কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫
উত্তরাধুনিকতা শব্দের মধ্যে যে অর্থ নিহিত, মূলত তা এই শব্দটিকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করে না। নব্বুইয়ের দশকে বাংলাদেশের একদল তরুণ কবি বুঝে কিংবা না বুঝে উত্তরাধুনিকতা শব্দটি নিয়ে খুব মেতেছিল। আমি নিজেও তখন এর প্রকৃত অর্থ বুঝতাম না।
একদিন কবি আল মাহমুদকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, শেকড়ে ফেরার নামই কি উত্তরাধুনিকতা? তিনি হ্যাঁ এবং না এর মাঝামাঝি একটি উত্তর দিলেও হ্যাঁ – এর পাল্লাই ভারী ছিল। অনেক দিন পরে কবি শহীদ কাদরীর কাছেও জানতে চেয়েছিলাম, তিনি বলেছিলেন, এগুলো হচ্ছে অধ্যাপকদের কাজ, কিছু কবিতা বিশ্লেষণ করে একেকটা মতবাদের জন্ম দেয়। এইসব মতবাদ নিয়ে মাথা ঘামানো কবির কাজ নয়, কবির কাজ হচ্ছে কবিতা লেখা। তবে তিনি তার মত করে একটা ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন। কলকাতার মুসলিম অধ্যুষিত পার্ক সার্কাস এলাকায় জন্ম ও শৈশব কাটানো শহীদ কাদরী দেখেছেন বাঙালিদের ভেতরে একটা মুসলিম বাঙালি সংস্কৃতির অস্তিত্ব। দেশভাগের পরে ঢাকায় এসে সেই সংস্কৃতির আবহে জন্ম নেয় তার কবিত্বশক্তি। এটিকে অস্বীকার করে যে আধুনিকতা আজকের বাঙালিরা তৈরি করতে চাচ্ছে তাকে প্রত্যাখ্যান করাই উত্তরাধুনিকতা।
আক্ষরিক অর্থটা হচ্ছে আধুনিকতার পরে উত্তরাধুনিকতা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আধুনিকতার কি কোনো পর আছে? আজ থেকে এক হাজার বছর পরে বাঙালিরা যে কবিতা লিখবে, গান লিখবে, গান গাইবে সেগুলো কি সেই সময়ের আধুনিক গান, কবিতা বলেই বিবেচিত হবে না? রবীন্দ্রনাথ কি তার কালের সবচেয়ে আধুনিক কবি ছিলেন না? ইউরোপ ফেরত মাইকেল মধুসূদনের চেয়ে আর কে আধুনিক কবি ছিলেন তার কালে? কিন্তু ত্রিশের জীবনানন্দ দাশেরা মাইকেল, রবীন্দ্রনাথকে অনাধুনিক ঘোষণা করে তারাই হয়ে উঠলেন আধুনিক। কই জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তীরা তো বলেননি আমরা উত্তরাধুনিক।
ক্রিয়াপদকে চলিত ফর্মে এনে, কখনো অন্তান্যুপ্রাস বর্জন করে তারা হয়ে উঠলেন আধুনিক কবি। আবার আশির দশকের কবিরা বলতে শুরু করলেন, জীবনানন্দ দাশ উপমা ব্যবহারের ক্ষেত্রে এতো বেশি “মতো” ব্যবহার করেছেন যা একজন আধুনিক কবি করতে পারেন না। তারা কবিতা থেকে “মতো” তুলে দেবার আন্দোলনে নামলেন এবং এটিই কবিতার আধুনিক ফর্ম বলে ঘোষণা করলেন।
আমার কাছে একদিন মনে হলো কবিতায় পাঠকের চিন্তার জায়গাটা আরো বিস্তৃত হওয়া দরকার। আধুনিক মানুষ জীবনকে, পৃথিবীকে কত বিচিত্রভাবেই না দেখতে চায়, দেখতে পারে। একজন কবি তার নিজের ভাবনায় পাঠককে কেন আটকে রাখবেন। কবি পাঠকের নিস্তরঙ্গ জলাশয়ে একটি ঢিল ছুঁড়ে কেবল ঢেউ তুলে দেবেন। সেই ঢেউয়ে দুলতে দুলতে পাঠকের ভাবনা পৌঁছে যাবে পৃথিবীর বিচিত্র বন্দরে। এই কাজটি সবচেয়ে ভালোভাবে করা যায় কবিতা থেকে ক্রিয়াপদ তুলে দিয়ে। কবিতার বিষয় কোনো নির্দিষ্ট কাল বা পাত্রে বন্দি না থাকুক, কবিতা হোক মুক্ত। লিখতে শুরু করলাম “ক্রিয়াপদহীন কবিতা”।
তখন মনে হলো এটিই আধুনিক কবিতা। এইভাবে প্রতি প্রজন্মের হাতেই বদলে যায় আধুনিকতা। প্রতিটি মানুষই তার কালে আধুনিক, যদি তিনি সমকালে সাদরে গৃহীত হন। এখন আমি যদি চল্লিশের দশকের স্টাইলে পোশাক পরি, জুতো পরি, খাবার পরিবেশন করি আমাকে একাল গ্রহণ করবে না, লোকে আমাকে পুরনো চিন্তার মানুষ বলবে। তবে অতীতের কোনো একটি বিষয়কে তুলে এনে আমি যদি একালের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারি, সেটা আবার আধুনিকতার অনুষঙ্গ হয়ে উঠবে। পুরনোকে, যা আমাদের সভ্যতার ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে, তুলে এনে আধুনিকতার সঙ্গে মিশেল দিয়ে তাকে গ্রহণযোগ্য করে তুললেই কি উত্তরাধুনিক হবে?
যেমন আল মাহমুদ প্রচুর লোকজ শব্দ কবিতায় প্রয়োগ করেছেন। তাহলে কী আল মাহমুদ উত্তরাধুনিক কবি? উত্তর হচ্ছে, না, আল মাহমুদ উত্তর আধুনিক কবি নন। আমাদের মনে রাখতে হবে উত্তরাধুনিকতা হচ্ছে একটি আন্দোলন। প্রতিটি দিন তার নিজের মতো করে আধুনিকতা তৈরি করে। এই আধুনিকতা মানুষের জন্য বিপুল কল্যাণ নিয়ে আসে। আধুনিকতা মানুষের হাতে নতুন নতুন আবিস্কার তুলে দেয়, তাকে নতুন বাসস্থান দেয়, নতুন প্রযুক্তি দেয়, নতুন বাহন, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস দেয়। আজকের পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো আধুনিকতা হচ্ছে ভার্চুয়াল মিডিয়া। কেউ যদি এখন ভার্চুয়াল মিডিয়া ব্যবহার করতে না জানে আমরা তাকে অনাধুনিক বলি। দশ/পনের বছর আগে কেউ কম্পিউটার চালাতে না পারলে আমরা তাকে অনাধুনিক বলতাম। সভ্যতার অগ্রগতির যে স্রোতধারা এই স্রোতের সঙ্গে ভেসে যাবার সক্ষমতা অর্জন করাই হচ্ছে আধুনিক জীবন যাপন।
এখন কথা হচ্ছে আধুনিকতার পুরোটাই কি কল্যাণকর? এই যে স্মার্ট ফোন, যা আমাদের একটি ভার্চুয়াল জগতে নিমগ্ন রাখে, এই নিমগ্নতার মধ্যে কি অকল্যাণের কিছু নেই? কেউ কেউ আধুনিকতার উত্তরণকে পুরোপুরি কিংবা আংশিক অস্বীকার করেন। তারা প্রত্যাখ্যান করেন শিল্প বিপ্লব, তারা প্রত্যাখ্যান করেন বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা, তারা প্রত্যাখ্যান করেন উপনিবেশিকতা, প্রত্যাখ্যান করেন স্মার্ট ফোন, ভার্চুয়াল মিডিয়া, বিদ্যুতের ব্যবহার আরো অনেক কিছু। প্রত্যাখ্যান করে তারা নিজেদের মত একটা কিছু করতে চান, বলতে চান। এই করতে চাওয়া কিংবা বলতে চাওয়াটাই হচ্ছে উত্তরাধুনিকতা। এর কিছু সমাজ গ্রহণ করে, কিছু করে না। মনে রাখতে হবে উত্তরাধুনিকতা হচ্ছে আধুনিকতাকে প্রত্যাখ্যান করা, আংশিক বা পুরোপুরি। অর্থাৎ এটি একটি আন্দোলন। একটি প্রতিবাদ।
এবং তা একটি চলমান প্রক্রিয়া। উত্তরাধুনিকতা আধুনিকতার সঙ্গেই গড়িয়ে গড়িয়ে চলে। ধরুণ আধুনিকতা হচ্ছে একটি মাটির বল, কালের স্রোতে গড়িয়ে গড়িয়ে এগুচ্ছে। যেতে যেতে পাথরে, পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে, বৃষ্টিতে, ঝড়ে, জলোচ্ছাসে, ভূমিকম্পে কিংবা হিংস্র জীব-জন্তুর আঘাতে এর কিছু অংশ খসে পড়ছে, আবার গড়াতে গড়াতে নানান কিছু এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। মাটির বলটি হচ্ছে আধুনিকতা। এর ভেঙে পড়া বা খসে পড়া অংশগুলো হচ্ছে উত্তরাধুনিকতা এবং নতুন যুক্ত হওয়া অংশগুলোর একটি বড়ো অংশ হচ্ছে নতুন নতুন সব আবিস্কার এবং একটি ক্ষুদ্র অংশ হচ্ছে অতীতের উত্তরাধুনিকতা, যা বর্তমানের আধুনিকতা মেনে নিয়েছে অর্থাৎ মীমাংসিত উত্তরাধুনিকতা।
বিষয়টি আসলে হেগেলের বিখ্যাত দার্শনিক মতবাদ – থিসিস, এন্টি থিসিস এবং সিন্থেসিসের মত। এখানে থিসিস হচ্ছে আধুনিকতা, এন্টি থিসিস হচ্ছে উত্তরাধুনিকতা এবং সিন্থেসিস হচ্ছে নতুন সময়ের আধুনিকতা। এই নতুন আধুনিকতা নতুন কেবল অতীতের মানুষের জন্য, অর্থাৎ এটি হচ্ছে ভবিষ্যতের অবস্থা। কিন্তু ভবিষ্যতের মানুষের জন্য, যাদের কাছে তা বর্তমান, এটি শুধুই আধুনিকতা। সিন্থেসিস নতুন বর্তমানে থিসিস হয়ে যায়, সেই থিসিসের সমালোচনা হয়, অর্থাৎ এন্টিথিসিস তৈরি হয় এবং এক পর্যায়ে এন্টি থিসিস থেকে মীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে নতুন সিন্থেসিস হয়। এভাবে উল্লেখিত মাটির বলের মত সভ্যতা সময়ের রাস্তায় গড়াতেই থাকে।
উত্তরাধুনিকতা শব্দটি হয়ত আমরা আজ শিখেছি কিছু এই ধারণা সব কালেই ছিল। যারা ইউরোপের শিল্প বিপ্লব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তারা সেই কালের উত্তরাধুনিক চিন্তার মানুষ ছিলেন। যারা দাদাবাদী কবি ছিলেন, বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রাকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, বিজ্ঞান পৃথিবীকে ধ্বংস করবে, তারাই সেকালের উত্তরাধুনিক কবি ছিলেন। যারা অ্যামিশ সম্প্রদায়ের মানুষ, বিজ্ঞানের ফসল বিদ্যুৎ, গ্যাস, টেলিভিশন, ফ্রিজ ইত্যাদি ব্যবহার করেন না, এখনো হাস-মুরগি পালন করেন, কাঠের লাঙ্গলে চাষ করেন, একটি খুব সাধারণ ও প্রাকৃতিক জীবন যাপন করেন, তারা উত্তরাধুনিক মানুষ। কারণ বিজ্ঞানকে অস্বীকার করে জীবন যাপন করা তাদের একটি প্রতিবাদ। এই প্রতিবাদ পরিবেশ বান্ধব, কল্যাণকর।
উত্তরাধুনিকতার ধারণা আবার দেশে দেশে, সমাজে সমাজে ভিন্ন। ইউরোপে, আমেরিকায় যখন কাজ করার জন্য কৃতদাস রাখা হত তখন এই দাসপ্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলনই ছিল উত্তরাধুনিকতা। এক সময়ে, সত্তরের এবং আশির দশকে সমকামিতা, বহুজাতিক মানুষের সহাবস্থান, অভিবাসীদের প্রতি সহানুভূতি এইসব বিষয়গুলো আমেরিকায় উত্তরাধুনিকতা বলে বিবেচিত হত।
বাংলাদেশের কবিতায় উত্তরাধুনিকতা কী? বোধ করি এই রচনা পাঠ করতে করতে পাঠকের মধ্যে এই আগ্রহটি তৈরি হয়েছে এবং আমার প্রত্যাশার জায়গাটি হচ্ছে আপনি ইতোমধ্যেই আপনার নিজের মত করে বাংলা কবিতায় উত্তরাধুনিকতার ধারণাটি বুঝতে পেরেছেন। আমার উচিত হবে রচনাটি এখানেই শেষ করা এবং আপনাদের ভাবনাগুলো জানার জন্য প্রতীক্ষায় থাকা। কিন্তু আমি তা করছি না এজন্য যে আমি আমার দায়িত্বটিও শেষ করতে চাই।
উত্তরাধুনিক কবি হয়ে উঠতে গেলে প্রথমেই আধুনিক কবিতা কী তা ভালো করে বুঝতে হবে। আধুনিক কবিতাকে তিনটি ভিউপয়েন্ট থেকে বিশ্লেষণ করতে হবে। ভাষা, আঙ্গিক এবং বিষয়বস্তু। এরপর তিনটিকেই অথবা কোনো একটিকে প্রত্যাখ্যান করে উত্তরাধুনিক ভাষা, আঙ্গিক বা বিষয়বস্তু উপহার দিতে হবে। এতে করে উত্তরাধুনিকতার একটি সামগ্রিক অবয়ব নির্মিত হবে। কিন্তু প্রকৃত আন্দোলনের কাজটি হয়ত হবে না। “শিল্পের জন্য শিল্প না কী জীবনের জন্য শিল্প” – এই বিতর্ক বহুকাল ধরে চলেছে এবং শেষ পর্যন্ত “জীবনের জন্য শিল্প” এই বোধেরই বিজয় হয়েছে। তাই আমি মনে করি বিষয়বস্তু নির্বাচনের ক্ষেত্রে উত্তরাধুনিক কবিদের এই চিন্তাটি মাথায় রেখে এগুতে হবে। আধুনিক কবিরা কি জীবনের এমন কোনো গূঢ় রহস্যকে তাদের কবিতায় ধরতে পারছেন না? অথবা জেনে-বুঝে উপেক্ষা করছেন? কিংবা তারা কি এমন কিছু বিষয় নিয়ে মেতে আছেন যা জীবনের কোনো একটা বোধকে স্পর্শ করতে পারছে না? যদি এর কোনো উত্তর না থাকে তাহলে উত্তরাধুনিক কবিতার দরকার নেই। আধুনিক কবিতার ভাষা কিংবা আঙ্গিক প্রত্যাখ্যান করে আপনি কি নতুন কোনো ভাষা বা আঙ্গিক উপহার দিতে চান বা পারবেন? সেটা হয়ত কেউ গ্রহণ করবে না, তাতে কিছু আসে যায় না। মনে রাখতে হবে উত্তরাধুনিক কবিরা এমন কিছু নিয়ে আসবেন যা আজকের আধুনিক পৃথিবী গ্রহণ করতে চাইবে না কিন্তু ভবিষ্যতের পৃথিবী তার কিছুটা হলেও গ্রহণ করবে। সেই দিক থেকে উত্তরাধুনিক কবিকে আধুনিক চিন্তার কবিদের চেয়ে অনেক বেশি দূরদৃষ্টি সম্পন্ন হতে হবে।
আমাদের স্বাভাবিক মস্তিস্ক আধুনিকতা প্রত্যাখ্যান করার অর্থ করে প্রাচীনের প্রতিস্থাপন। তাই বাংলা ভাষায় যারা উত্তরাধুনিকতার কথা বলেন, তারা প্রায়শই ঔপনিবেশিক আধুনিকতাকে পরিহার করার কথা বলেন। ভাষার ক্ষেত্রে তারা দেশি শব্দের দ্বারস্থ হন, মধ্যযুগের সাহিত্য থেকে বিষয় আহরণ করেন। এটি হয়ত আধুনিকতাকে চ্যালেঞ্জ করার একটা উপায়, তবে মেধাবীরা এর বাইরে গিয়েও অন্য কিছু বের করে আনতে পারেন। তবে আমার পরামর্শ হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত “মানুষের জন্য শিল্প” এই কথাটি যেন আমরা ভুলে না যাই।
Posted ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh