চৌধুরী মোহাম্মদ কাজল : | বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
শেখ হাসিনার পতন হল কেন? উন্নয়নতো কম হয়নি শেখ হাসিনার সময়। প্রচুর রাস্তা ঘাট, ফ্লাই ওভার হয়েছে। আইয়ুব খানের পর শেখ হাসিনার সময়ই বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশী উন্নয়ন হয়েছে। পদ্মা ব্রিজ ছিল স্বপ্নেরও অতীত। শেখ হাসিনার সময় এটা হয়েছে। যতই বলা হোক ভারতকে ট্রানজিট দেওয়ার জন্য হয়েছে বিশ্ব ব্যাংককে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে যেভাবে পদ্মা সেতু হয়েছে এটা একটা বিষ্ময়। এর আগে যমুনা ব্রিজও শেখ হাসিনার সময়ই হয়েছে। যমুনা ব্রিজ তৈরীর মূল কাজটি করে গিয়েছিলেন হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। এরপর হঠাৎ ১৯৯০ সালের গনঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতনের পর খালেদা জিয়া পরবর্তী চার বছর শুধু ভেরেন্ডা ভেজেছেন। এরপর শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসেই যমুনা ব্রিজের কাজটি সমাপ্ত করেন।
শেখ হাসিনার সময় মোবাইল ফোন দেশে সহজলভ্য হয়েছে। এর আগে সিটিসেলকে মানোপলি ব্যবসা করার সুযোগ দিয়েছিল বিএনপি। এরপর শেখ হাসিনার সময় মোবাইল ফোন সাধারন মানুষের নাগালে আসে। এছাড়া বঙ্গবন্ধু টানেল, রূপপুর পারমানবিক কেন্দ্র (যদিও এর আদৌ দরকার ছিল কি না এ নিয়ে বিতর্ক আছে), কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এসব কিছুই শেখ হাসিনার সময় হয়েছে। কিন্তু তারপরও তাকে এভাবে বিদায় নিতে হল কেন? এর পেছনে অন্যতম কারণগুলি হচ্ছে তিনি সবকিছুতেই দলীয় করন ও পারিবারিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
সবকিছুতেই তার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে আসতেন। একাত্তরের সাফল্যকে নিজেদের একক সাফল্য বলে দাবী করতেন। শেখ মুজিব যেমন ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা। তেমনি স্বাধীনতা পরবর্তী তার দুর্বল ও দুঃশাসন তাকে জনগনের একটি বিরাট অংশের কাছে বিরাগভাজন করে তুলেছিল। শেখ হাসিনা এটা বুঝতে চানটি। সবকিছুকেই তিনি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বলে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেস্টা করতেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী বিরোধীদের অবদানকে একেবারেই স্বীকৃতি দিতে চাননি। জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তাকে উপলব্ধি করতে পারেননি। উপরন্ত বিভিন্ন সময়ে জিয়াউর রহমান সম্পর্কে উদ্ভট ও অহেতুক মন্তব্য করে প্রকারান্তরে নিজেরই ক্ষতি করেছেন।
শেখ হাসিনা জনগনের ওপর আস্থা না রেখে আস্থা রেখেছিলেন বিদেশী শক্তির ওপর বিশেষ করে ভারতের ওপর। তিনি ভারতের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত অনুগত ছিলেন যা দেশের মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। ভারতকে সন্তষ্ট করতে গিয়ে অনেক সময় তিনি দেশের স্বার্থকেও জলাঞ্জলি দিয়েছেন। তিনি ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র প্রতিবাদ করেননি। তিনি ভারতকে তুষ্ট করতে গিয়ে সেনা কর্মকর্তাদের জেলে পাঠিয়েছেন এবং জামাত নেতাদের ফাঁসি দিয়েছেন।
স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর অস্পস্ট সাক্ষ্য প্রমানের ভিত্তিতে বিতর্কিত বিচার করে তিনি নিজের পতন ডেকে এনেছেন। তিনি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারেননি। তিনি জাতিকে বিভক্ত করে ফেলেছিলেন। জামাত নেতাদের মৃত্যুদন্ড কার্যকরের মাধ্যমে তিনি দেশে প্রতিহিংসার রাজনীতিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। মূলত তখনই বোঝা গিয়েছিল ক্ষমতা হারালে শেখ হাসিনা (এবং আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ) আর দেশে থাকতে পারবেন না। এর আগে বিরোধী দলের নেতাদের বড়জোড় গ্রেফতার করা হত। শেখ হাসিনা বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের ফাসি দেওয়ার নতুন ট্র্যডিশন চালু করেন। এখন আর ভুয়া মামলা দিয়ে জেলে পাঠানো নয়, বিরোধী নেতাদের প্রয়োজনে ফাসি দেওয়া হবে। উদাহরন স্বরূপ শেখ হাসিনা নিজেই এখন ফাসির দন্ডপ্রাপ্ত আসামী হয়ে বিদেশে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তার জীবদ্দশায় বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন বলে মনে হয় না।
শেখ হাসিনার আরেকটি বড় ভুল ছিল সবকিছুতেই মুক্তিযুদ্ধকে টেনে আনা। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সরকারী চাকুরীতে কোটা দিয়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের ছেলেমেয়েদের দিয়েছেন। প্রচুর ঘুষের সুযোগ ও জবাবদিহিতা না থাকায় বাংলাদেশে সরকারী চাকুরী বাংলাদেশে অত্যন্ত লোভনীয় একটি জিনিস। শেখ হাসিনা এই সুযোগটা মুক্তিযোদ্ধাদের বংশধরদের নাম করে আওয়ামী লীগের মধ্যে রেখে দিতে চেয়েছিলেন। যার ফলে লোকজন মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর বিরক্ত হয়ে ওঠে। পরিনামে প্রকাশ্যে ‘আমি কে, তুমি কে, রাজাকার রাজাকার’ স্লোগান দিতে দেখা যায়। এরকম স্লোগান এরশাদের আমলেও কেউ দিতে সাহস পায়নি।
শেখ হাসিনার আরেকটি সমস্যা তার মধ্যে সংযমের অভাব ছিল। কখন ব্রেক করতে হয় তিনি জানতেন না। দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও তার কি দরকার ছিল এভাবে ক্ষমতা আকড়ে থাকার। মানুষের প্রকৃতি হচ্ছে মানুষ পরিবর্তন চায়। কেউ যতই ভালো করুক একটা সময়ে মানুষ নতুন নেতৃত্ব বা শাসন ক্ষমতায় পরিবর্তন চায়। শেখ হাসিনা যখন দেখলেন আন্দোলন নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছে তখন সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে যাওয়া ছিল তার সবচেয়ে বড় ভুল। তার মত ৭৫ বছরের এক বৃদ্ধার কি প্রয়োজন ছিল নাতির বয়সী ছেলেমেয়েদের বিরুদ্ধে এতটা কঠোর হওয়ার। তিনি যখন দেখলেন পাখির মত মানুষ মারা যাচ্ছে তখনও তার হুশ হয়নি। এ প্রসঙ্গে মাও সে তুং এর এক স্ত্রী একবার বলেছিলেন ’যৌনানন্দ প্রথম যৌবনের ব্যাপার, কিন্তু ক্ষমতার লোভ চীর জীবনের’।
শেখ হাসিনাও সেরকমই ক্ষমতার লোভ নিয়ন্ত্রন করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তার মাসুল তাকে দিতে হয়েছে, এবং এখনও দিচ্ছেন।
পরিশেষে, ভবিষ্যতে যারা রাস্ট্র ক্ষমতায় আসবেন বা বর্তমানে যারা ক্ষমতায় আছেন তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই ক্ষমতায় থাকতে হলে কাজ করতে হবে। জনগনের আশা আকাক্সক্ষার প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। বিদেশী শক্তি নয়, জনগনের ওপর আস্থা রাখতে হবে। বিদেশী শক্তি হয়ত কখনও কখনও ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য সহায়ক হয়, কিন্তু জনগনের আশা আকাঙ্খা বুঝতে না পারলে এবং সেই অনুযায়ী কাজ না করলে পরিণাম হবে ধ্বংসাত্মক। ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী মনে করবেন না, এবং চিরস্থায়ী করার চেস্টাও করবেন না। যতই ভাল কাজ করুন এক সময় সরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। জনগনের ঘাড়ের ওপর বেশী দিন বোঝা হয়ে থাকবেন না। তাহলে এক সময় জনগন ঘাড় থেকে নামিয়ে ঘাড় ধাক্বা দিয়ে এবং সেই সাথে পশ্চাৎদেশে পদাঘাত করে বের করে দেবে। তখন শেখ হাসিনার মত সব হারিয়ে দেশে দেশে ঘুরতে হবে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্ট্যাটেন আইল্যান্ড লায়ন ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক।
Posted ১:০৬ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh