চৌধুরী মোহাম্মদ কাজল : | বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬
আমরা প্রায়ই গর্ব করে বলি ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। কিন্তু যে ৩০ লক্ষ লোক প্রাণ দিয়েছেন তাদের সাথে আমাদের বেশির ভাগ লোকের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তাদের খোঁজও রাখি না। আমরা হয়ত সাতজন বীরশ্রেষ্ঠর নাম বলতে পারব কিন্তু তাদের বীরগাথা সম্পর্কে কতটুকু জানি।
অধিকাংশ লোকই তাদের যুদ্ধের ইতিহাস জানে না। বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়েছিল তখন বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। এটা মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের নিয়ে না বাদ দিয়ে বলতে পারছি না। আচ্ছা ভারতের জনসংখ্যা তো ছিল আমাদের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। পাকিস্তানের জনসংখ্যাও আমাদের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।
তাদের তো এত রক্ত দিতে হয়নি। আমাদের এত জীবন দিতে হল কেন। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে যা জেনেছি তা হল ভারত ও পাকিস্তানে মোহনদাস গান্ধী ও মোহাম্মদ জিন্নাহর মত বিচক্ষণ ও জনদরদী নেতা ছিলেন। তারা মানুষের জীবনকে মূল্য দিতেন। তারা সশস্ত্র লড়াইয়ের পরিণাম জানতেন। হঠাৎ করে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দিলে কি কঠোর হাতে দমন করা হবে এটা বুঝতেন। জনগণের জীবন বাজি রেখে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে তারা চাননি।
অন্যদিকে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি যতটা দেশের জন্য করেছিলেন তার চেয়ে বেশী করেছিলেন নিজের জন্য। তিনি চেয়েছিলেন সোভিয়েত ব্লকে থেকে বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের ডিক্টেটরশিপ চালু করতে। সেসময় সোভিয়েত ব্লকের অনেক দেশেই কমিউনিস্ট শাসনের নামে ডিক্টেটরশিপ চালু ছিল। শেখ মুজিব ভারতের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। পাকিস্তান ভাঙার অনুপ্ররণা পেয়েছিলেন আগরতলা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে। আগরতলা ষড়যন্ত্র ছিল ভারতের মাস্টার প্ল্যানের অংশ।
তাই তারা শেখ মুজিবকে দুহাতে সহযোগিতা করেছে। তারপরও পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা তিনি চেয়েছিলেন কিনা সন্দেহ আছে। আমার যতদূর মনে হয় তিনি দোটানায় ছিলেন। একদিকে ছিল ভারতের প্রলোভন। অন্যদিকে হতে চেয়েছিলেন অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। দীর্ঘদিন রাজনীতি করার সুবাদে ও বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সংস্পর্শে এসে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার চেয়ে অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া অনেক বেশী মর্যাদাপূর্ণ। তাই তিনি কখনওই স্পষ্টভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা বলেননি। এ ব্যাপারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফরের একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য।
সে সময় বাংলাদেশে (তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে) ছোট ছোট অনেক বামপন্থী দল সক্রিয় ছিল। গণবিচ্ছিন্ন এই সব দলগুলির নিজে থেকে কখনও কিছু করার সামর্থ ছিলনা, কিন্তু এখনকার মত তখনও বড় দলগুলিকে বিভিন্ন বিষয়ে চাপ প্রয়োগ করত। কাজী জাফর বলেছেন তারা যখন শেখ মুজিবকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে বলছিলেন তখন তিনি বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানকে আরও একটা সুযোগ দিতে চাই’। তাই দেখা যায় ২৫ শে মার্চ গ্রেফতার হওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি (যদিও গ্রেফতার হওয়ার আগে তারবার্তার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন বলে আওয়ামী লীগ বিভিন্ন সময় মিথ্যাচার করে এসেছে)।
শেখ মুজিব জানতেন পাকিস্তানের সামরিক সরকার যে তাকে সরকার গঠন করতে দিচ্ছে না তার অন্যতম কারণ পূর্ব পাকিস্তানে তিনি অবিসংবাদিত নেতা হলেও পশ্চিম পাকিস্তানে তার গ্রহনযোগ্যতা একেবারেই ছিল না। সত্তরের নির্বাচনে পুরো পাকিস্তান দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। শেখ মুজিবের পূর্ব পাকিস্তান ও জুলফিকার ভুট্টোর পশ্চিম পাকিস্তান। শেখ মুজিবও হয়ত পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি। তিনি জানতেন সামরিক সরকার একটি গণতান্ত্রিক শক্তিকে বেশীদিন দমিয়ে রাখতে পারে না। এক সময় নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতেই হবে। কিন্তু হঠাৎ মাথামোটা সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে পুরো পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে বিপদের মুখে ঠেলে দিলেন। সেই যে আগুন লেগেছিল পরবর্তী নয় মাস শুধু জ্বলেছিল। প্রান হারিয়েছে শেখ মুজিবের ভাষায় ৩০ লক্ষ মানুষ। কত যে নির্যাতিত ও আহত হয়েছে তার হিসেব নেই।
এরপর আমরা কি পেয়েছি। আমরা পেয়েছি তিন দিক থেকে ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত একটি দুর্বল রাষ্ট্র। আমরা হারিয়েছি আমাদের পশ্চিমাংশের বিশাল ভুখন্ড। আমরা হারিয়েছি করাচি, লাহোর ও ইসলামাবাদ। আমরা রাতারাতি ভারতের ওপর নির্ভরশীল এক জাতিতে পরিণত হয়েছি। আওয়ামী লীগের লোকরাই বলে ভারতের সহযোগিতা ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব। তাই ভারতের সাথে সমঝোতা করে চলতে হবে।
ভারতের সাথে সমঝোতা করে চলার অর্থ ভারতের সামনে নতজানু হয়ে থাকা। ভারত আমাদের পানি নিয়ে নেবে, বর্ষাকালে আবার সেই পানিতে ভাসিয়ে দেবে। আমাদেরকে মেরে কাঁটা তারে ঝুলিয়ে রাখবে, আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করবে আমরা কিছুই করতে পারব না। কারণ, আমরা দুর্বল, আমরা একা। আমাদের পূর্বে ভারত, উত্তরে ভারত, পশ্চিমেও ভারত। ভারত যেমন পাকস্তানের পূর্বাংশ কেটে দিয়ে দক্ষিন এশিয়ার পূর্বাঞ্চলে নিজেদের কতৃত্ব নিশ্চিত করেছে আমরাও তেমনি ভারতের পূর্বাংশ বিচ্ছিন্ন না হওয়া পর্যন্ত ভারতের নাগপাশ থেকে বের হতে পারব না। এজন্য হয়ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে যুগের পর যুগ। লেগে যেতে পারে কয়েক দশক, হয়ত কয়েক শতক। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি পৃথিবীর মানচিত্রে পরিবর্তন একদিন আসবেই। আমরা নিশ্চয়ই চিরকাল অন্যের দ্বারা নিগৃহীত হতে থাকব না।
Posted ১:৫০ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh