বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬ | ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

Weekly Bangladesh নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত

বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং কাজল চক্রবর্তীর ফোন কল

কাজী জহিরুল ইসলাম :   |   বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং কাজল চক্রবর্তীর ফোন কল

প্রতি বছর বাংলা একাডেমি পুরস্কার ঘোষণার পর পর একটা হৈ চৈ হয়, চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়, পুরস্কারটির কতখানি অধঃপতন হলো, দলীয়করণ হলো, এইসব নিয়ে কথা হয়। আমরা হালকা, গভীর, বালখিল্য, গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট দিই। অনেকে ঈর্ষাজনিত পোস্টও দিই। আমিও আমার মত করে কিছু লিখি। গত চল্লিশ বছর ধরে লেখালেখি করার ফলে প্রায় সবাইকেই তো চিনি, বাংলা ভাষায় কে কেমন লিখছেন তা-তো মুটামুটি নখদর্পনেই আছে। মোহন রায়হান এ-বছর কবিতায় বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন। তাকে অভিনন্দন। নির্বাচনের কয়েকদিন আগেই তিনি তার সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে তার হাতকে শক্তিশালী করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে এসেছেন, কাজেই এর স্বীকৃতি তো তিনি পেতেই পারেন। চাটুকারিতার এই ফর্মেটের বাইরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা-স্বীকৃতি যাবে এটা আশা করাটাই সম্ভবত এখন অন্যায়ের পর্যায়ে পড়ে।

এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনের প্লাটফর্ম হিসেবে জাতীয় কবিতা পরিষদ গঠনে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সেই সময়ে তাকে লাল শার্ট, লাল প্যান্ট, লাল টুপি পরে টিএসসিতে হাঁটাহাঁটি করতে দেখেছি। মঞ্চে দাঁড়িয়ে এরশাদকে গালাগাল দিয়ে কবিতা পড়তেও দেখেছি। একদিন কবি সাযযাদ কাদির আমাকে বলেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি দেয়ালে মোহন রায়হানের গুলির দাগ আছে। তার কবিতায় অক্ষরবৃত্ত ছন্দের একটা নিবিড় বুনন আছে, তবে প্রায় সব কবিতাই উচ্চকিত, রাজনৈতিক। জীবনের গভীর কোনো অনুভূতি, দর্শন কিংবা আধ্যাত্মিক বোধ পাইনি। হয়ত লিখেছেন, আমার পড়া হয়নি। জাতীয় পর্যায়ের পুরস্কার পাওয়ার জন্য শুধু রাজনৈতিক কবিতাই পূর্ণাঙ্গ যোগ্যতা নয় বলে আমি মনে করি। তারপরেও অতীতে অনেক মানহীন কবি শুধু দলীয় আনুগত্যের কারণে এই পুরস্কার পেয়েছেন, তাদের তুলনায় মোহন রায়হান মন্দ নয়।

তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করতে সেদিন রেজাউদ্দিন স্টালিনও গিয়েছিলেন। বিএনপির কবি হিসেবে খ্যাত স্টালিন ২০০৬ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান, এবার একুশে পদক পাবেন ভেবেছিলাম। পরে বিভিন্ন জনের লেখা থেকে জানতে পারলাম রেজাউদ্দিন স্টালিন, আব্দুল হাই শিকদার এবং হাসান হাফিজ বিএনপির এই তিন লেখকের উপুর্যপরি তদবিরের কারণে কর্তৃপক্ষ এ-বছর কোনো লেখককেই একুশে পদক দেননি। ওদিকে কবি আবিদ আনোয়ার ফেইসবুকে কান্নাকাটি করছেন, আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ এবং মঈনুল আহসান সাবের তার সম্পর্কে এন্তার ভালো কথা লিখে সুপারিশ করার পরেও কেন কর্তৃপক্ষ তাকে এবার একুশে পদক দিল না। আক্ষেপ আরো অনেকেরই আছে। সব আর না বলি।

সোশ্যাল মিডিয়ায় এইসব পড়ছিলাম আর বাংলা একাডেমি নিয়ে ফেইসবুকে টুকটাক পোস্ট দিচ্ছিলাম। আমি মোহন রায়হানের ভালো কোনো কবিতা পড়তে চেয়ে পোস্ট দিয়েছি বলে অনেকেই ইনবক্সে তার কবিতা পাঠাচ্ছেন। এরই মধ্যে আগামী প্রকাশনীর ওসমান গণি ভাই মেসেজ পাঠিয়ে তার উচ্ছাস প্রকাশ করলেন, তাদের প্রকাশনা সংস্থার তিনজন লেখক এবার বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন। অনেকে আবার আমাকেই প্রশ্ন করছেন, আমি কেন পেলাম না, ইত্যাদি ইত্যাদি। বেশ কিছু টেলিফোনও আসছে। ফ্লোরিডা থেকে প্রিয় আবৃত্তি শিল্পী রাকিব হাসান ফোন দিয়েছেন, ডালাস থেকে কাদের ভাই ফোন দিয়েছেন, বাড়ির পাশে নিউইয়র্কের জ্যামাইকা থেকে আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু ফোন দিয়েছেন এবং সবশেষ কলকাতা থেকে কবি কাজল চক্রবর্তী ফোন দিলেন। এ-ছাড়া আরো কিছু ফোন মিস করেছি। হোয়াইটঅ্যাপ এবং ফেইসবুকের ইনবক্সে অসংখ্য মেসেজ তো আসছেই।

কাজল চক্রবর্তীর ফোন আসা মানেই হলো আমাকে অন্তত এক ঘন্টা তার কথা শোনার জন্য তৈরি থাকতে হবে। ঢাকার সাহিত্য-মহলের সঙ্গে তার নিবিড় যোগাযোগ, হাজারো স্মৃতি তার ঝুলিতে এবং দিন ক্ষণ উল্লেখ করে তিনি সেগুলো বলতে থাকেন। লেখকদের জীবনের গল্প শুনতে আমার ভালো লাগে, তিনি খুব ছোটো লেখক হলেও ক্ষতি নেই, আমি মন দিয়ে শুনি। বাংলাদেশের লেখকদের মধ্যে সম্ভবত নির্মলেন্দু গুণই সবচেয়ে বেশি গল্পের জন্ম দিয়েছেন, তার সান্নিধ্যে এসেছেন এমন কাউকে পাওয়া যাবে না যে তাকে নিয়ে দুয়েকটি গল্প বলতে পারবেন না। কাজল দা গড়গড় করে অনেকগুলো গল্প বললেন। আমি বলি, আপনি এগুলো লিখছেন না কেন? তিনি বলেন, হ্যাঁ লিখবো। আমি বলি, থাক আপনার লিখতে হবে না, আমিই লিখছি। আপনার আপত্তি নেই তো?
তিনি বলেন, না, কোনো আপত্তি নেই। লিখুন।

সেইসব গল্প থেকে আজ একটি গল্প বলছি। এখানে বলে রাখি, আমাদের আলোচনাটি শুরু হয় বাংলা একাডেমি পুরস্কার নিয়েই। দলীয়করণের কারণে এ-বছর পশ্চিমবঙ্গের একাডেমি পুরস্কার বন্ধ রয়েছে সেটাও তিনি জানালেন। মোহন রায়হান পাওয়াতে তিনি খুশি হয়েছেন সেটাও বললেন।
এবার মজার গল্পটা বলি।

একদিন কাজল চক্রবর্তী আর আসলাম সানী কোথাও বসে আছেন তখন ছড়াকার আমীরুল ইসলাম এসে হাজির। আপনারা অনেকেই জানেন ঢাকায় রিটন, সানী, আমীরুল, মাযহার এই চারজনের একটা গ্যাং ছিল, তারা একে অন্যের হরিহর আত্মা ছিলেন। আমীরুল ইসলাম সানীকে কুশল জিজ্ঞেস করলে সানী বলেন, খবর খুবই খারাপ, প্যান্টের পকেটে হাত দিলে নুনু ছাড়া আর কিছুই পাই না।

আমীরুল জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে সানী বলেন, পকেট খালি, একটা টেকাও নাই।
সেই সময়টাতে সম্ভবত চ্যানেল আইয়ের সঙ্গে নির্মলেন্দু গুণের খারাপ সময় যাচ্ছিল। আমীরুল ইসলাম প্রস্তাব দেন, আপনে যদি নির্মলেন্দু গুণকে চ্যানেল আইয়ের অফিসে নিয়ে আসতে পারেন তাইলে ৫ হাজার টেকা পাইবেন।
অক্ষনই লয়া আইতাছি।
বলেই সানী এবং কাজল চক্রবর্তী চলে যান নির্মলেন্দু গুণের কাছে। গিয়ে বলেন,
দাদা আপনের তো পকেটে কোনো টেকা নাই, চলেন, এক জায়গায় আপনেরে নিয়া যাই, খালি কয়েকটা কথা কইবেন, ওরা রেকর্ড করবো, ব্যাস, ৫ হাজার টেকা পাইবেন।
গুণ দা জিজ্ঞেস করেন, কতক্ষণ লাগবো?
বেশিক্ষণ না সব মিলায়া ঘন্টা দুয়েক।
একটি সিএনজি নিয়ে তিনজন পৌঁছে যান চ্যানেল আইওয়ের অফিসে। যেতে যেতে সানী বলেন, দাদা ওরা আপনেরে যে পাঁচ হাজার টেকা দিব, ওইখান থাইকা আমারে কিন্তু দুই হাজার দিবেন। গুণ দা বলেন, ঠিক আছে নিবা, অসুবিধা কি।
চ্যানেল আইয়ের অফিসে পৌছানোর পর গুণ দা বলেন,
সানি কাজটা তুমি ভালো করো নাই, আমারে চ্যানেল আইয়ে নিয়া আসলা?
দাদা, আপনের টেকা দরকার না?
হ দরকার তো।
ব্যাস, টেকা পাইবেন।
কিছু একটা রেকর্ড করা হয়। আমীরুল ইসলাম গুণ দার হাতে একটা খাম দেন। গুণ দা খামটা সানীকে দিয়ে বলেন, তোমার দুই হাজার নিয়া নেও।
আমীরুল ইসলাম একটা সিএনজি ভাড়া করে দিলে ওরা ফিরে যান। ফেরার পথে সানী বলেন, গুণ দা আমি আপনার চেয়ে বড়ো কবি।
কেমনে?
আপনে কত পাইছেন?
তিন হাজার।
আমি পাইছি সাত হাজার।
কেমনে?
আমারে চ্যানেল আই দিসে পাঁচ হাজার, আপনে দিছেন দুই হাজার।
এই গল্প যখন কাজল চক্রবর্তী বলছিলেন তখন তার কন্ঠের অভিব্যক্তি শুনে মনে হচ্ছিল তিনি যেন সেই মুহূর্তের হাস্যরসের মধ্যেই আছেন।

হলিসউড, নিউইয়র্ক। ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

Posted ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

Weekly Bangladesh |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

গল্প : দুই বোন

(9320 বার পঠিত)

মানব পাচার কেন

(1583 বার পঠিত)

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  
Dr. Mohammed Wazed A Khan, President & Editor
Anwar Hossain Manju, Advisor, Editorial Board
Corporate Office

86-47 164th Street, Suite#BH
Jamaica, New York 11432

Tel: 917-304-3912, 718-523-6299 Fax: 718-206-2579

E-mail: [email protected]

Web: weeklybangladeshusa.com

Facebook: fb/weeklybangladeshusa.com

Mohammed Dinaj Khan,
Vice President
Florida Office

1610 NW 3rd Street
Deerfield Beach, FL 33442

Jackson Heights Office

37-55, 72 Street, Jackson Heights, NY 11372, Tel: 718-255-1158

Published by News Bangladesh Inc.