কাজী জহিরুল ইসলাম : | বৃহস্পতিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৪
জুলাই বিপ্লবে শহীদ হয়েছেন এমন ৬০৮ জনের নামের তালিকা পাওয়া গেছে, নাম না জানা শহীদের সংখ্যা অগণিত। আন্দোলনে পুলিশের এবং ছাত্রলীগের গুলি ও নির্যাতনে আহত হয়েছেন এমন মানুষের সংখ্যা ১৭৮৭ জন। জুলাইয়ের শেষার্ধ থেকেই সারাদেশে শোকের মাতম, যা এখনো চলছে, এমতাবস্থায় এ-বছর ১৫ আগস্টে জাতীয় শোক দিবস পালন করা সম্ভবত বিপ্লবে নিহত শহীদদের অসম্মান করাই হয়। তা ছাড়া ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার প্রতি এই মুহূর্তে মানুষের তীব্র ঘৃণা। তার পরিবারের নিহত সদস্যদের প্রতি গণমানুষের সহানুভূতির পরিবর্তে ঘৃণা ও ক্রোধের জন্ম হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমানকে এখন মানুষ ফ্যাসিস্ট হাসিনার পিতা এবং স্বৈরাচারের সিম্বল হিসেবেই দেখছে। এটা শেখ হাসিনারই অর্জন। তিনি তার পিতার মহত্বকে ধুলিস্যাৎ করে দিয়েছেন।
যখন এদেশের ছাত্র-জনতা নির্ভয়ে পুলিশের বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে বলে, “বুকের ভেতর দারুণ ঝড়/ বুক পেতেছি গুলি কর” তখন এই জাতিকে ভয় দেখাতে পারে এমন কোনো স্বৈরাচার পৃথিবীতে নেই। বাংলাদেশের মানুষ যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কী পরিমান প্রতিবাদী এবং কী অসীম সাহসী তা আজ একটি ভিডিওতে দেখলাম। রাজপথেই স্বৈরাচারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে একজন পুলিশ সদস্য আইজিপির উপস্থিতিতে একটি ভিডিও দেখাচ্ছে আর বলছে, স্যার গুলিতে যেইটা মারা যায় খালি সেইটাই পরে, যার গায়ে গুলি লাগে খালি সেই সরে আর কেউ সরে না, এইটা একটা বিরাট সমস্যা।
পুলিশের কাছে, স্বৈরাচারের কাছে, এটা বিরাট এক সমস্যাই বটে, আর এটাই আন্দোলনের শক্তি, বিজয়ের লক্ষণ। একজন তরুণকে বলতে শুনলাম, তখন রক্ত এতো গরম ছিল যে পুলিশের লাঠিচার্জ, জল কামান বা রাবার বুলেটের আঘাত টেরই পাই নাই। বিপ্লব যখন তুঙ্গে তখন মৃত্যু খুব তুচ্ছ হয়ে যায়। আবু সাঈদ খালি হাতে দুহাত প্রসারিত করে বুক পেতে গুলিকে আলিঙ্গন করেছে, টিয়ার শেলের জ্বালা দু’চোখে নিয়ে মীর মুগ্ধ সবাইকে ডেকে ডেকে পানি দিয়েছে। মায়েরা তার সন্তানদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে, পুলিশ এক তরুণকে বন্দী করে নিয়ে যাচ্ছে, মা তার পিঠ চাপড়ে সাহস দিচ্ছে, কেঁদে-কেটে ছেলেকে জড়িয়ে ধরছে না, তখনই আমরা টের পেয়ে গেছি, এই দানবের পতন অবশ্যাম্ভাবী।
দানবের পতন হয়েছে। আগস্টের ৫ তারিখে বাংলাদেশ মুক্ত হয়েছে। বেশ কয়েকদিন কর্মবিরতিতে থাকায় পুলিশবিহীন বাংলাদেশ পরিচালনা করেছে এদেশের বিপ্লবী ছাত্র-তরুণেরা। কোথাও ট্রাফিক জ্যাম হতে দেয়নি। ডাকাত প্রতিরোধ করেছে শক্ত হাতে। বাজারে বাজারে গিয়ে সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়েছে, দ্রব্যমূল্য কমতে শুরু করেছে। পরম মমতায় রাস্তার ময়লা-আবর্জনা সাফ করেছে, দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি এঁকেছে, ক্যালিগ্রাফি এঁকেছে, নান্দনিক চিত্রকর্ম করেছে, সুন্দর, নান্দনিক ও ঝকঝকে করে তুলেছে সারা দেশ। যেন দেশ গড়ার এক গণজোয়ার এসেছে বিপ্লব সফল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। এই গণজোয়ারকে আমাদের ধরে রাখতে হবে। শেখ হাসিনা যে এই দেশকে, দেশের মানুষকে এবং তার দল আওয়ামী লীগকে মোটেই ওন করে না তার প্রমাণ তিনি দিলেন নিজের বোনকে নিয়ে পালিয়ে গিয়ে। তার কাছে তার পরিবারের সদস্যরা ছাড়া আর কারো কানাকড়িরও মূল্য নেই। দলের সব নেতা-কর্মীকে আগুনের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নিজের জান নিয়ে পালাতে পারে কেবল একজন চরম স্বার্থপর স্বৈরাচার।
দেশে যে সত্যের, সততার এবং দেশ গড়ার গণজাগরণ তৈরি হয়েছে তা অব্যাহত রাখার জন্য এবং ভবিষ্যতে যাতে এইরকম দানব তৈরি না হয় সেজন্য অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পৃথিবীর বহু দেশে বিপ্লবের পরে বিপ্লবীরাই পতিত স্বৈরাচারের বিচার করে ফেলে। গণপিটুনিতে অথবা বিপ্লবীদের বন্দুকের গুলিতেই স্বৈরাচারের দোসরদের মৃত্যু ঘটে। আমরা আনন্দিত যে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা আইন নিজের হাতে তুলে নেয়নি। তবে তারা ক্রোধ মেটাতে স্বৈরাচারের বেশ কিছু সিম্বল ভাঙচুর করেছে, তাদের বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে।
বিপ্লবী ছাত্র-জনতা একটি অন্তর্র্বতীকালীন সরকার গঠন করে দিয়েছে। এই সরকারের হাতেই তারা স্বৈরাচার ও তার দোসরদের আইনানুগ বিচারের প্রত্যাশা করছে। শেখ হাসিনাসহ সকল সেক্টরের অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরুর মধ্য দিয়েই বিপ্লবীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কারের কাজটি শুরু করতে হবে। যেহেতু শেখ হাসিনা দেশের বাইরে আছে তাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালে মামলা করার প্রস্তুতি খুব দ্রুত নিতে হবে। ভারত যেহেতু আইসিসির সিগনেটরি না, তাই মামলা হলে হাসিনাকে গ্রেফতার করে হেগে পাঠাতে ভারত বাধ্য না। হাসিনা এই সুযোগটা নিতে চাইবে। সে ভারতেই থাকতে চাইবে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারকে এই বিষয়ে কঠোর নীতি অবলম্বন করতে হবে। ভারতের সঙ্গে কঠিন দর কষাকষি করতে হবে যাতে তারা হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে অথবা আইসিসির কাছে হস্তান্তর করে। সরকারকে প্রতি মুহূর্তে একথা মনে রাখতে হবে হাসিনাসহ সকল হত্যাকারীর বিচার না হলে শহীদদের আত্মার সঙ্গে জাতির বেঈমানী করা হবে এবং সকল সংস্কারই প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যাবে।
হলিসউড, নিউইয়র্ক। ১৩ আগস্ট ২০২৪
Posted ১:২২ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh