কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
একটি গল্প বলি। সুবর্ণরেখা গ্রামে ২০০টি পরিবার বসবাস করত। এই দু’শ পরিবার ১০টি বংশে বিভক্ত। খাঁ বংশ, চৌধুরী বংশ, কাজী বংশ, সৈয়দ বংশ, সরকার বংশ, মুখার্জি বংশ ইত্যাদি। এদের মধ্যে সৈয়দ এবং কাজী বংশের জনসংখ্যা কিছুটা বেশি। গ্রামবাসী জানতে পারল এক মাস পরে সুবর্ণরেখায় একটা ভয়াবহ অসুখ আসবে। সেই অসুখে গ্রাম উজাড় হয়ে যাবে।
গ্রামের মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। কেউ কেউ বিষয়টাকে গুজব বলে উড়িয়ে দিল, কেউ গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাবার কথা ভাবতে লাগলো, আবার একদল, যারা বিশ্বাস করে অসুখটা আসবে কিন্তু তারা সিদ্ধান্ত নিলো গ্রামে থেকেই অসুখের মোকাবেলা করবে। ভিন্ন ভিন্ন মতামত আছে যদিও কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা সকলেই বিভ্রান্ত, কেউই জানে না কী করা উচিত। কোন কাজটি করলে গ্রামবাসীদের প্রাণ রক্ষা পাবে তা কেউই ঠিক মত বুঝতে পারছে না। তখন তারা ঠিক করলো এই গ্রামের জ্ঞানী লোকদের নিয়ে একটা সভা করা হোক, সেই সভায় সিদ্ধান্ত হবে আমাদের কী করা উচিত।
যেই চিন্তা সেই কাজ। প্রত্যেক বংশ থেকে সবচেয়ে শিক্ষিত এবং জ্ঞানী মানুষটিকে তারা বেছে নিল। দশ বংশের দশজন শ্রেষ্ঠ মানুষকে গ্রামবাসী দায়িত্ব দিল, আপনারা ভেবে চিন্তে একটা সিদ্ধান্ত নেন গ্রামবাসীর এখন কী করা উচিত। আপনারা যে সিদ্ধান্ত নেবেন, সমগ্র গ্রামবাসী সেটাই পালন করবে।
তারা দশজন আলোচনায় বসলো। ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনা হয়। প্রত্যেকটা উপায় নিয়েই তারা চুলচেরা বিশ্লেষণ করে কিন্তু দশজন কোনো একটি সিদ্ধান্তেই একমত হতে পারছে না।
অবশেষে ৮ জন এই মর্মে একমত হলো যে গ্রামবাসীরা কোথাও যাবে না, তারা গ্রামেই থাকবে এবং বড়ো শহর থেকে একটি মেডিকেল টিম গ্রামে এনে রাখা হবে, যাতে অসুখটি দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চিকিৎসা শুরু করা যায়। যে দুজন এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হয়নি তারা বিশ্বাসই করে না যে এইরকম কোনো অসুখ গ্রামে আসবে। তারা কিছুতেই ৮ জনের সঙ্গে একমত হচ্ছে না। শেষমেশ যেহেতু অধিকাংশ মানুষ একটি সিদ্ধান্তে পৌছুতে পারলো, গণতন্ত্রের খাতিরে এই সিদ্ধান্ত তাদের দুজনকেও মেনে নিতে হলো, কিন্তু তারা বললো, রেজুলেশনে আমাদের একটা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ লিখে রাখতে হবে যে আমরা এই সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ছিলাম, কারণ আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি গ্রামে কোনো অসুখ আসবে না। যদি সত্যি সত্যি কোনো অসুখ না আসে তখন আমরা এই অহেতুক অর্থ অপচয়ের দায় থেকে মুক্ত থাকবো।
শহর থেকে মেডিকেল টিম আনতে যেহেতু সমগ্র গ্রামবাসীর কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করতে হবে তাই তারা এই রেজুলেশনটির পক্ষে বিপক্ষে কারা আছে তা যাচাইয়ের জন্য একটি গণভোটের আয়োজন করলো। গণভোটেও অধিকাংশ মানুষ রেজুলেশনের পক্ষে ভোট দিল।
দুই বংশের আপত্তি সত্বেও রেজুলেশনটি পাশ হলো এবং তখন গ্রামবাসী বিনা দ্বিধায় গ্রামের তহবিল থেকে বরাদ্দ দিল যাতে শহর থেকে একটি মেডিকেল টিম এনে সমূহ বিপদ মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়। এই গল্পটির মধ্য দিয়ে জুলাই সনদে বিএনপি সহ আরো কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নোট অব ডিসেন্টের কার্যকারিতা বোঝানোর চেষ্টা করলাম। নোট অব ডিসেন্ট হচ্ছে গণতান্ত্রিক পন্থায় হেরে যাওয়ার পরেও পরাজিত কোনো পক্ষের জোরালো (এবং তারা বিশ্বাস করে এটাই সবচেয়ে যৌক্তিক) আপত্তি লিখে রাখা, যাতে ভবিষ্যতে সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত ভুল প্রমানিত হলে জনগণ মনে করতে পারে ওদের আপত্তিটাই ঠিক ছিল। এর বেশি কিছু নয়। নোট অব ডিসেন্টের কোনো আইনী ভিত্তি নেই। বিশেষ করে গণভোটে পাশ হয়ে যাওয়ার পরে তো আর কোনো আইনী ভিত্তি একেবারেই থাকে না।
এখন অনেকে বলছেন সংসদে পাস না হলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক নয়। এটা একেবারেই ভুল কথা। গণভোটে পাস হওয়ার পরে সংসদে পাসের ব্যাপারটি কেবল আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।
এই সংসদ যারা তৈরি করেছে সেই জনগণই গণভোটে তাদের প্রত্যক্ষ রায় দিয়ে জুলাই সনদ পাশ করেছে। যেখানে প্রত্যক্ষ ভোটে পাস হয়ে গেছে সেখানে সাংসদদের ভোটে, যেটি জনগণের পরোক্ষ ভোট, তা দিয়ে পাস করা আর তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, যদিও নিয়ম রক্ষার জন্য এর প্রয়োজন আছে। অনেকে নানান রকম সাংবিধানিক জটিলতার কথা, শর্তের কথা বলছেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদ বা গণপরিষদের শপথের বিরোধিতা করছেন।
সংবিধানের সকল শর্ত মানলে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনও অবৈধ হয়ে যায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অবৈধ হয়ে যায়। আমরা কী তা মানব? আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে, সংবিধান, আইন সবই মানুষের জন্য, মানুষ আইনের জন্য নয়। ২০২৪ এর বর্ষা বিপ্লবে জনতা রায় দিয়েছে কোনটা এদেশের মানুষের জন্য বৈধ, ২০২৬ এর গণভোটের পরে এইসব বিষয় নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন উত্থাপনেরই কোনো সুযোগ নেই।
জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন করার নতুন সরকারের বাধ্যবাধকতা হওয়া উচিত। দলের প্রধান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন এবং তার রাষ্ট্রীয দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন। শপথ নেবার আগেই জুলাই সনদ অনুযায়ী তিনি যদি দলীয় প্রধানের পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করতেন, তাহলে বোঝা যেত যে তিনি নৈতিক দিক থেকে তার ওপর অর্পিথ গুরুদায়িত্ব পালনের জন্য সর্বতোভাবে প্রস্তুত। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংশয় সৃষ্টির সুযোগ দিলে তার রাজনৈতিক অদূরদর্শিতাই প্রকট হয়ে উঠবে।
Posted ১২:৪৯ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh