চৌধুরী মোহাম্মদ কাজল : | বৃহস্পতিবার, ১২ জুন ২০২৫
গত আগস্টে মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। এই সময়ে সাধারন জনগনের মনে স্বাধীনতার চেতনার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। বাংলাদেশ যে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাস্ট্র, ভারতের অনুগত তাবেদার রাস্ট্র নয় এটা জনগন বুঝতে শিখেছে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে এই উপলব্ধিটা প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল। শুধু তাই নয় শেখ হাসিনা তার ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশকে একটি অটিস্টিক রাস্ট্রে পরিণত করেছিলেন। জনমনে একটি ধারনা বদ্ধমূল হয়েছিল যে ভারতকে ছাড়া বাংলাদেশ চলতে পারবে না। ভারত থেকে পেয়াজ আনতে হবে, আলু আনতে হবে।
অন্যান্য খাদ্য সামগ্রী ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের জন্য আমাদের ভারত ছাড়া উপায় নেই। চিকিৎসার জন্য তো ভারতে বিকল্প নেই। অনেকে বিয়ের কেনাকাটার জন্যও ভারতকে অপরিহার্য মনে করতেন। এখন ভারত থেকে আলু, পেয়াজ আসছে না। বাংলাদেশে কি খাদ্য দ্রব্যের আকাল পড়েছে। লোকজন চিকিৎসার জন্য ভারত যাচ্ছে না। বাংলাদেশে কি মহামারী লেগে গেছে। মৃত্যুহার কি বেড়ে গেছে। যতটুকু জানতে পেরেছি এবার রমজান মাসেও দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই ছিল। বিগত বছরগুলির মত আকাশচুম্বী ছিল না। লোড শেডিংও সহনীয় পর্যায়ে ছিল। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে এতটা উন্নতি কি করে সম্ভব হল। এজন্য তত্ববধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুসকে কৃতিত্ব দিতেই হয়।
ভারতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারাটা মুহাম্মদ ইউনুসের একটি অভাবনীয় সাফল্য। কিন্তু তিনি যেটা করতে পারেননি সেটা হল আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। তার সময়ে দেশে আইন শৃঙ্খলার ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। এক জন লোককে পেটপুরে খাওয়ালেই হয় না তাকে নিরাপদে ও সসম্মানে চলাফেরার নিশ্চয়তাও দিতে হয়।
বর্তমান সরকারের সময়ে গনপিটুনি, খুনোখুনি ও চাদাবাজি অনেক বেড়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ছাত্রলীগের কাজটা করে যাচ্ছে। এই সময়ে সন্ত্রাসের আরও একটি দিক মোটামুটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে গেছে। সেটা হচ্ছে গ্রেফতারকৃত ব্যাক্তিকে আদালতের ভেতরে গিয়ে হামলা করা। শুধু সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন আহমেদ মানিকই নন, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সহ অনেককে আদালত প্রাঙ্গনে পুলিশের উপস্থিতিতে শারিরিক ভাব লাঞ্ছিত হয়েছেন। সরকার সমর্থত এসব গুন্ডা পান্ডাদের ব্যাপারে মুহাম্মদ ইউনুসকে খুব একটা উদ্বিগ্ন হতে দেখা যায়নি। কেউ গ্রেফতার হয়েছে বলেও শুনিনি।
এটা সরকারের একটি অনৈতিক ব্যর্থতা। ভারত থেকে গরু না এলেও এবারের ঈদে আগের মত গবাদী পশুর মূল্য বৃদ্ধি ঘটেনি। পরিবহনের ভাড়াও নিয়ন্ত্রনে ছিল। কিন্তু এটা নিয়ন্ত্রনে রাখতে গিয়ে সেনাবাহিনী দিয়ে পরিবহন কর্মীদের ওপর যে নির্মম আচরন করা হয়েছে এটা কতটুকু সঙ্গত ছিল? একবার এক টক শো’তে প্রয়াত সাংবাদিক মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহকে সিঙ্গাপুরের উন্নয়ন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন মাত্র কয়েক দশকে সিঙ্গাপুর যে উন্নতি করেছে এটা অভাবনীয়, কিন্তু সিঙ্গাপুর যে পদ্ধতিতে উন্নতি করেছে আমরা সে পদ্ধতি অনুসরন করব কিনা এটা একটা প্রশ্নসাপেক্ষ ব্যাপার। সিঙ্গাপুরের অভ্যন্তরীন বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রন করার সময় লী কুয়ান ইউ যে কঠোরতা অবলম্বন করেছিলেন তার সাথে কিম জং উনের দূরত্ব খুব বেশী ছিল না।
সিঙ্গাপুরে এখনও সৌদী আরবের মত অপরাধীদের কাপড় খুলে পশ্চাৎদেশে দোররা মারা হয়। বাংলাদেশে এ প্রচলন নেই। তারপরও সেনাবাহিনী বেশী ভাড়া রাখার অজুহাতে পরিবহন কর্মীদের পশ্চাৎদেশে যেভাবে লাঠিপেটা করেছে এবং সেই ছবি ফেসবুকে ছেড়ে দিয়েছে এটা কতটুকু সঙ্গত। কি বললেন? ওরা অন্যায় করেছে? অন্যায় কে না করেছে? গত বছর পাচ আগস্টের পর বাংলাদেশ কি সুইজারল্যান্ড হয়ে গেছে?
বাংলাদেশের সব শয়তান সাধু হয়ে গেছে? কেউ চুরি করেনা? কেউ মানি লন্ডারিং করেনা? সবাই ঘুষ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে? আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নেই? লাল ফিতার দৌরাত্ম্য নেই? সেনাবাহিনী কি তাদের ধরছে? বাস ভাড়া বৃদ্ধির ব্যাপারটা বাসের হেলপার বা কন্ডাকটরদের ওপর নির্ভর করে না। এটা সম্পূর্ন মালিকদের সিদ্ধান্ত। এটা মুহাম্মদ ইউনুস ভাল করেই জানেন। পরিবহন মালিকরা ব্যবসায়ী। ইউনুস নিজেও ব্যবসায়ী। তিনি হয়ত আরেকজন ব্যবসায়ীর সম্মানহানি করতে চাননি। তাই স্টিম রোলারটা শুধু পরিবহন জগতের নন্দঘোষ হেলপার আর কন্ডাকটরদের ওপর দিয়েই গেছে। ব্যারাক থেকে বের করে এনে সেনাবাহিনীর অর্ধশিক্ষিত নায়েক, হাবিলদারদের ম্যাজিস্ট্রেসি (?) পাওয়ার দেওয়া হয়েছে। তারা যা ইচছা তাই করেছে। প্রত্যেক মানুষের একটা আত্ম সম্মানবোধ আছে।
সেনাবাহিনীর সিপাইদের এটা বোঝার কথা না। মুহাম্মদ ইউনুসকে বুঝতে হবে আমরা কিম জং উনের দেশে বাস করছি না। তাই বলছি – শুনুন ইউনুস ভাই, আপনি এখন গ্রামীন ব্যাংক পরিচালনা করছেন না। আপনি একটি রাস্ট্র পরিচালনা করছেন। আপনাকে সবার অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। ধনী গরীব, ছোট বড় দেখলে চলবে না। সেনাবাহিনীকে নিজের হাতে আইন তুলে নিতে দেওয়া যাবে না। অপরাধ করলে অপরাধী আইন অনুযায়ী শাস্তি পাবে। কিন্তু আইন বহির্ভূতভাবে কাউকে অসম্মান করা যাবে না।
প্রত্যেকটা ব্যাক্তিরই আত্ম মর্যাদা আছে। এখানে কাউকে আঘাত করা যাবে না। মানুষের আত্ম মর্যাদার ব্যাপারটি এক সময়ের সুদের ব্যবসায়ী, পরবর্তীতে নোবেল শান্তি পুরস্কার সহ অনেক আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত ও বাংলাদেশের বর্তমান সরকার প্রধান সদা হাস্যময় অশীতিপর প্রফেসর ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুস কতটুকু উপলব্ধি করতে পারেন কে জানে।
Posted ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১২ জুন ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh