চৌধুরী মোহাম্মদ কাজল : | বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২৫
বাংলাদেশে হওয়া উচিত রাস্ট্রপতি শাসিত সরকার। রাস্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন রাস্ট্রপতি শাসিত সরকারের চেয়ে প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার বা সংসদীয় সরকার অনেক বেশী গনপ্রতিনিধিত্বশীল। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি এমন নয়। হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদের পদত্যাগের পর গত ৩০ বছরে আমরা দেখেছি সংসদীয় পদ্ধতির সরকার হওয়া সত্ত্বেও রাস্ট্রের পূর্ণ ক্ষমতা এক ব্যাক্তির ওপরই ন্যাস্ত ছিল। সরকার প্রধান হয়ে ওঠেছিলেন মহাশক্তিধর। তাদের ইচ্ছাই ছিল শেষ কথা। মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যদের ইচ্ছা অনিচ্ছা প্রকাশ করার কোন স্বাধীনতাই ছিল না। সংসদ সদস্যদের হাত পা কেটে দিয়ে ভেড়া বানিয়ে রাখা হয়েছিল। তাদের দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়া বা কথা বলার স্বাধীনতা ছিলনা। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয়ে যায়।
এ রকম পরিস্থিতিতে সংসদীয় পদ্ধতি হলেই কি আর রাস্ট্রপতি শাসিত হলেই কি। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল এক ব্যাক্তির হাতে। অন্যদিকে যুক্তরাস্ট্র রাস্ট্রপতি শাসিত রাস্ট্র হলেও এখানে সংসদের ক্ষমতা আছে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত আটকে দেওয়ার। আর সংসদ সদস্যদের নিজদলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। তারা সংসদে শুধু হাত তোলা ও নামানোর জন্য যান না। তারা দেশ ও জনগন নিয়ে ভাবেন। তারা আইন প্রণয়ন নিয়ে পড়াশোনা করেন। সংসদে নিজযুক্তিতে স্বাধীণভাবে ভোট দিতে পারেন, কথা বলতে পারেন। তাই বাংলাদেশে রাস্ট্রপতি শাসিত সরকার প্রবর্তন করা দরকার। রাস্ট্রপতি সরাসরি জনগনের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবেন। তাহলে জনগনের কাছে তার দায়বদ্ধতা থাকবে। রাস্ট্রপতির মেয়াদকাল হবে আমেরিকার মত চার বছর। এর কারন বাংলাদেশীদের ধৈর্য কম। পাচ বছর সময়টাকে তাদের কাছে অনেক বেশী মনে হয়। তারা অধৈর্য হয়ে পড়ে ও মেয়াদ পূর্তির আগেই সরকার পতনের আন্দোলনে নেমে পড়ে। তখন দেশে এক ভয়াবহ অরাজক পরিস্থিতির সৃস্টি হয়।
নব্বইয়ে গনআন্দোলনে এরশাদের পতনের পর আমরা শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মধ্যে এক বিরল ঐক্য দেখেছিলাম। তারা কেউই এককভাবে এরশাদের বিরুদ্ধে রাস্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে সাহসী হচ্ছিলেন না। তখন বিএনপি তাদের রাস্ট্রপতি শাসিত সরকারের নীতি থেকে সরে এসে দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার চালু করার জন্য আওয়ামী লীগের সাথে একমত হয়। এরপর এই দুটি দল রাস্ট্রপতি পদটিকে ভাড়ের পর্যায়ে নামিয়ে আনে। যতসব অথর্ব ও মেয়াদউত্তীর্ণ লোকগুলিকে রাস্ট্রপতি পদে বসিয়ে তাদের দিয়ে নিজেদের কাজ গুলি করিয়ে নিয়েছে। তাদের একটি অন্যতম কাজ ছিল মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত খুনের আসামীদের সাজা মওকুফ করে দেওয়া। রাস্ট্রপতি তাদের ক্ষমা করে দিতেন। প্রধানমন্ত্রী বলতেন রাস্ট্রপতি ক্ষমা করেছে। রাস্ট্রপতি বলতেন আমরা তো ক্ষমতা নেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সব করতে হয়। এভাবে তারা একে অপরের ওপর দায়ভার চাপিয়ে নিজেরা থাকতেন ধরি মাছ না ছুই পানি। এ ধরনের ভন্ডামী বন্ধ হোক। দেশে রাস্টপতি শাসিত সরকার চালু করার সাথে সাথে প্রধানমন্ত্রীর পদটি বিলুপ্ত করা হোক। তাহলে রাস্ট্রের ব্যয়ভার কমবে। রাজধানীতে যানজট কমবে। আমেরিকায় প্রধানমন্ত্রী নেই। তাদের কি চলছে না। সবই চলছে, বাংলাদেশের চেয়ে অনেক ভাল চলছে।
বাংলাদেশে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ দরকার নেই। দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ হলে এখন যে সিভিল সোসাইটি আছে তারা যেটুকু কথা বলে এটাও বন্ধহয়ে যাবে। সংসদের উচ্চ কক্ষে সদস্য পদ পাওয়ার জন্য তারা সরকারের তোষামোদী ব্যাপক ভাবে বাড়িয়ে দেবেন। সরকারের প্রতিটি কাজে ভালোমন্দ যাচাই না করে সমর্থন দিয়ে যাবেন। বেশী সাংসদ মানে বেশী অপচয়। বেশী ভিআইপি। বেশী বেশী ট্যাক্স ফ্রি গাড়ী, বেশী বেশী ফ্ল্যাট, প্লট বরাদ্দ, বেশী বেশী রাস্ট্রীয় সম্পদের অপচয় ও অযাচিত মাতবরী ।
যেহেতু তারা সরকার ও দলের বিরুদ্ধে কথা বলবেন না তাই এইসব মাকাল ফল দিয়ে দেশের কোন উপকার হবে না। আমরা জাতীয় সংসদে কোন অনির্বাচিত সদস্য দেখতে চাই না। সংসদে যে সংরক্ষিত মহিলা আসন আছে সেগুলিও বিলুপ্ত করতে হবে। গত ৩০ বছর মহিলারা বাংলাদেশের সরকার পরিচালনার পরও যদি মহিলাদের জন্য পদ সংরক্ষন করতে হয় তাহলে বুঝে নিতে হবে বাংলাদেশের মহিলাদের যোগ্যতাই নেই। আর অযোগ্য লোকদের জন্য সংসদ নয়। সংসদ গালগল্প করার জায়গা নয়। সংসদ ভবনে প্রতি ঘন্টায় লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ হয়। জনগনের করের টাকা ও প্রবাসীদের রেমিট্যান্স রাজনৈতিক নেতাদের ভোগ বিলাসের জন্য নয়।
সমাজ ও প্রশাসনে সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা ও হস্তক্ষেপ কমাতে হবে। তারা যেন পুলিশ প্রশাসন ও সরকারী অফিসে অযাচিত হস্তক্ষেপ না করেন। একজন সংসদ সদস্য হচ্ছেন আইন প্রনেতা। তিনি দেশের আইন কানুন নিয়ে ভাববেন, পড়াশুনা করবেন। তিনি কেন মার্ডার কেসের আসামীকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য থানার ওসিকে ফোন করবেন। তারা কেন সচিবালয়ে ঘুর ঘুর করবেন। চাকুরী ও টেন্ডারের জন্য রিকমেন্ড করবেন। তাদের ক্ষমতার পরিধি কমিয়ে আনতে হবে। সরকারী কর্মকর্তা ও পুলিশের ওপর নির্দেশ থাকবে তারা যেন সংসদ সদস্যদের সুপারিশ গ্রাহ্য না করেন। এজন্য তাদের খাগরাছড়ি বদলি না করার নিশ্চয়তা দিতে হবে। দেশে গনমুখী সংবিধান প্রণয়ন করতে হলে গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে হবে। সংবিধান সংস্কারের ব্যাপারে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুসকে বিচক্ষনতার পরিচয় দিতে হবে। মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রতি আবেদন তারা যেন সংবিধানে গনমুখী পরিবর্তন আনেন। আমরা যৌক্তিক সংস্কার চাই। গতানুগতিক ও ফ্যাশনেবল সংস্কার নয়।
Posted ২:০৯ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh