আহবাব চৌধুরী খোকন | বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০২৪
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেসিডেন্ট সাইয়্যেদ ইব্রাহিম রায়িসি আর নেই। সম্প্রতি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় সকল আরোহিসহ মর্মান্তিকভাবে মৃত্যু করেছেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে ইরানসহ পুরো মধ্য প্রাচ্যে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। অসাধারণ বাগ্মিতা, সাহসী বক্তব্য ও কঠোর নীতিবো ধের কারণে তিনি খুব কম সময়ে নিজেকে ইরানের আধ্যাত্মিক নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির উত্তরসূরি হিসাবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়ছিলেন।
জীবদ্দশায স্বাধীন ভূখন্ডের দাবীতে আন্দোলনরত ফিলিস্তিনিদের পক্ষে এবং আগ্রাসী পশ্চিমা শক্তি ও ইসরাইলের ঘৃণিত কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে সাহসী মনোভাব পোষন করে গেছেন। ফলে তিনি হয়ে উঠেছিলেন পশ্চিমাদের জন্য হুমকি স্বরূপ।বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর পারমাণবিক শক্তি প্রদর্শনের কঠোর সমালোচক ছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে মুসলিম বিশ্ব একজন সাহসী কণ্ঠস্বরকে হারালো।
ইব্রাহিম রায়িসি ১৯৬০ সালের ১৪ই ডিসেম্বর ইরানের পবিত্র মাশহাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় তিনি ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন। তিনি মাত্র ২০ বছর বয়সে কৃতিত্বের সাথে শিক্ষা জীবন সম্পন্ন করে কারাজ শহরের প্রসিকিউটর জেনারেল হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। অতঃপর ২০০৪ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত উপ প্রধান বিচারপতি, ২০১৪ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ও ২০১৯ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রধান বিচারপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৬ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি আস্থান কুদস রাযভী নামের একটি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠনের চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।২০২১ সালে ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত জয়ী হওয়ার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে রাইসিকে নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়। প্রেসিডেন্ট এর দায়িত্ব গ্রহণ করে দেশটির নৈতিকতা বিষয়ক আইন কঠোর করার নির্দেশ দেন রাইসি ।
প্রধান বিচারপতির পদে দায়িত্ব পেয়ে রায়িসি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং নারীর অধিকার রক্ষায় ও পারিবারিক সহিংসতা রোধে আইন প্রণয়ন করেন।প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় রায়িসির জনপ্রিয়তা নাটকীয় ভাবে বৃদ্ধি পায়। মূলত এর মধ্য দিয়েই তার রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। তবে প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করে রায়িসি বেশ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। তার মধ্যে ছিল মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট।
মূলত ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার পর তাঁর নাম দেশের সীমানা ছাড়িয়ে মুসলিম বিশ্বে মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। এই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সাথে তিনি দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন। ২০১৭ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ভোট পান দুই কোটি ৩৫ লাখ এবং ইব্রাহিম রায়িসি ভোট পান ১ কোটি ৫৭ লাখ। ২০২১ সালে দ্বিতীয় দফায় তিনি নির্বাচন করতে এসে বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করেন ও এর মধ্য দিয়ে তিনি চার বছরের জন্য দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের ম্যান্ডেট পান। ২০২১ সালের নির্বাচনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার অবস্থান ছিল তার নির্বাচনী প্রচারণার প্রধান এজেন্ডা।প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি যুব সমাজকে দেশের মূল্যবান সম্পদ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের কল্যাণে বহুবিধ কার্যক্রম গ্রহণ করেন ।
বেকারত্বকে যুব সমাজ ও দেশের অগ্রগতির পথে প্রধান অন্তরায় হিসাবে চিহ্নিত করেন। তিনি আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সংশোধন করে দুর্নীতি নির্মূলের উদ্যোগ দেন।পাশাপাশি দেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করে মুদ্রা স্ফীতি একক অঙ্কে নামিয়ে আনার উদ্যোগ দেন।
প্রেসিডেন্ট রায়িসি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব নস্যাৎ করে ইরানের জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু করেন। ইরানের বৈদেশিক নীতি বিশেষ করে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার জন্য আমেরিকা ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সাথে আলোচনা করে বাস্তববাদী অবস্থান গ্রহণ করেন।তিনি প্রতিবেশী বান্ধব কূটনৈতিক নীতি গ্রহণ করে মার্কিনিদের আরোপিত নিষ্ঠুর নিষেধাজ্ঞা অপসারণে সক্ষম হন। তার সুদক্ষ নেতৃত্বে ইরান পশ্চিমা শক্তির নিকট হুমকি হয়ে উটে।মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট বিভিন্ন সমস্যার ব্যাপারে রায়িসি সরকারের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সাহসী ও বলিষ্ঠ । রায়িসির শাসনকালে আগ্রাসী ইসরাইলের সাথে ইরানের সরাসরি সামরিক সংঘাত শুরু হয় ও সাধারণ জনগণের সমর্থনে তা তিনি মোকাবেলা করতে সমর্থ হন।
গত ১৯ মে আজারবাইজান প্রদেশের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেন সাহসী এই মুসলিম নেতা।এতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেন আমির আবদোল্লাহিয়ান, পূর্ব আজারবাইজানের গভর্নরসহ তার ৯ জন সফরসঙ্গীর সকলেই মৃত্যু বরণ করেন। রইসি একটি জলাধার উদ্বোধন শেষে তাবরিজ শহরে ফিরছিলেন। এই মৃত্যু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। অনেকেই এই মৃত্যুর সাথে ইসরাইলের হাত থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি যেভাবেই মৃত্যু বরণ করেন না কেন মুসলিম বিশ্ব একজন সাহসী বীরকে হারিয়েছে তা বলা যায়। তাঁর মৃত্যুতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতৃত্বের যে সংকট সৃষ্টি হলো তা সহজে পূরণ হবার নয়।
লেখক : কলামিষ্ট ও কমিউনিটি এক্টিভিষ্ট , নিউইয়র্ক ।
Posted ১১:৪১ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh