কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২৪
বিএনপির আচরণ নিয়ে দেশবাসী অসন্তুষ্ট। কেন তারা আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতিকে সরাতে চায় না? কেন তারা ছাত্রলীগ নিষিদ্ধের বিপক্ষে বক্তব্য দেয়? কেন তারা আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হোক তা চায় না? কেন তারা শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি নামানো নিয়ে সংবিধানের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে? এটা কোন বিএনপি?
শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার গত ১৫ বছরে বিএনপিকে কোথাও দাঁড়াতে দেয়নি, হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে খুন, গুম করেছে, তাদের একজন প্রধান নেতাকে ফাঁসি দিয়েছে, লক্ষ লক্ষ মামলা দিয়েছে, দলের প্রধান বেগম খালেদা জিয়াকে গৃহচ্যুত করেছে, তুচ্ছ এবং মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে কারাবন্দি করেছে, আক্ষরিক অর্থেই তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করেছে, স্বগৃহে অন্তরীণের সম্মানটুকুও দেয়নি। এরপরও আওয়ামী লীগের পক্ষ নিয়ে কেন কথা বলছে বিএনপি?
এর দুটি কারণ হতে পারে। ঈড়হংঢ়রৎধপু ঞযবড়ৎু বা ষড়যন্ত্র তত্বের আলোকে একটি বিশ্লেষণ আমরা করতে পারি, অন্যটি বিএনপির থিংক ট্যাংক এবং মধ্যম সারির নেতাদের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত যোগাযোগ, দেশের রাজনীতি বিশ্লেষকদের সঙ্গে আলাপচারিতা এবং একজন ডাকসাইটে বামপন্থী নেতা, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক অধ্যাপক তার সঙ্গে অফ দ্য রেকর্ড আলাপের প্রেক্ষিতে আমার বিশ্লেষণ।
প্রথমেই ষড়যন্ত্র তত্বটি ব্যাখ্যা করি। ৫৩ বছরের বাংলাদেশে আমরা দেখেছি, এদেশের কোনো রাজনৈতিক দলই এমন কোনো আত্মবিশ্বাসের পরিচয় দেয়নি যে তারা ভিনদেশী কোনো শক্তির তোয়াক্কা করে না। এ-প্রসঙ্গে ভারতের নাম সকলের আগে আসে, যদিও আমি বিশ্বাস করি না পাকিস্তানের কোনো ভূমিকা আছে, কিন্তু আমাদের রাজনীতিতে এই ন্যারেটিভ চালু আছে যে পাকিস্তান দ্বিতীয় প্রতিপক্ষ।
এই দুটি দেশ ছাড়া অন্য যেসব দেশের নাম আমরা শুনি সেগুলোর মধ্যে সর্বাগ্রেই আছে যুক্তরাষ্ট্র। এরপরে চায়না, রাশিয়া এবং ইউরোপ। একসময় ব্রিটিশ উপনিবেশ থাকলেও আমাদের রাজনীতিতে বিলেতের কোনো প্রভাব এখন আর সেইভাবে আছে বলে শোনা যায় না।
অন্য সবগুলো দেশের কথা বাদ দিলেও ভারতের আধিপত্য এবং প্রভাব যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আছে এটি অনস্বীকার্য। ভারতকে আস্থায় না রেখে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় টিকে থাকা যাবে না, এইরকম একটি ধারণা জনমনে খুব জোরালোভাবেই আছে। তাই মুখে মুখে বিএনপি এবং ইসলামী দলগুলো ভারতের বিরুদ্ধে কথা বললেও ভেতরে ভেতরে তারাও ভারতের স্বার্থরক্ষার দাসক্ষত দিয়েই ক্ষমতায় বসে এবং বসতে চায়। আর কে না জানে এদেশে ভারতের সবচেয়ে প্রিয় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগকে আসলে ভারত সরকারের বাংলাদেশে নিযুক্ত প্রতিনিধি বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না। তাদের দলীয় প্রধান থেকে শুরু করে প্রথম সারির প্রায় সকল নেতাই ভারত কর্তৃক প্রশিক্ষিত।
জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত এবং ভারতে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ সরকারকে পুনর্বাসনের সব রকম চেষ্টাই যে ভারত করছে এটাও দিনের আলোর মতোই পরিস্কার। এই ইস্যুতে, এই মুহুর্তের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল, খুব শিগগিরই যারা ক্ষমতায় বসতে যাচ্ছে, তাদের সঙ্গে একটি সমঝোতা ভারত করবে না এটা ভাবার কোনো অবকাশ নেই। এখন কথা হচ্ছে বিএনপি সেই ডাকে কতটা সাড়া দেবে। ওই যে বলেছি, আত্মবিশ্বাসহীনতা, ‘ভারতের সহযোগিতা ছাড়া টিকতে পারবো না’ এই ধারণা প্রতিটি রাজনৈতিক দলের অন্তরে খোদাই করা আছে। সেই ভীতি থেকেই ভারতের সঙ্গে বিএনপির একটি সমঝোতা হয়ে থাকা খুব স্বাভাবিক।
সেই সমঝোতার প্রধান শর্তগুলো হতে পারে : রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু এবং সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ্জামানকে ইউনূস সরকারের মেয়াদকালে স্বপদের বহাল রাখা এবং আওয়ামী লীগকে নির্বাচন করতে দেওয়া।
এবার আসি দ্বিতীয় বিশ্লেষণে। গত কয়েক দিন ধরে বিএনপির মধ্যমসারির চৌকষ এবং অ্যাক্টিভ কিছু নেতা-কর্মীর সঙ্গে কথা বলেছি, থিংক ট্যাংকদের সঙ্গে, শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে কথা বলেছি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেছেন, তাদের কাছে খবর আছে, রাষ্ট্রপতিকে সরাতে দিলেই তারা সেনাপ্রধানকেও সরিয়ে ফেলবে এবং তখন ইউনূস সরকার একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যাবে।
তখন তারা বেপরোয়া হয়ে উঠবে। তরুণ ছাত্র-জনতাকে দিয়ে একটি কিংস পার্টি গঠন করবে, ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করবে এবং কিংস পার্টিকে ক্ষমতায় বসানোর রাস্তা তৈরি করবে। আমি তাদের এই শঙ্কার সঙ্গে একদমই একমত নই। ড. ইউনূসকে যতটুকু চিনি, তিনি রাষ্ট্রের প্রধান সংস্কারগুলো, যেমন: সংবিধান, আইন ও নির্বাচন ব্যবস্থা, এগুলো রিলিজিয়াসলিই করতে চান। এগুলো সম্পন্ন করে একটি ফ্রি, ফেয়ার নির্বাচন দিয়ে দেশে গণতন্ত্র পুন:প্রতিষ্ঠা করতে চান যাতে এই দেশে আর কখনোই কোনো স্বৈরাচার মাথাচারা দিয়ে দাঁড়াতে না পারে। তিনি একজন অতি উঁচু পর্যায়ের দেশপ্রেমিক মানুষ।
আসিফ নজরুলের মত কিছু উপদেষ্টার জন্য বর্তমান পদবী, ক্ষমতা হয়ত অনেক বড়ো কিছু কিন্তু ড. ইউনূসের জন্য এটি বড়ো কোনো প্রাপ্তি নয়, বরং তিনি যদি এদেশের মানুষের জন্য সত্যিকার অর্থেই একটি নতুন বাংলাদেশ রচনা করে দিয়ে যেতে পারেন সেটিই হবে তার জন্য অনেক বড়ো সন্তুষ্টি এবং সম্মানের। হ্যাঁ, একথা ঠিক, তরুণ ছাত্র-জনতা, যাদের নেতৃত্বে জুলাই অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়েছে তারা হয়ত একটি রাজনৈতিক দল গঠন করবে, হয়ত নতুন দল না করে তারা সকলে মিলে নুরুল হক নুরুর গণঅধিকার পরিষদে যোগ দিয়ে এই দলটিকেই শক্তিশালী করে নির্বাচনে অংশ নেবে কিন্তু আমি এটা বিশ্বাস করি না কিংস পার্টি গঠন করে কারচুপির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় যাবার কোনো চেষ্টা তারা করবে। আমি এই তরুণদেরও বিশ্বাস করি, ভালোবাসি। আমি এটা দৃঢ়ভাবেই বিশ্বাস করি, তারা আমাদের এই বিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার কোনো চেষ্টা করবে না।
জামায়াতে ইসলামী কি ক্ষমতায় এসে যাবে? জামায়াতই কি কিংস পার্টি হবে? এই আশঙ্কা ভারতের এবং এদেশের বাম রাজনৈতিক দলগুলোর। শুরুতে একজন বাম নেতার কথা বলেছিলাম। তার মতে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ যদি একসঙ্গে জোট না করে তাহলে জামায়াত ক্ষমতায় এসে যাবে। আমি তা কিছুতেই মনে করি না। প্রচলিত পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে জামায়াতে ইসলামী এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ ৩০টি আসন পেতে পারে। বিএনপি পাবে ১৮০টি আসন। ভোটের রাজনীতির এই বাস্তব অবস্থা কি বামপন্থীরা বোঝেন না?
অবশ্যই বোঝেন কিন্তু তারা কখনোই বাস্তব অবস্থার আলোকে কথা বলেন না। তারা দলের তৈরি করা ন্যারেটিভকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য কথা বলেন, হোক তা অবাস্তব। এই একই বাম নেতাকে ৫ বছর আগে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনারা কি গণতন্ত্র চান না? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, হ্যাঁ চাই, বিএনপি, জামাত বাদ দিয়ে গণতন্ত্র। ওটাও ছিল তাদের পার্টির স্ট্যান্ড-পয়েন্ট। ভারতের তৈরি করা ন্যারেটিভ ‘জামাত এসে গেল’ বামেরা প্রচারে নেমেছে বলেই ভোটের রাজনীতির বাস্তব অবস্থার কথা না বলে তারা দেশকে জামাতের ভয় দেখাচ্ছে।
অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দানকারী ছাত্রদের একটি বড়ো অংশ বাঙালি মুসলমান সংস্কৃতিকে ধারণ করে, তারা জামায়াতপন্থী নয়। এরও একটা কারণ আছে, পশ্চিমবঙ্গের প্রমিত সংস্কৃতির চর্চা এতো উগ্র হয়ে উঠেছিল, বাঙালি মুসলমানদের যে একটা সংস্কৃতি বাংলাদেশে আছে এবং এর প্রভাব যে সুবিস্তৃত, তা প্রায় অস্বীকার করা হচ্ছিল আওয়ামী লীগের শাসনামলে, ফলে এই ধারাটি ভেতরে ভেতরে ফুঁসে উঠতে উঠতে, প্রকৃতপক্ষে তারাই, সুনামী ঘটিয়ে দিয়েছে।
এরা যেহেতু বাঙালি হিন্দু প্রভাবিত সংস্কৃতিকে বাঙালি মুসলমানদের সংস্কৃতি দিয়ে প্রতিস্থাপন করছে, যেটি জামায়াতের কালচারের প্রায় কাছাকাছি, জামায়াত মনে করছে এরা আমাদের লোক। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার অবৈধভাবে ক্ষমতায় বসাবার জন্য কোনো কিংস পার্টি তৈরি করবে বলে আমি বিশ্বাস করি না। যে প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ঘটেছে, ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটেছে, সেই লক্ষ্যের দিকেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তবে আমাদের সব সময় চোখ কান খোলা রাখতে হবে, কোথাও কোনো ভুল হলেই আওয়াজ তুলতে হবে, র্যাপার হান্নানের মতো বলতে হবে, ‘আওয়াজ উডা বাংলাদেশ’।
হলিসউড, নিউইয়র্ক। ১৭ নভেম্বর ২০২৪
Posted ১:৩৫ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh