থা আইন করেই করতে হবে এবং তা হতে হবে যৌক্তিকভাবে।
কীভাবে তা করা যায় এই বিষয়ে আমি আগেও লিখেছি, আবারও লিখছি। আমাদের শুধু ৩টি কাজ করতে হবে। প্রথমত, কেউ দুই মেয়াদের বেশি সরকার প্রধান হতে পারবেন না, দ্বিতীয়ত, সরকার প্রধান দলের প্রধান থাকতে পারবেন না। সরকার প্রধান আর দলের প্রধান এক ব্যক্তি হলে তিনি একটি দলের প্রধানমন্ত্রী হয়ে যান, দলীয় চিন্তার বাইরে এসে কখনোই দেশের তথা সকলের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন না। এই দুটি ব্যবস্থা সংবিধান সংস্কার করে করতে হবে।
তৃতীয় যে কাজটি করতে হবে তা হলো প্রত্যেক রাজনৈতিক দলকে বাধ্যতামূলকভাব নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে নতুন কমিটি করতে হবে এবং কেউ দলের প্রধান হিসেবে দুই মেয়াদের বেশি থাকতে পারবেন না। সকল নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে এই বিধান থাকতে হবে।
এটি নিশ্চিত করবে নির্বাচন কমিশন। কোনো দল এই নিয়ম না মানলে তাদের রেজিস্ট্রেশন বাতিল হয়ে যাবে এবং তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। অন্য কোনো সংস্কার করা না গেলেও এই তিনটি সংস্কার একেবারে অত্যাবশ্যক। আগামী নির্বাচনের আগে এই তিনটি সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে, তাহলেই আমাদের আকাঙ্খিত নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত অনেকটাই নিশ্চিত হবে।
হলিসউড, নিউইয়র্ক। ১০ এপ্রিল ২০২৫
Posted ১১:৫৯ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh