কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০২৪
একদল যোগ্য, মেধাবী ও বুদ্ধিমান মানুষ একত্রিত হয়ে ঠিক করলেন তারা একটি আদর্শ নগর গড়ে তুলবেন। এই দলে নগরবিদ আছেন, স্থপতি, প্রকৌশলী, ঠিকাদার, বিনিয়োগকারী, ব্যাংকার, ল্যান্ড স্ক্যাপার, পরিবেশবিদ সবাই আছেন। একটি আদর্শ নগর নির্মাণের জন্য যাদের দরকার তারা প্রত্যেকেই আছেন। তারা বসেছেন একটি বড়োসরো হলঘরে। ঘরের দরোজাটি বাইরে থেকে তালা দেওয়া, চাইলেই তারা এই ঘর থেকে বের হতে পারবেন না।
স্থপতি নগরের নকসা তৈরি করতে গিয়ে হতাশ হয়ে যান। কী হবে নকসা করে? আমরা তো এই ঘর থেকে বেরুতেই পারবো না, কীভাবে নগর গড়ে তুলবো? তবুও মনের জোর ঠিক রেখে বিরতি দেয়া কাজে আবার মনোযোগ দেন। ল্যান্ড স্ক্যাপার একটি প্রবহমান নদীর কথা ভাবেন, নদীটি বৃত্তাকারে নগর প্রদক্ষিণ করবে। নদীর দুই পাড় ধরে ছুটে যাবে নয়নাভিরাম রাস্তা। রাস্তার দুপাশে থাকবে কৃষ্ণচূড়া গাছের সারি। গাছে এসে বসবে পাখি, গান করবে।
নদীর ভেতরের দিকে, রাস্তার সমান্তরাল, ছুটে যাবে ততোধিক নয়নাভিরাম এলিভেটেড ওয়াকওয়ে, ঝিরিঝিরি হাওয়ায় নগরবাসী সেই সুসজ্জিত ভাসমান ওয়াকওয়ে ধরে সকাল-বিকাল হেঁটে বেড়াবে। হঠাৎ তার মনে হয়, ধুর ছাই কী হবে এতো সুন্দর পরিকল্পনা করে, আমরা তো এই ঘর থেকেই বেরুতেই পারবো না, কীভাবে গড়ে তুলবো এই স্বপ্নের নগর? বিনিয়োগকারী দারুণ এক প্রজেক্ট তৈরি করতে গিয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হন, আমরা তো এখান থেকে বেরুতেই পারবো না, কী করে নগর নির্মাণ করবো? একই প্রশ্ন প্রকৌশলীর, ব্যাংকারের, পরিবেশবিদের। তারা একটু কাজ করেন, আবার থেমে যান, ক্ষণে ক্ষণেই মনে হয়, কী লাভ এতো সব পরিকল্পনা করে, আমরা কি এখান থেকে কোনোদিন বের হতে পারবো?
ড. ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশের অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের অবস্থা এখন অনেকটা এই রকম। তারা অসাধারণ সব সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন কিন্তু ক্ষণে ক্ষণেই ভাবছেন, এগুলো কি সংবিধান সম্মত হচ্ছে? প্রচলিত সংবিধান হচ্ছে বন্দি হলঘরের সেই বিশাল তালা। সরকারের এখন সবার আগে এই তালাটি ভাঙতে হবে, নইলে তারা কিছুই করতে পারবেন না। তারা কিন্তু একটি বিশাল তালা ভেঙেই এই ঘরে ঢুকেছেন। এরপরে কেউ একজন এসে বাইরে থেকে আবার একটি তালা লাগিয়ে দিয়ে গেছে। এবার তারা তালাটি পুনরায় ভেঙে বের হতে ভয় পাচ্ছেন।
তাদের এখন ভয়কে জয় করে তালাটি ভেঙে ফেলতে হবে। তারা বের হতে না পারলে জনমানুষের স্বপ্নের বাংলাদেশ নির্মিত হবে না। আগের চেয়ে তাদেরকে এখন অনেক বেশি সাহসী হতে হবে, সকল বাঁধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে ‘সংবিধান’ নামক এই তালাটি ভেঙে উন্মুক্ত প্রান্তরে বেরিয়ে আসতে হবে। তাদের বুঝতে হবে দেশের ১৮ কোটি মানুষ তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, তারা ব্যর্থ হলে এই জাতি আর কাঙ্খিত স্বপ্নের বাংলাদেশ, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ, ন্যায়-বিচারের, ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ে তোলার সুযোগ পাবে না।
গণমানুষের আশা আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটে এমন একটি সংবিধান রচনাই এই সরকারের প্রধান কাজ। সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া, একথা অনেকেই বলছেন। হ্যাঁ এটা ঠিক, বাংলাদেশের বহু কিছু সংস্কার করতে হবে; যেমন, আয়কর ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে, শিক্ষা ব্যবস্থাকে সংস্কার করতে হবে, চিকিৎসা ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন, এমনি অসংখ্য সেক্টরে সংস্কার লাগবে, সংস্কার হয়ে গেলে সেটিকেও আবার ভবিষ্যত সময়ের সঙ্গে, পরিবর্তিত পৃথিবীর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করার জন্য নতুন করে সংস্কার করার প্রয়োজন হবে। এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে, এর কোনো শেষ নেই। কিন্তু এই সরকারকে ঠিক করতে হবে তারা কতটুকু সংস্কার করে বিদায় নেবেন।
৬টি সংস্কার কমিশন গঠন করে তারা মোটাদাগে তাদের সীমানা সঠিকভাবেই নির্ধারণ করেছেন। সুতরাং এই জায়গাটি থেকে তারা যেন কিছুতেই পিছপা না হন। এই ৬টি সেক্টরের সংস্কার ঠিকমত করে দিয়ে যেতে পারলে, যে স্বপ্ন এদেশের তরুণ ছাত্র-জনতা আমাদের দেখিয়েছেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ, আমরা অনেকটাই সেই জায়গায় পৌঁছে যেতে পারব।
এই কর্মযজ্ঞে পুরোপুরি আত্মনিয়োগের একটি বড়ো বাঁধা বাহাত্তরের সংবিধান। কিছু সংশোধনী বাতিল করেও এটিকে বহাল রেখে আপনারা বেশিদূর এগুতে পারবেন না। কাজেই এই সংবিধান পুরোপুরি রহিত করে বিকল্প পথেই এগিয়ে যেতে হবে। যদি বর্তমান রাষ্ট্রপতিকে অব্যাহতি দিয়ে নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিতে হয়, দিন।
আপনাদের কাজ সহজ ও নিষ্কন্টক করার জন্য যা যা করতে হয় করুন। রাজনৈতিক দলগুলো নানান হিসেব-নিকেশ করছে, তারা হিসেব করে দেখছে কোনটায় তাদের অধিক লাভ। আপনারা তাদের ফাঁদে পা দেবেন না। আপনারা কোনো দলের নয়, দেখবেন কোন পথে এগুলে দেশের লাভ হয়, এদেশের আঠারো কোটি মানুষের লাভ হয়। সেই লক্ষ্যে অটল থেকে কাজ করার শক্তি যোগাবে জুলাই-বিপ্লবের চেতনা। এই চেতনা সব সময় জাগ্রত রাখতে হবে। তাহলেই রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচ্ছন্ন হুমকি-ধামকি আপনাদের বিচলিত করতে পারবে না। একটু বিপ্লবী চেতনা, একটু সংবিধানের শক্তি এইরকম মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে গেলে লেজেগোবরে হয়ে যাবে, কাজের কাজ কিছুই করতে পারবেন না। আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে সংবিধানের কারণে জাতির আকাঙ্খা আপোষ করা ন্যায়সঙ্গত নয় বরং জাতির আকাঙ্খার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সংবিধানকেই সমন্বয় করতে হবে। এটিই সঠিক রাস্তা।
হলিসউড, নিউইয়র্ক। ২৮ অক্টোবর ২০২৪।
Posted ১২:৪২ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh